পিতামাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার?

তাসলিমা ইয়াসমিন:  বাংলাদেশে পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য আইনের কাঠামোয় আনা হয়েছে। ২০১৩ সালে গৃহীত ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইনে’ দায়িত্ব লঙ্ঘনের অপরাধে দণ্ডিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আইনটি গ্রহণের পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে, এটা নিয়ে খুব একটা বিতর্ক হয়নি। সম্প্রতি এই আইনের আওতায় খসড়া বিধিমালা তৈরি করার পর তা আলোচনায় এসেছে। বিধিমালার একটি ধারায় পিতামাতার পরিচর্যার বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, সন্তান নিজে উপস্থিত না থাকতে পারলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাঁর ‘স্ত্রী’ পিতামাতার পরিচর্যা করবেন। অর্থাৎ ধরেই নেওয়া হয়েছে, যথাযথ কারণে যে সন্তান পিতামাতার সঙ্গে থাকছেন না, তিনি নিশ্চয়ই পুত্রসন্তান হবেন। এই ধারাটি প্রথাগত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক ধ্যানধারণার একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলন।

আসলে পুরো বিধিমালাটিই প্রচলিত পারিবারিক নৈতিকতা আর মূল্যবোধকে আইনের মাধ্যমে অপরিবর্তিত রাখার চেষ্টা। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতামাতার ভরণপোষণ দিতে হবে এবং ভরণপোষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে পিতামাতার সঙ্গে একত্রে বসবাস করতে হবে। ভরণপোষণের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হচ্ছে, ‘খাওয়াদাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদান।’ অর্থাৎ এই আইনটিতে ভরণপোষণ বলতে কোনো অর্থের পরিমাণকে বোঝানো হচ্ছে না বরং পিতামাতার প্রতি সন্তানের বিবিধ দায়িত্ব পালন এবং সেবা প্রদানকেই বোঝানো হচ্ছে। আইনটি বলছে, প্রত্যেক সন্তান পিতামাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য পরিচর্যার ব্যবস্থা করবেন এবং একসঙ্গে না থাকলে নিয়মিত সাক্ষাৎ করবেন। এভাবে ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হলে আইনটি পিতামাতাকে সুযোগ করে দিচ্ছে সন্তানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার। যার শাস্তি হিসেবে সন্তানের জেল-জরিমানার কথাই বলা আছে।

ভরণপোষণের সংজ্ঞায় ‘সঙ্গ প্রদান’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা আইনে না থাকলেও খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে ‘নিয়মিত সঙ্গ প্রদান করতে হবে, তবে সন্তান চাকরিবাকরি বা অন্য উপযুক্ত কারণে একত্রে না থাকতে পারলে বছরে দুবার সাক্ষাৎ করবে।’ বিধিমালাটি এমনকি আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার বিষয়টিকেও ‘সঙ্গ প্রদান’-এর ধারায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এই সবকিছুই ভরণপোষণের সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে, যার ব্যত্যয় হলে তা হবে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সামাজিক মূল্যবোধের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আইনটিকে মানবিক মনে হলেও সামাজিক রীতিনীতি, নৈতিকতা আর মূল্যবোধ আইনের বিষয়বস্তু হতে পারে কি না, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। আইনের বিষয়বস্তু অবশ্যই সুনির্দিষ্ট এবং আইনত প্রয়োগযোগ্য হতে হবে, নয়তো আইন রয়ে যাবে শুধু কাগজে-কলমে। তাতে করে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হবে।

২০১৩ সালের আইনটিতে আরও কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, যা খসড়া বিধিমালায় পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। আইনটি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে পিতা বা মাতার সর্বনিম্ন বয়সসীমা, উপার্জনের উৎস বা আর্থিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘সন্তান’-এর ক্ষেত্রেও শুধু ‘সক্ষম ও সামর্থ্যবান’ সন্তানকেই বোঝানো হচ্ছে। কোনো বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। খসড়া বিধিমালায় সক্ষম ও সামর্থ্যবান সন্তানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, পরিবারের ভরণপোষণের ব্যয় নির্বাহে সক্ষম সব ব্যক্তি। অর্থাৎ পরিবারের আয়-উপার্জনকারী সন্তানের বয়স ১৮ বছরের নীচে হলেও এই আইনের আওতায় তার ওপর ভরণপোষণের দায়িত্ব বর্তায়।

তা ছাড়া, পিতামাতা যদি সন্তানের প্রতি নির্যাতনপ্রবণ হয় বা সন্তানকে শৈশবেই পরিত্যক্ত করে থাকে, সে ক্ষেত্রে ভরণপোষণের দায়িত্বে কোনো ব্যতিক্রম রাখা হয়নি আইনটিতে। একই সঙ্গে আইনটি সাধারণভাবে ধরে নিচ্ছে, পিতামাতা সব সময়ই একত্রেই বসবাস করছেন। অথচ পিতামাতার যদি বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে থাকে বা তাঁরা যদি পৃথক বসবাস করেন, তখন সন্তানেরা কাকে ভরণপোষণ দেবেন বা কার সঙ্গে বসবাস করবেন ও পরিচর্যা করবেন—এই বিষয়গুলো অস্পষ্ট রয়ে গেছে খসড়াটিতে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আইনটিতে ‘সন্তান’-এর সংজ্ঞায় পুত্র বা কন্যাসন্তানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখা হয়নি। এটি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিকর হলেও একটি বড় প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়। যেখানে সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পারিবারিক আইনের আওতায় এখনো কন্যাসন্তানকে পিতামাতার সম্পত্তির সমান অংশীদার ভাবা হয় না, সেখানে ভরণপোষণের ব্যয় নির্বাহের বেলায় সেই বিভাজনটির কোনো প্রতিফলন যদি না থাকে, তবে তাতে কন্যাসন্তানের প্রতি আইন দিয়েই অবিচার করা হবে। খসড়া বিধিটি চূড়ান্ত করার আগে এই বিষয়টিও নজরে আনা হবে বলে আশা করা যায়।

এশিয়ায় ভারত ও সিঙ্গাপুরেও পিতামাতার ভরণপোষণের আইন আছে, উভয় দেশে সন্তান পিতামাতার ভরণপোষণ দিতে আইনত বাধ্য। তবে পার্থক্য হলো, তাদের আইনে আদালত দেওয়ানি প্রতিকার হিসেবে ভরণপোষণ বাবদ নির্দিষ্ট অর্থ প্রদানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু আমাদের আইনে ভরণপোষণকে যখন অর্থের বদলে সেবা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে এবং তার লঙ্ঘনকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তখন এই আইনটি বাস্তবে কতটুকু প্রয়োগ করা সম্ভব, আর তার ফলে বৃদ্ধ পিতামাতার সামাজিক নিরাপত্তা তাতে কমবে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন।

সামাজিক সমস্যার সমাধান আসলে করতে হবে সামাজিকভাবেই। কঠোর আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না। বৃদ্ধ পিতা বা মাতাকে যখন তাঁর সন্তানেরা একাকিত্বতে ঠেলে দেন, তখন এর সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে আমাদের দুর্বল সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোরও দায় রয়েছে। আমাদের চিহ্নিত করতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর সেই সমস্যাগুলোকে, যা বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতাকে সন্তানের মুখাপেক্ষী করতে বাধ্য করে। যে হারে আমাদের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে, সেই অনুপাতে কি বয়স্ক ভাতা, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম, চিকিৎসাসেবা বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে? এই প্রশ্নটি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা উচিত।

লেখক:  তাসলিমা ইয়াসমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ।