গল্প: ঝোলছবি

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ:   নগরশীর্ষে রীতিমত সূর্যটা ইচ্ছেমতো উত্তাপে পুড়িয়ে যাচ্ছে নাগরিক মন।দহনের তীব্রতা বুঝেই কাকপক্ষীদের যথেচ্ছ জলসিঞ্চন খেলা চলছে।
একাশিয়ার নীচে প্লাবন বসে বসে ঘামছে।শরীর কোমলতর ঠান্ডা না হওয়া অব্দি তার কাজটা শুরু করতে পারছেনা।
আঁকাআঁকির যাবতীয় সরঞ্জাম ছড়ানো ছিটানো।
একটা ছবি অসমাপ্ত থেকেই যাবে নাকি ঠিক বুঝতে পারছেনা।কিন্তু আজকেই বিকেল চারটার মধ্যে জমা দিতে হবে।তাই যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে।
কেউ একজন শব্দ করল।,কাশি দিলো।
কিন্তু অচেনা।
মেয়ে একটা। পরনে জীর্ণতার প্রতিচ্ছবি। শরীরে দারিদ্র্যের চাবুকে জর্জরিত বুঝা যায়।
ভাইজান–নারীকন্ঠ বাষ্পরূদ্ধ।
মেয়েটা বলছে,আমারে বিপদ থাইক্যা বাচান।
কী বিপদ?
আমার ছেলেডারে একটা দোকানের মালিকে আটকাইয়া রাখছে।
কেন?
হে নাকি চুরি করছিন।স্যার, আমার একটাই পুলা।বস্তিতে জীবনডা কাডাইছি।কিন্তু কোনদিন হে চুরি চামারি করে নাই।
মেয়েটার নাঁকি সুরে কান্নায় আশপাশের বাতাস গুমরে গুমরে উঠছিল।
কিন্তু আমি তো বিজি।আচ্ছা ঠিক আছে চলো দেখি কি করা যায়।
আপাতত গুটিয়ে নিয়ে প্লাবন মেয়েটার পিছু নিলো।আঁকাআঁকি আজ বোধ হয় শেষও হোলোনা।জমাদেয়া তো দুরের কথা।
ছবিসহই প্লাবন এগুচ্ছে শামছু মিয়ার ভাতস্টলের দিকে।
ওখানে যাওয়া মাত্র শামছু মিয়া উঠে চলে যেতে চাইলো।
প্লাবন ওকে আটকে দিয়ে বললো, ওনার,ছেলেটাকে আটকে রেখেছেন কেন?
আরে আস্তা চুর।কি কইন।এমনি এমনি আটকাইছি?
ছেলেটাও বেপরোয়া কান্না শুরু করে দিলো
ঠিক আছে আমি ওর সাথে কথা বলছি, সে আর চুরি করবেনা।ওকে ছেড়ে দিন।
কইলেই অইলো?কিন্তু আমার ভাত যে চুরি করলো হেইডার কি অইবো।তিরিশ টেকার ভাত।
ঠিক আছে ওটা আমি দিয়ে দিচ্ছি।
একটা উসকুখুঁসকু লোক টলতে টলতে পাশের টেবিলে বসে হাঁক দেয়–ওই বিলাইল্লা।খানা ল’।
বিলাল ছাড়া পেয়েই হুকুম তামিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্লাবন মেয়েটাকে বলে,নাও হোলো তো?
আমি এখন যাই। ওফ,কম্পিটিশনে বারোটা বেজেই গ্যালো।
ভাত খেতে খেতে আগন্তুক রেগে উঠলো—এই হারামজাদা।এইডা তোর তরকারী? লবনের কান্দি।থু—
তরকারীর থালাটা ছুঁড়ে মারলো লোকটা।আর তা গিয়ে পড়কো একদম প্লাবনের আঁকা ছবির ওপর।তরকারীর হলুদ দাগে ছবিটা একটা নতুন মাত্রা যেন পেয়ে গেলো।
কিন্তু এটাতো আন্তর্জাতিক কম্পিটিশন।
হতাশ হয়ে ফিরছে প্লাবন।
হলে ঢুকতে মনমরা দেখে জয়ন্ত জিগ্যেস করে কিরে ছবি জমা দিসনি?
নাহ।
কিসের নাহ?
দেবনা।এতো কষ্ট করে আঁকলাম।নষ্ট হয়ে গেলো।এই দ্যাখ।
তরকারীর ঝোলের কারুকাজে হাসি ঠেলে উঠছিলো।নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,যা এটাই জমা দে।
আরে ধুর।কপালটাই খারাপ।
আমি বুঝলামনা তরকারীর ঝোল ভরলো ক্যামনে?
আর বলিসনা।কপালের নাম গোপাল।
তারপরও দে।দ্যাখ।কি হয়।
ছবিটা দিয়েই ফেললো প্লাবন।
তারপর ইতিহাস।তরকারীর ঝোল মাখা ছবিটাই পরদিন পত্রিকার হেডিং হলো।

ইমেইল:  mdshohidullah723@gmail.com