ঝরাপাতা গো আমি তোমারই দলে

নূহ-উল-আলম লেনিন:  পিতৃ-পিতামহের সূত্রে আকৈশোর আমি একটা বামপন্থি দলের সঙ্গে ছিলাম। সেই দলটি-কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আমার পরিবারের মতো। বয়োসন্ধি পেরিয়ে দারুণ যৌবনে ওই দল-পরিবারের একজন হয়ে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে আমি অংশ নেই। যখন আমি মুক্তিযুদ্ধে, তখন থেকেই তত্ত্বের খাঁচা ভেঙে আমি একজন মানুষের প্রতি অনুরক্ত হই।

কৈশোরে তাঁর কথা শুনেছি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ভাষা আন্দোলন ও ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে ৯২-ক ধারায় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের সময় শেখ মুজিবের সহবন্দি বাবার কাছে। মতাদর্শগত ভিন্নতা সত্ত্বেও শেখ মুজিবের প্রতি বাবার শ্রদ্ধা ও সুস্পষ্ট অনুরাগ আমাদের মানস গঠনের বনিয়াদ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

নব্বইয়ের দশকের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আমাদের সেই ছোট সুখী পরিবারটি ভেঙে যায়। আমি বুঝতে পারি, এই পরিবারটির অতীত যত গৌরবোজ্জ্বলই হোক, তারা না পারবে সামনে এগুতে, না পারবে একান্নবর্তী হয়ে থাকতে। তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে সদর্থকভাবেও তাল মিলাতে পারবে না। তাদের রয়েছে এক ধরনের রক্ষণশীল, মৌলবাদী বা অর্থডক্সি তত্ত্বের ফ্রেমে বন্দি চিন্তা। সৃজনশীলভাবে নতুন কোনো চিন্তা করার ক্ষমতা তাদের নেই। বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের গরিব মেহনতি মানুষের ভবিষ্যৎ আর এই পরিবারের ওপর নির্ভর করে না।

১৯৯৭ সালে আমি দেশের সবচেয়ে বড় ও পরীক্ষিত দলে—আওয়ামী পরিবারে যোগদান করি। না, একা না। আমাদের পুরনো পরিবারের সংখ্যাগরিষ্ঠদের নিয়ে।

দুটি পরিবারে দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। তা সত্ত্বেও নতুন পরিবারের কাজের মধ্যে নিজেকে একাত্ম করতে আমার সময় লাগেনি। ব্যক্তিগত কোনো লাভালাভের কথা ভেবে আমি এই পরিবারে—আওয়ামী পরিবারে যোগদান করিনি। এই পরিবারে আমি আমার সাধ্যমতো অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। ক্ষমতাসীন বলে পদস্খলনের ও প্রলোভনের ফাঁদে পা দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু আমি সৎ থাকার চেষ্টা করেছি।

এই পরিবার আমাকে নবজন্মদান করেছে। চারদিকে বিপুল মানুষ। নানা রঙের মানুষ। সমাজের ভালো-মন্দ সবই আছে এই পরিবারে। আমি যেন অথৈ সমুদ্রে বারিবিন্দুবৎ। এই পরিবার আমাকে সম্মান দিয়েছে, মর্যাদা দিয়েছে। স্বাধীনভাবে চিন্তা করার, কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। আকৈশোর দেশের জন্য, মানুষের জন্য যে-সব স্বপ্ন দেখতাম, সেই স্বপ্নের কিছু কিছু পূরণও হয়েছে। আবার অপূর্ণতাও আছে।স্বপ্নের সীমানাও গিয়েছে বেড়ে।

এই পরিবারে প্রায় দুই দশক পেরিয়ে, আমি যখন জীবনের উপান্তে পৌঁছলাম, হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম আমার পরিবার আমাকে অকেজো মনে করছে। আমার কর্মক্ষমতা শেষ না হতেই আমাকে কর্মভারমুক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু আমি তাতে হতোদ্যম হইনি। কোনো ক্ষোভ বা খেদ ছিল না মনে। এখনও নেই। তাই এই পরিবারটিকেই আগলে ধরে আছি। এই পরিবারের সাথে আমার সম্পর্কটা ইমোশনাল। আমার যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো যেমন কেটেছে আগের পরিবারে। তেমনি আমার জীবনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল এবং সবচেয়ে জনঘনিষ্ঠ, সমাজ ও জীবনের বর্ণাঢ্য এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছে এই পরিবারে আমার ২২ বছর ।

এই পরিবারের হয়ে আমি আমার দেশ ও সমাজের জন্য ‘যতটুকু’ করতে পেরেছি, একমাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়া, সারা জীবনেও আমি ততটুকু করতে পারিনি। আমি তাই তৃপ্ত ও গর্বিত।

একটি সাম্যের সমাজের স্বপ্ন নিয়ে জীবনের পথ চলা শুরু হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন —সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার অভাবনীয় পতন, ‘ইতিহাসের সেই স্বপ্ন ভঙ্গ’ ঘটিয়েছে। স্বপ্নভঙ্গ হলেও মানুষ তার স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যের কারণে নতুন করে স্বপ্ন দেখে।

আমিও ভেদ-বৈষম্যহীন, দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়নমুক্ত, যে স্বপ্ন আজীবন লালন করেছি, এখনও সেই স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমি জানি না স্বপ্ন জয়ের পথ কী? জানি না স্বপ্ন জয়ের নতুন কোনো তত্ত্ব। হয়তো আগামী দিনের মানুষ সেই স্বপ্ন জয়ের পথ, সেই নতুন দিনের তত্ত্ব আবিষ্কার করবে। সেই বিশ্বাসটুকু অটুট আছে।

কিন্তু, বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে অথবা অজানা ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে মুলতবি রেখে নয়।

আমি এখন অগস্ত্য যাত্রার পথে। প্রায় বিকল বৃক্ক আমাকে ইতোমধ্যেই নোটিস দিয়েছে। আমার সমবয়সী, এমন কী অনুজপ্রতিম অনেকেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমাকেও যেতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলব, “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে…।” মনে না রাখুক, কেউ যেন আমাকে “ স্বধর্মচ্যুত” বলে মনে না করেন। আমার ধর্ম আমার দেশ, একটি ভেদ-বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ ও সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, আমার দল-আওয়ামী পরিবার, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণ ও শ্রেয়োবোধ এবং আমার অঙ্গীকারের সততা। আমার কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই। নেই কোনো না পাওয়ার বেদনাবোধ। নেই কোনো খেদ।

যে পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি, আমি যেন সেই পরিবারের একজন হয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। প্রকৃতির নিয়মেই, ঝরাপাতা গো আমি তোমারই দলে…।
১২/৬/১৯