নিত‍্যপুরাণ এর বর্ণিল শততম প্রদর্শনী

নিউজ ডেস্ক:   অবিরাম বৃষ্টি নাট‍্যপ্রেমীদের দমাতে পারেনি। দর্শক এসেছিলেন দেশ নাটকের ‘নিত‍্যপুরাণ’–এর দুটি প্রদর্শনী দেখতে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে ছিল ‘নিত‍্যপুরাণ’-এর ৯৯তম এবং সন্ধ্যায় শততম প্রদর্শনী।

এ দিন নাটকটির অন্য রকম এক প্রদর্শনী দেখলেন দর্শক। কেননা, শতবার মঞ্চস্থ হওয়া এ নাটকের লেখক মাসুম রেজা বহুকাল পর নিজেই মঞ্চে এলেন। মহাভারত থেকে নেওয়া এ নাট্যগল্পে দ্রোণাচার্য চরিত্রে নিজেই অভিনয় করলেন তিনি। সঙ্গে বিভিন্ন সময় নাটকের দ্রৌপদী চরিত্রের অভিনেত্রীরা।

মঞ্চে আসার পরই দর্শকের মন জিতে নিয়েছিল দেশ নাটকের এই নাটক। সেই মহাভারতের কালে মানুষ যেমন শ্রেণিবৈষম্যের শিকার হতো, এখনো তেমন হয়। এখনো সমাজে নারীর সম্মান পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গল্পে সেসব মনে করিয়ে দেওয়া এবং একটি চৌকস দল নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে প্রায় ১৮ বছর নাটকটি চালিয়ে নেওয়ার কারণে অভিনন্দনের দাবিদার দেশ নাটকের ‘নিত‍্যপুরাণ’-এর লেখক ও নির্দেশক মাসুম রেজা। নবমঞ্চায়নে বিভিন্ন সময়ের চার ‘দ্রৌপদী’ শিরিন খান মনি, নাজনিন হাসান চুমকী, বন্যা মির্জা ও সুষমা সরকারও রাঙিয়েছেন এ প্রদর্শনী।

নিম্নবর্ণের সন্তান একলব্যকে ঘিরেই নাটক। চরিত্রটি করেছেন মামুন চৌধুরী। পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে অস্ত্রবিদ্যা শেখার জন্য গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে যান তিনি। নীচু জাত বলে তাঁকে শেখাতে চান না দ্রোণাচার্য। যদিও একপর্যায়ে তাঁর কাছে ধনুর্বিদ্যা শেখার সুযোগ পান একলব্য। অথচ আরেক শিষ্য পঞ্চপাণ্ডবের এক পাণ্ডব অর্জুন একলব্যের কাছে পরাজিত হন ধনুর্বিদ্যায়। এর পরিণতিতে গুরু দ্রোণাচার্য একলব্যকে আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা দিতে নির্দেশ দেন। মহাভারতে বর্ণিত নিম্নবর্গের এক বীরযোদ্ধার এ করুণ কাহিনিই নাটকের উপজীব্য। এ ছাড়া নাটকে ব্যাসদেব চরিত্রে আসিফ হাসান, যুধিষ্ঠিরের চরিত্রে কামাল আহমেদ, ভীমসেন চরিত্রে ফিরোজ আলম, অর্জুনের চরিত্রে লরেন্স উজ্জ্বল গোমেজ, নকুল চরিত্রে হোসাইন নীরব, সহদেবের চরিত্রে মাইনুল হাসান মাঈন অভিনয় করেছেন।

শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষে এ নাটক নিয়ে গতকাল সকালে ছিল সেমিনার ‘শিল্প বিচারে নিত‍্যপুরাণ’। এতে মূল প্রবন্ধ পড়েন জয়ন্ত চট্টোপধ্যায়।

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। মধ্যে বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল নাটকের প্রদর্শনী। নির্দেশক মাসুম রেজা বলেন, ‘নাটকটি একটা সময় অনেক জনপ্রিয় ছিল। এমন অনেক দর্শক আছেন, যাঁরা ২০ থেকে ৩০ বারও আমাদের শো দেখেছেন। সেই সব মানুষই আমাকে তাগিদ দিয়ে আসছিলেন এত বছর। এরপর ২০১২ সালে দিলীপ যখন মারা গেল, তখন আমরা ভেবে নিয়েছি এ নাটক আর মঞ্চে তোলা কখনো সম্ভব নয়। কারণ, ওর মতো শক্তিমান অভিনেতা কিংবা একলব্য চরিত্রে অভিনয় করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যাহোক, এসব দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে দিলীপের শেষ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা মনে শক্তি জোগাই। সিদ্ধান্ত নিই তাকে স্মরণ করে হলেও নাটকটি ফের মঞ্চে আনা প্রয়োজন।’সেই দীর্ঘ বিরতি ভেঙে ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে নাটকটি পুনরায় মঞ্চস্থ হয়। এক-দুই করে শততম রজনীর পথে ‘নিত্যপুরাণ’। গতকাল ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের ৯৯ ও ১০০তম প্রদর্শনী হয়। শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে বিকেল চারটায় ও সন্ধ্যা সাতটায় দুটি প্রদর্শনী হয়।

সেমিনার-নাটক মিলে ‘নিত্যপুরাণ’ কালকের শততম মঞ্চায়নের দিনব্যাপী এ নাট্যক্রিয়ার নাম দিয়েছে দেশ নাটক ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি বিসর্জনের শত রাত্রি’। কার বৃদ্ধাঙ্গুলি বিসর্জন? জানা গেল, মহাভারতে একলব্য নিম্নবর্ণের এক উপেক্ষিত চরিত্র। ‘নিত্যপুরাণ’-এ মাসুম রেজা সেই একলব্যকে দাঁড় করিয়েছেন শ্রেষ্ঠ বীররূপে। সেই বীরের অঙ্গুলি বিসর্জন সহস্র হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ারই কথা। এমনটাই মনে করছেন নির্দেশক।

এ জুলাই মাসেই প্রতিষ্ঠার তেত্রিশে পা রাখল দেশ নাটক। শামসুল আলম বকুল, ইশরাত নিশাত, সালাহউদ্দিন লাভলু, তপন দাশ, শিরিন খান মনি, এনায়েত লিপনসহ আরও কিছু নাটকপাগল কর্মীর সমন্বয়ে ১৯৮৭ সালে জুলাই মাসে দেশ নাটক প্রতিষ্ঠা পায়।