এত বিদ্যুৎ উৎপাদন তবুও বিভ্রাট

নিউজ ডেস্ক:   এত বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত তবুও বিভ্রাট । উৎপাদন ক্ষমতা ১৮৫৬৪ মেগাওয়াট, চাহিদা ১২৫০০ মেগাওয়াট । মে মাসে রের্কড পরিমান উৎপাদন প্রায় ১২ হাজার ৪ শত মেগাওয়াট ।

তার পরও এই গ্রীষ্ফ্মে গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে অবশ্য বিভ্রাটের পরিমাণ কম। এর মূল কারণ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনে সমস্যা। বিগত বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু ট্রান্সফরমার এবং লাইনের সক্ষমতা সেই হারে বাড়ানো হয়নি। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা উদ্বৃত্ত হলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, গ্রাহক বেড়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে সঞ্চালন সক্ষমতাও। তবে বিতরণ লাইনের সক্ষমতা যে হারে বাড়ানোর দরকার ছিল, সে হারে হয়নি। কারণ, ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বিতরণ লাইনও টানা হয়েছে। ট্রান্সফরমারের ক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। এজন্য বহু স্থানে গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। পাচ্ছেন না মানসম্মত সেবাও। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। শহরে বিদ্যুতে স্বস্তি থাকলেও পল্লী অঞ্চলে এখনও দুর্ভোগ রয়েছে। বিশেষ করে আবহাওয়া একটু বিরূপ হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। গরম যত বাড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও বৃদ্ধি পায়। তবে বিদ্যুতের এই ভোগান্তি লোডশেডিং বা উৎপাদন ঘাটতির জন্য নয়। বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে কারিগরি ত্রুটির কারণে এই বিভ্রাট।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনে ব্যাপক মনোযোগ থাকলেও মানসম্মত বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকলেও তা গ্রাহকের ঘরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছানো যাচ্ছে না। দেরিতে হলেও এদিকে মনোযোগ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কয়েক বছরের মধ্যে বিতরণ ব্যবস্থাও ভালো হয়ে যাবে।

বিদ্যুতের উৎপাদন যে হারে বেড়েছে সে হারে গ্রাহক চাহিদা বাড়েনি। গ্রাহক বেড়েছে মূলত আবাসিক খাতে, যাদের লোড চাহিদা কম। দ্রুতগতিতে শিল্পায়ন না হওয়ার কারণে শিল্প গ্রাহক তেমন বাড়েনি। শিল্প গ্রাহকরাই বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। কিন্তু শিল্প খাতে নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি। ফলে অফপিক সময়ে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াটের সচল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে লোড চাহিদা না থাকার কারণে। এ নিয়েও চিন্তায় রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিভ্রাট- জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ম তামিম সমকালকে বলেন, পরিকল্পনা করার সময় সমন্বিতভাবে এটা করা হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ এ তিনটিকে সমন্বয় করে পরিকল্পনা হলে বর্তমানের এ সমস্যা হতো না। তিনি আরও বলেন, সরকার স্বীকার করছে, সমস্যা বিদ্যুৎ বিতরণে। ফলে এদিকে গুরুত্ব দিলেই আশা করা যায় সামনে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে।

বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন : সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, ২০০৯ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ১০ বছর পর ২০১৯ তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ২১ হাজার মেগাওয়াট। চলতি মাসে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট।

গত ১০ বছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ২৭টি থেকে বেড়ে ১৩০টি হয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী ৪৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৯৩ শতাংশ। গ্রাহক সংখ্যা এক কোটি আট লাখ থেকে তিন কোটি ৩২ লাখ হয়েছে। এ সময়ে সঞ্চালনের জন্য তিন হাজার ৪৯৩ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন বেড়েছে। এর আগে ২০০৯ সালে সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার, যা এখন হয়েছে ১১ হাজার ৪৯৩ সার্কিট কিলোমিটার। একই সময়ে গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা বেড়েছে ২৪ হাজার ১০৬ এমভিএ (মেগা ভোল্ট অ্যাম্পিয়ার)। ২০০৯ সালে যা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ, এখন বেড়ে হয়েছে ৩৯ হাজার ৯৭৬ এমভিএ। বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের পরিমাণও এই সময়ে দুই লাখ ৪৮ হাজার কিলোমিটার বেড়েছে। ২০০৯ সালে যা ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ আট হাজার কিলোমিটারে। ২০০৯ সালে বিদ্যুতে উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের এর পরিমাণ ২৫ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।

তবুও নেই নিরবচ্ছিন্ন সেবা : বর্তমানে দেশের গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৮ হাজার ৫৬৪ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি রয়েছে। কিন্তু গ্রাহকরা আজও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতসেবা পাচ্ছেন না। একটু গরম বাড়লে ঢাকাতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। মফস্বল শহর ও গ্রামে এ সমস্যা আরও বেশি। পিডিবির (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) একজন প্রকৌশলী বলেন, বিতরণ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে ও গ্রাহক চাহিদা কম থাকায় ক্ষমতার সবটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন গত এক দশকে চারগুণ বেড়েছে। সঞ্চালনের ক্ষমতাও বেড়েছে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছাতে বিতরণ ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি।

বর্তমানের সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের সঙ্গে আগামী কয়েক বছরে আরও কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। এগুলো হলো পায়রার এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট (২০১৯-২০ সালে)। রামপালের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, মাতারবাড়ীর দুই হাজার ৪০০ ও রূপপুরের দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বিতরণ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন না হলে সমস্যা কাটবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, দেশের মানুষের আয় বেড়েছে। বেড়েছে বিদ্যুতের গ্রাহক। উৎপাদনও বেড়েছে। আয় বাড়ার কারণে জনগণ দৈনন্দিন কাজে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটরের পাশাপাশি অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যেমন এসি, রাইস কুকার, ওভেন ব্যবহার করছেন। এজন্য হঠাৎ করে বিদ্যুতের লোড চাহিদা বাড়ছে। সে অনুসারে বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। ফলে লাইন ও ট্রান্সফরমার ওভারলোড হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।

দেশে এককভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং নর্থ জোন পাওয়ার কোম্পানি (নেসকো) গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ করে।

উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ২০০৮ সালে পিজিসিবির গ্রিড উপকেন্দ্র ছিল ৯৫টি। গত ১০ বছরে এসব উপকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে ১৫৮টিতে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। সে তুলনায় বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন কম হয়েছে। দেশের তিন কোটি ৩২ লাখ গ্রাহকের মধ্যে দুই কোটি ৬০ লাখ আরইবির। এই গ্রাহকরাই বেশি দুর্ভোগের শিকার। লোডশেডিং, কম ভোল্টেজ তাদের নিত্যদিনের সমস্যা। বাদ নেই খোদ রাজধানীও। একটু গরম বাড়লেই ঢাকার যাত্রাবাড়ী, বনশ্রী, মতিঝিল, বসুন্ধরা ও টঙ্গী এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়।

বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও বিতরণ লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। তারা বলছেন, বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ হচ্ছে। আগামীতে জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে। জানা যায়, দীর্ঘমেয়াদি উন্নত সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার জন্য ২০৪১ সালের মধ্যে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর মধ্যে সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজন ২৫ বিলিয়ন ডলার, আর বিতরণ ব্যবস্থার জন্য লাগবে ৩৫ বিলিয়ন ডলার।

চ্যালেঞ্জ প্রাথমিক জ্বালানি : বর্তমানে দেশে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকার নীতির পরিবর্তন করেনি। ফলে আগামীতে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো আমদানি করা কয়লা দিয়ে চালাতে হবে। এদিকে দেশে উত্তোলনযোগ্য অবশিষ্ট গ্যাস দিয়ে বড় জোর ৭-৮ বছর চলতে পারে। ফলে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করেই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উভয়ের দাম বৃদ্ধির বিকল্প থাকবে না।

রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি জার্মানির সিমেন্স, চীনের সিএমসি এবং যুক্তরাজ্যের বিপির সঙ্গে যৌথভাবে পটুয়াখালীর পায়রাতে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। পিডিবি ও যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) যৌথভাবে সমান ক্ষমতার একটি এলএনজিচালিত কেন্দ্র নির্মাণ করতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে সামিট গ্রুপ জিইএর সঙ্গে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এবং ইউনিক পাওয়ার আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে এমওইউ সই করেছে। ভারতের রিলায়েন্স মেঘনাঘাটে ৭৫০ মেগাওয়াটের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়।

সাগরে বড় মজুদ না পেলে গ্যাস আমদানি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না। আর আমদানি মূল্য বেশি বলে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। কারণ পুরোটা ভর্তুকি দিয়ে চালানো সম্ভব না। এখন দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি থেকে সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে। এতেই সরকারের বছরে ভর্তুকি লাগবে ২৪ হাজার কোটি টাকা। এর পরিমাণ আরও বাড়বে ভবিষ্যতে। তখন সরকারকে গ্যাস বিদ্যুৎ তেলের দাম বাড়াতেই হবে।

দেশে চলমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা বর্তমানে ২৯৮ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় ১১৬ কোটি ঘনফুট। এখন দুটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, একটি এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা চালাতে হলে ১০ টন কয়লা লাগে। এ হিসাবে এখন নির্মাণাধীন তিন হাজার ৮০০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত কেন্দ্রের জন্য দৈনিক প্রয়োজন হবে ৩৮ হাজার টন কয়লা। বার্ষিক চাহিদার পরিমাণ এক কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টন।

লেখক:  সবুজ ইউনুস