বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমছে না

নিউজ ডেস্ক:    আগামী বাজেটে সঞ্চয়পত্রের বর্তমান সুদহার কমছে না। তবে বড় ধরনের সংস্কারের আওতায় আসছে সঞ্চয়পত্র খাত। এরই অংশ হিসেবে পহেলা জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে সারাদেশে অনলাইনে লেনদেন। এছাড়া স্থাপন করা হচ্ছে সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের তথ্য সংক্রান্ত ডাটাবেজ। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের ক্রেতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করা হচ্ছে কঠোর নীতিমালা। ইতোমধ্যে এক লাখ টাকার উপরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত সব লেনদেন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে হবে। এর বাইরে নতুন করে আরও কিছু উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, সঞ্চয়পত্রের সুদে হাত দেব না। সুদের হার কমাবো না। যাদের জন্য এটি চালু করা হয়েছে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকবে। তবে এই খাতে কিছু সংস্কার করা হবে। কারণ কিছু অবৈধ টাকা এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে গত কয়েক বছর থেকে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। এটা কমিয়ে আনতে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর পরপরই পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে শুধু ঢাকা শহরে চলতি মাস থেকে অনলাইনে সঞ্চয়পত্র বেচাকেনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ক্রেতাদের টিআইএন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল ফোন নম্বর সংযুক্ত করা। এতে সঞ্চয়পত্র কেনাবেচায় ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে ঢাকা অঞ্চলে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। গত এপ্রিল থেকে ঢাকা অঞ্চলে অনলাইনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি, এক লাখ টাকার উপরে সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ই-টিআইএন জমা দেয়ার নিয়ম কার্যকর হয়েছে। তবে এ নতুন পদ্ধতি পুরনো সঞ্চয়পত্রধারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আগামী ১ জুলাই থেকে সারাদেশে এ পদ্ধতি চালু করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ১৫ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচী বিভাগ থেকে জারি করা এ নির্দেশনায় বলা হয়, জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে জেলা শহরে সঞ্চয়পত্র স্কিম লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের সব কার্যালয় ও শাখাকে লেনদেন শুরু করতে হবে। আগামী পহেলা জুন থেকে অনলাইন ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতির বাইরে সঞ্চয়পত্র বেচাকেনা না করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, টিআইএন থাকলেই কর দিতে হবে না। করযোগ্য আয় হলেই কেবল কর দিতে হবে। তিনি বলেন, নারী ও স্বল্প আয়ের বিনিয়োগকারীকে আটকানো সরকারের উদ্দেশ্য নয়। বরং অনেক ব্যক্তি নামে বেনামে ডাকঘর, সঞ্চয় অফিস ও ব্যাংকের মাধ্যমে আলাদা আলাদাভাবে সঞ্চয়পত্র কিনে আসছিলেন। এতে তারা সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা এ খাতে বিনিয়োগ করে মুনাফা নিচ্ছিলেন। আবার এ খাতে বিনিয়োগের উৎস জানতে চাওয়া হয় না বিধায়, অনেকেই অপ্রদর্শিত কিংবা কালো টাকা এ খাতে বিনিয়োগ করে আসছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন অফিসের মাধ্যমে ম্যানুয়ালি লেনদেন হওয়ায় তা ধরা যাচ্ছিল না। ফলে নারী ও সীমিত আয়ের মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য দেয়া সরকারী সুবিধা (বিনিয়োগের সুদ) চলে যাচ্ছিল তাদের পকেটে। এটি ঠেকানোর জন্যই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তিনি বলেন, সঞ্চয় অধিদফতর থেকে এ বিষয়ে কোন লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়নি। অর্থ বিভাগের একটি নির্দেশনা কার্যকর করছে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো।

সঞ্চয়পত্র অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে ৬৮ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ বেশি। আর এর ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ ধার করার লক্ষ্য ধরেছিল, তার চেয়েও ৫২ শতাংশ বেশি নিয়ে ফেলেছে নয় মাসেই। জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে (২০১৯-২০) তা কমিয়ে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে মাত্র ৩০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা চলতি বাজেটে ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা কম। সঞ্চয়পত্র খাতে কালো টাকা বিনিয়োগ রোধ, ধনী ও কর্পোরেট শ্রেণীর হাত থেকে সঞ্চয়পত্রকে রক্ষা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো ও অধিক সুদ পরিশোধে বাজেটের ওপর সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপকে হ্রাস করতেই মূলত নানামুখী সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

প্রসঙ্গত, সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের কমপক্ষে প্রতি দুই মাস অন্তর সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সে হিসাবে জুলাই-মার্চ- এ সময়ে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৯ হাজার ৭৩৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ হার সবচেয়ে বেশি নির্ধারণ করেছে। মূলত সমাজের পেনশনভোগী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে এখান থেকে সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সুদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, বর্তমানে বছরে এ ঋণের সুদ-আসল বাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

সরকারী চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বছরে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় তার থেকেও এ ব্যয় এক হাজার কোটি টাকা বেশি। তাই শীঘ্রই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের লাগাম টানতে চায় সরকার। এ জন্য এ খাতে বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। সূত্র মতে, সংস্কারের আরও একটি অংশ হচ্ছে আগামীতে সঞ্চয়পত্র বেচাবিক্রিতে সংকুচিত করা। যে কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ঘাটতি বাজেট পূরণে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। এ খাত থেকে ঋণ নেয়া হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে এই খাত থেকে ১২ হাজার ২৯ কোটি টাকা কম নেয়া হবে।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, সাধারণত সঞ্চয়পত্রের সুদ হার বেশি থাকার কারণে সরকারকে বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয় এ খাতে। এতে বছর শেষে সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে বড় অঙ্কের টাকা চলে যায়। যা শেষ পর্যন্ত বাজেটের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। বাজেটকে কিছুটা চাপমুক্ত করতে সঞ্চয়পত্র থেকে কম টাকা নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া এ খাতে সুদ হার বেশি হওয়া ব্যাংকের আমানতকারীরাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে।

বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রে একজন ব্যক্তি একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্রের মধ্যে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি সুদ দিচ্ছে সরকার। এ হার ১১.৭৬ শতাংশ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন সরকারী, আধাসরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা। এতে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। তবে দেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে ‘পরিবার সঞ্চয়পত্রে’। এতে সুদের হার ১১.৫২ শতাংশ।

প্রাপ্তবয়স্ক যে কোন নারী এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। পাঁচ বছর মেয়াদী ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র দেশের যে কোন নাগরিক কিনতে পারেন। একক নামে ৩০ লাখ ও যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে এই দুই সঞ্চয়পত্রে। এছাড়া ৫ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ ও ৩ বছর মেয়াদী ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর আগে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমানো হয়।

লেখক: রহিম শেখ , জনকন্ঠ ।