ঐক্যফ্রন্ট লক্ষ্য অর্জনে চরম ব্যর্থ : মান্না

নিউজ ডেস্ক :   জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট লক্ষ্য অর্জনে চরম ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফ্রন্টের অন্যতম নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

তিনি বলেছেন, ‘শুধু ঘরে বসে বসে ত্যানা ছেড়ার কাজ করলে কোনো কাজ হবে না। কাজ তখনই হবে যদি কাঁথা সেলাই করার মতো কাজ করতে পারি। আমি এখনও জানি না ভোট চুরি নয়, ভোট ডাকাতির ৬ মাস হয়েছে। এ ৬ মাস কত মাসে গিয়ে ঠেকবে তাও জানি না। কিন্তু আমরা আজও রাজপথে নেমে এ নির্লজ্জ ভোট ডাকাতির কোনো প্রতিবাদ করতে পারলাম না।’

‘ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র চাই, কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে চাই’- শীর্ষক এক আলোচনা সভায় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মান্না এসব কথা বলেন।
সামাজিক সংগঠন থেকে নাগরিক ঐক্যের রাজনৈতিক দল হিসেবে দুই বছর পূর্তিতে শুক্রবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা হয়।

দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘নিজেরা নিজেদের প্রস্তুত করুন। সংগঠনকে বিস্তৃত করুন। অন্য কারও ওপর ভরসা করে লাভ নেই। আমরা কারও ওপর ভরসা করে চলিনি। আমাদের শক্তিতেই চলতে চেয়েছি। তবে আমাদের শক্তি এত বেশি নয় যে একাই পারব। অতএব অন্যদের সঙ্গে মিলি। অন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে শক্তিটা বৃদ্ধি করি। শক্তিবৃদ্ধি করে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের চিন্তার মধ্যে ভুল ছিল সেটা আমি বলব না। কিন্তু আমরা যাদের যাদের সঙ্গে এ সম্পর্ক করে সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, তারা মনে মনে আগেই তাদের জায়গায় পৌঁছে গেছে। তারপর স্বপ্ন যখন ভেঙে গেছে তখন মনে হয়েছে একি আমিতো পথের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওরা আমার সাথে থেকে লাভ কী? অতএব নতুন করে ভাবছি।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ইঙ্গিত করে মান্না বলেন, ‘৩০ তারিখে তো দেশে ভোট হয়নি, ভোট ডাকাতি হয়েছে ২৯ তারিখে। আপনি ৩০ তারিখ সকাল বেলা কেন বললেন যে ভোট ভালো হচ্ছে। কেন দুপুর পর্যযন্ত বুঝতে পারলেন না যে ভোট খারাপ হচ্ছে। কেন ৩০ তারিখ বিকেল চার/পাঁচ দিনের জন্য হরতাল দিতে পারলেন না। যদি সেদিন এ রকম কিছু করা যেত তাহলে সারা বাংলাদেশ অচল হয়ে যেত। কেউ কেউ বলতে পারে, হরতাল দিলেও হরতাল হতো না। আরও নির্যাতন হতো, আর হামলা-গ্রেফতার হতো। শেষ পর্যন্ত সবাইকে ঘরে ঢুকে যেতে হতো। হতেও পারতো। কিন্তু সেই কারণে আপনি কি প্রতিবাদ করবেন না। বরং একটা প্রতিবাদ যদি করা যেত তাহলে উল্টোও ঘটতে পারতো। অথবা সারাবিশ্বের মানুষ জানতো এ ডাকাতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সমস্ত মানুষ মাঠে নেমেছিল, হরতাল করেছিল, আন্দোলন করতে চেয়েছিল, জোর করে সেটা তারা বন্ধ করে দিয়েছে।’

বরগুনায় রিফাত হত্যার ঘটনা শুধু হিন্দি ছবিতেই দেখা যায় উল্লেখ করে মান্না বলেন, ‘বরগুনাতে যখন এ ঘটনা ঘটলো তখন সবাই রাতে টিভিতে দেখেছেন অথবা ফেসবুকে দেখেছেন। আমি পরদিন দুইজন মানুষকে ফোন করেছিলাম, তারা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, এ কি আমাদের বাংলাদেশ! একটা যুবক ছেলেকে বিনা কারণে বিনা দোষে কুপিয়ে হত্যা করলো। আর শত শত মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো, অথচ এ বাংলাদেশতো মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। এই বাংলাদেশ ৫২ সালে ভাষার জন্য লড়াই করেছিল। কোনো একজন যদি যেত, লড়াই করতো, ওই চাপাতি ধরে ফেলতো। দেশ এখন উল্টো রথে চলে, চলছে। দেশে কোনো আইনের শাসন নাই, বিচার নাই। দেশে কোনো নির্বাচন নাই, দেশে কেবল ডাকাতি আছে। জনগণের অধিকার ডাকাতি করে নিয়ে যাচ্ছে, এ হলো দেশ। লড়াই যদি করতে হয়, লড়াইয়ের মতো লড়াই করতে হবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে মান্না বলেন, ‘আমরা এখনও এক সাথে চলি, চলতে চাই। পরস্পর পরস্পরকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এ প্রশ্ন মানুষ করছে, ৩০ তারিখের পর ছয় মাস পার হয়ে গেলো একটাও কর্মসূচি দিতে পারলেন না কেন? যখন নির্বাচন নির্বাচন খেলা চলছিল, একটার পর একটা গায়েবী মামলা দেয়া হচ্ছিল। বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে লাখ লাখ মামলা হচ্ছিল। আমরা প্রতিবাদ করছিলাম। সেই সময় আমরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে বসেছিলাম। সংলাপে উনি বললেন, আমাকে একবার বিশ্বাস করেন। আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। আমি কথা দিচ্ছি, এই ভোট সম্পূর্ণ ভালো হবে। কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা হবে না। আমাদের পক্ষ থেকে বলা হলো সারাদেশের যে পরিস্থিতি, আমাদের নেতাকর্মীরা বাড়িতে যেতে পারে না, নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারে না, তাহলে নির্বাচন হবে কীভাবে। তিনি বলেন, কেন? মনে হয় উনি কিছুই জানেন না। ওনাকে আমরা বললাম, নেতাকর্মীদের নামে গায়েবী মামলা। সে এলাকায় গেলেই গ্রেফতার হবে। উনি বললেন, আপনাদের কাছে কোনো লিস্ট আছে? এটা কি সত্যি ঘটনা? লিস্ট দিন আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা পরদিন লিস্ট দিয়েছি। সেই লিস্ট উনি পড়ে দেখেছেন কি না সে কথা ঐক্যফ্রন্টের কোনো নেতা কি জানেন? জানেন না, কিন্তু গ্রেফতার, হয়রানি বন্ধ হয়নি। গায়েবী মামলাও বন্ধ হয়নি।’

মান্না বলেন, ‘আমি যদি বলতাম প্রধানমন্ত্রী আমাদের সাথে এই কথা দিয়েছেন, এই কথা যদি প্রতিপালিত না হয় ৪৮ ঘণ্টা পরে আমরা হরতাল দেব। প্রধানমন্ত্রী কথা দেবেন, সেই কথা থাকবে না, তার প্রতিবাদে আমি কর্মসূচি দিতে পারব না? ধৃষ্টতা বলেন, বেয়াদবি বলেন, এই কথা বলতে চাই, আমরা লড়াই থেকে পেছনে যাব না। আমাদের হয়ত সেই শক্তি নাই, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, যদি ন্যায়ের পথে থাকি, ঠিক পথে থাকি, অন্যায়ের প্রতিবাদে অটল থাকি তাহলে সেই শক্তি আমরা যোগাড় করতে পারব।’

আলোচনা সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক এম হাফিজ উদ্দিন খান বিগত একাদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, ‘সেদিন কী ধরনের ভোট হয়েছে তা আমি বুঝতে পারিনি। হয়ত মানুষও বুঝতে পারেনি। কারণ এ ভোটের সঙ্গে মানুষের তেমন একটা যোগাযোগ বা আগ্রহ ছিল না। আমার ধারণা ছিল, দেশে যে ধরনের নির্বাচন হল, তার প্রতিবাদে ১ জানুয়ারি থেকেই দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে পড়বে। কিন্তু আসলে কেউ নামেনি। কোনো ছোট রাজনৈতিক দলতো নামেইনি, এমনকি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও রাস্তায় নামেননি। সবাই ঘরে বসে কথা বলছেন। এমনকি আমিও ঘরে বসেই কথা বলি!’

সভায় গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনীতি চলছে, সেখানে সমাজ শক্তির ভারসাম্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রে সামাজিক যে শক্তি থাকে তা এদেশে আর নেই। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বরগুনায় প্রকাশ্যে দিনদুপুরে শত শত মানুষের সামনে রিফাত হত্যাকাণ্ড তার বড় প্রমাণ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সময় অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ রিফাতকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে নাই। এগিয়ে না যাওয়ার অন্যতম দুটি কারণ আছে। এর একটি হচ্ছে-নিজের জীবনের ভয়তো মানুষের মধ্যে কাজ করেই। রিফাতকে রক্ষা করতে গেলে দুর্বৃত্তরা তাকেও আঘাত করতে পারে। সেই ভয় থেকে আজ সাধারণ মানুষ অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে না। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে-সামাজিক শক্তির অভাব। মানুষ সাহস করে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এগিয়ে গেলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে তাকেই আসামি করবে না, সাধারণ মানুষ এ নিয়ে আজ সন্দিহান। কারণ আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বপালনকারী পুলিশ আজ রাষ্ট্রে নয়, একটি লুটেরা, ভোট ডাকাতির সরকারের সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্থাৎ যে সামাজিক শক্তি থাকার কথা তা শেষ হয়ে গেছে।’

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, ‘আজকে দেশের ৫ ভাগ লোকের কাছে দেশের সব অর্থ ও সম্পদ কুক্ষিগত। সম্পদশালী লুটেরারা দেশের টাকা লুট করে দিচ্ছে। অথচ আমার এলাকার সাধারণ কৃষক কালু মিয়া মাত্র ২০ হাজার টাকার জন্য জেল খেটেছে। অথচ রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটেরারা বহাল তবিয়তে আছে।’

মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এসএম আকরাম, দলের নেতা মঈনুল ইসলাম, এলডিপি নেতা ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল প্রমুখ।