তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে চলছে সবজি চাষ

নিউজ ডেস্ক:   গাইবান্ধার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলার ২২ ইউনিয়নের ১৬৫টি চরাঞ্চলে এক সময়ে নিষ্ফলা বালুময় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন মরিচ, মিষ্টি আলু, পটোল, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা সবজির চাষ হচ্ছে। এছাড়াও স্বল্পমাত্রায় কাউন, তিল, বাদাম, পেঁয়াজ, বেগুন এবং সব জাতের ডালের আবাদ করা হচ্ছে। চরাঞ্চলের পলিপড়া জমিতে এসব ফসলের ফলনও হচ্ছে বাম্পার। ফলে অনুর্বর বালুময় ভূমিতে উল্লেখিত সবজি চাষ করে একসময়ের মঙ্গাকবলিত এসব এলাকার অসংখ্য পরিবার ইতোমধ্যে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। অথচ এসব জমিতে ফসলের চাষ হবে কেউ তা আগে ভাবেনি। ফলে চরাঞ্চলের সেই মঙ্গার কষ্ট এখন আর নেই। এতে কৃষক পরিবারগুলোতে আর্থিক সচ্ছলতাও ফিরে আসছে।

বালুময় এসব ভূমিতে ভুট্টা ও মিষ্টি কুমড়া চাষ করে কৃষকরা ব্যাপকভাবে সাফল্য লাভ করায় ক্রমে তারা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি বেশি মাত্রায় মরিচ, পটোল ও বেগুন চাষ শুরু করে। গাইবান্ধা জেলার ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদী বেষ্টিত ওইসব চর ইউনিয়নের শতাধিক চরে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে একমাত্র ফুলছড়িতেই প্রায় ৭শ’ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয়। কোন কোন কৃষক ১০ থেকে ১৫ বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছে। গত কয়েক বছর থেকে বালুকাময় পলি মাটি প্রচুর ফলন হওয়ায় কৃষকরা মরিচ চাষে ঝুঁকে পড়ে।

বর্তমানে ফুলছড়ি হাট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় মরিচের হাট। চরাঞ্চল থেকে কৃষকরা নৌকায় মরিচ নিয়ে আসে এখানকার আড়তদারের কাছে। ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে এসে হাট থেকে সস্তায় মরিচ কিনে নিয়ে যায়। চরাঞ্চলের জমিগুলোতে কৃষকরা মরিচ চাষে উৎসাহী হয়ে ওঠায় নদী তীরবর্তী গ্রামীণ হাটগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তাই হাটগুলোতে এখন সারাবছর কাঁচা, পাকা এবং শুকনা মরিচের ব্যবসা জমে উঠেছে। কম খরচ ও শ্রমে অধিক লাভবান হওয়ায় চরাঞ্চলের মানুষের কাছে মরিচ একটি লাভজনক ফসল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এদিকে জেলার ফুলছড়ির উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনার চরসহ অন্যান্য চরাঞ্চলে ভুট্টা, মরিচ, মিষ্টি কুমড়ার পাশাপাশি পটোল চাষও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পটোল চাষীরা জানান, কার্তিক মাসে জমিতে ৩ থেকে ৪টি চাষ দিয়ে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি মাটির নিচে পটোলের লতা (গাছ) রোপণ করা হয়। বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ফলন দেয়। জানা গেছে, জেলায় প্রায় ২শ’ হেক্টর জমিতে পটোল চাষ করা হয়েছে। পটোলের পচন রোধে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে জমিতে গোবর সার এবং জৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে চাষীরা পটোল চাষ করতে শুরু করেছে। এতে পটোল চাষ করে কৃষকরা যেমন পটোলের মান বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছে তেমনি জমিতে বিঘা প্রতি উৎপাদনের হারও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জৈব সার প্রয়োগ করে পটোল চাষ করায় উৎপাদন ব্যয়ও হয়েছে অনেক কম।

অপরদিকে জেলার চরাঞ্চলগুলোতে কুমড়া চাষ করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চরাঞ্চলের কৃষকরা। কুমড়ার বাম্পার ফলনে অব্যাহত নদী ভাঙ্গনে জমি ও বসতবাড়ি হারানো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসহায় মানুষ খুঁজে পেয়েছে জীবন জীবিকার পথ। সেইসাথে এক সময়ের অবহেলিত বিরান বালুময় চরাঞ্চল এখন সবুজ ফসলের প্রাণবন্ত ছোঁয়ায় রুক্ষ পরিবেশের বিরূপ চিত্রকেই যেন বদলে দিয়েছে। চর এলাকায় নিজ উদ্যোগে চরাঞ্চলে জেগে ওঠা জমির মালিকরা ২ থেকে ৩ ফুট গর্ত করে চাষ করেছে কুমড়া। তাই গোটা চরাঞ্চল জুড়েই এখন সবুজ ফসলের সমারোহ। জানা গেছে, এখন চরাঞ্চলে প্রায় সোয়া দুই হাজার হেক্টর জমিতে কুমড়ার চাষ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম খরচে এবং স্বল্প পরিশ্রমে কুমড়া চাষ করা যায়। ফলে যে হারে চরাঞ্চলে কুমড়া চাষীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে করে আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে গোটা চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কুমড়া চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেখতে টুক টুকে লাল রঙের ‘কমলা সুন্দরী’ মিষ্টি আলুর চাষ হচ্ছে এখন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার রামনগর গ্রামের কাটাখালী নদীর তীরের ধু-ধু বালি চরে। এখানকার উৎপাদিত এই কমলা সুন্দরী মিষ্টি আলু বিক্রি হচ্ছে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। অল্প সময় ও স্বল্প ব্যয়ে দাম বেশি পেয়ে কৃষকরা খুব খুশি। এই আলু চাষে স্বাবলম্বী হয়েছে অনেক কৃষক।

এছাড়াও চরাঞ্চলে মিষ্টি আলুর চাষ এখন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, কোন রকম কীটনাশক, সেচ প্রয়োগ, পরিচর্যা ও অন্যান্য ব্যয় ছাড়াই বিঘা প্রতি এই জাতের মিষ্টি আলু উৎপাদন হয় ৭০ থেকে ৮০ মণ। যা বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি মণ ৫শ’ টাকা। বিঘা প্রতি আয় হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা। জমি থেকেই ব্যবসায়ীরা আলু ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে মিষ্টি আলু চাষ করে কৃষকরা যথেষ্ট লাভবান হচ্ছে এবং বাজারে মিষ্টি আলুর সরবরাহ বাড়ছে। ফলে শহর এলাকায় এখন মিষ্টি আলু নাস্তা হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

চরাঞ্চলের জমিতে মরিচ, পটোল, কুমড়া, ভুট্টা, মিষ্টি আলু চাষে সাফল্য আসায় এখন কৃষকরা ইতোপূর্বে যেসব ফসল চাষ বন্ধ করে দিয়েছিল, সেসব ফসল চাষে এখন আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে এখন চরাঞ্চলগুলোতে তিল, কাউন, মসুরসহ সব জাতের ডাল, পেঁয়াজ, বেগুন, বাদাম এবং পাট চাষও করতে শুরু করেছে।