মাদক ‘খাট’ কি পালঙ্কে ঘুমিয়ে গেছে?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম*

আমরা অতি প্রাচীন কাল থেকে যেমন পান-শুপারী খেয়ে আসছি পূর্ব আফ্রিকা, বিশেষ করে হর্ণ অব আফ্রিকা (ইরিত্রিয়া, জিবুতি, ইথিওপিয়া, ও সোমালিয়া) এবং এশিয়ান পেনিনসুলার (ইয়েমেন, ওমান. সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি) কিছু দেশের মানুষ তেমনি এক ধরনের গাছের কচি কাঁচাপাতা মুখে ভরে দীর্ঘ সময় ধরে চিবিয়ে খেতে অভ্যস্ত। আবার কেউ এর পাতা শুকিয়ে গুড়ো করে ড্রিংকস বানিয়ে বা চা হিসেবে খায়, কেউ সিগারেট বানিয়ে খায়। কচি খাটপাতার রসের স্বাদ ’এস্ট্রিনজেন্ট সুইট’ বা কষাটে মিষ্টি। তাদের এই ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় নেশাখাদ্য (?) চর্চার নাম এন.পি.এস (নিউ সাইকোট্রফিক সাবটেনসেস)। প্রচলিত আমহারিক (ইথিওপিয়া) ভাষায় এর নাম ’খাট’ যা- সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করেছে নতুন মাদকদ্রব্য হিসেবে এবং এর চালান ধরাও পড়েছে। সম্প্রতি ইয়াবার বন্যায় সয়লাব হয়ে যাওয়া সংবাদ দেখতে দেখতে মাদক ‘খাট’ ইস্যুটি চাপা পড়ে গেচে। ’খাট’ কি তবে সবার অগোচরে পালঙ্কের নিচে আরামে নিচে ঘুমিয়ে গেছে? ’খাট’ বিষয়ে আর নতুন কিছু দৃষ্টিগোচর না হলেও ভিন্ননামে ভিন্নভাবে এর ব্যবহার হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকা দরকার।

চিরসবুজ ও বীজবিহীন এই উদ্ভিদটি আগে শুধু বুনো ঝোপ-ঝাড়ে জন্মাতো। এখন কোথাও গোপনে কোথাও ওপেনে এর ব্যাপক চাষাবাদ হয়। এটা যে কোন আবহাওয়াতে জন্মে ! এর বৈজ্ঞানিক নাম কাথা এডুলিস ফর্কস। এর একটি প্রজাতি শিশু ইউক্যালিপ্টাস গাছের কান্ডের মত দেখতে সুন্দর। কিন্তু আকারে ছোট-খাটো। পাতাগুলো ওই গাছের পাতার মত। এর কচি পাতায় এ্যরোমেটিক ঘ্রাণ আছে। কচি ডাল ও পাতা মুখে পুরে গাল ফুলিয়ে রাস্তায় হেঁটে চলা বা কোন বিয়ে বাড়িতে গিয়ে সামনের ট্রেতে রক্ষিত খাবারের মত তুলে নিয়ে ভরা মুখে গল্প করা যেন তাদের চিরায়ত রেয়াজ ! তবে পানের মত সাথে চুন বা অন্য কিছু ব্যবহার করে না ওরা। পিক করে পিচকারী দিয়ে থুখুও ফেলেনা। কোথাও নোংরা করে না। কেউ পুরো রস-কেউবা পাতার অবশিষ্টাংশও খেয়ে ফেলে। কচি খাটপাতার রসের স্বাদ কষাটে মিষ্টি হওয়ায় শিশুরাও পছন্দ করে।

আসলেও তাই। কারণ, এ পাতার রসে এলক্যালাইড, এমেইনো এসিড, তারপিনোইড, স্টেরোল, ভিটামিন, মিনেরাল ইত্যাদি নানা রাসায়নিক যৌগ রযেছে যা রয়েছে যা ফার্মাকোলজিক্যাল দৃষ্টিকোন থেকে কাঠামোগতভাবে ’এমপেথামিন’-এর বৈশিষ্ট্যের অনুরুপ। কোন কোন দেশে এটাকে চা-পাতার মত গরম পানিতে দিয়ে লিকার বানিয়ে পান করা হয়। এত দেহ-মনে মৃদু উদ্দীপনা জাগে। তবে লিকারের চেয়ে তাজা কচি খাটপাতা চিবিয়ে খাওয়ার প্রবণতা বেশী লক্ষ্যণীয়।

হর্ণ অব আফ্রিকা ও এশিয়ান পেনিনসুলার দেশগুলোর মানুষের মধ্যে খাটপাতা চিবানোর প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। এর মধ্যে তাঁদের একটি গভীর সামাজিক ও কৃষ্টিগত ট্রাডিশন বা ঐতিহ্য জড়িত রয়েছে। তারে সমাজে বিয়ে বাড়িতে তাজা কচি খাটপাতার আটি খাবারের ট্রেতে পরিবেশন করা হয়। মুসলিম, ইহুদি, খৃষ্টান সব ধর্মের মানুষ সামাজিক অনুষ্ঠানে খাটপাতা চিবিয়ে খান। কেউ এর চা পান করেন। কেউবা চুরুট! নাচ-গানের আসরে খাটপাতা না হলে ওদের জমে না! পরীক্ষার আগে কোন কোন শিক্ষার্থী খাটপাতা চিবিয়ে নেয়। ইয়েমেনীরা মনে করেন, খাটপাতা চিবালে জ্বর, মাথাব্যাথা, ঠান্ডালাগা ও আর্থারাইটিসের উপশম হয়।

এছাড়া অনেকে মনে করেন- খাটপাতা তাদের অর্থনীতি, ব্যবসা ও জীবিকার সাথেও জড়িত। কিছু দেশে সরকারী নিষেধাজ্ঞা থাকায় বন-বাদাড় থেকে সংগ্রহ করে গোপনে এর ব্যবসা করা হলেও অনেক দেশে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। সেসকল দেশে খাটপাতা জন্মানোর জন্য গাছের পরিকল্পিত বাগান রয়েছে। যেমন, ইয়েমেনে শিশুরা খাটবাগানে কাজ করে। তারা গাছের মগডালে উঠে কচি খাটপাতা সংগ্রহ করে আটি বেঁধে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে থাকে। একশ’গ্রাম ওজনের এক প্যাকেট কচি তাজা খাটপাতার খুচরা বাজারমূল্য ৫০০ ইয়েমেনী রিয়েল বা প্রায় দুই ইউএস ডলার ! ইয়েমেনের অনেক দরিদ্র শিশু পাহাড়-বন ঘুড়ে ঝোপ-ঝাড় থেকে খাটপাতা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে। সেখানে অনেক শিশু ব্যাপকভাবে খাটপাতা চিবিয়ে খেতে অভ্যস্ত ও আসক্ত !

এক জরিপে দেখা গেছে- ইয়েমেনের অনেক মানুষ মনে করে খাটপাতার চাষ বা বাগান বন্ধ করা যাবে না। এটা তাদের কৃষ্টিগত ঐতিহ্যের অংশ। তারা বলেন, পশ্চিমারা এখানে এটাকে মাদক মনে করে কৌশলে তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে প্রচলিতএই ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ তুলে দিয়ে তাদের দেশে ম্যগডোনাল্ডস-এর দোকান বসিয়ে মানুষকে মুরগী ভাজার সাথে কৃত্রিম পানীয় খাওয়া শেখাতে চায় চায়। পশ্চিমারা দিনরাত নানা ব্রান্ডের মাদক খায়, আমরা তো কিছু বলি না। ইয়েমেনের মানুষ ম্যগডোনাল্ডস এর খাবার খেয়ে হার্ট এ্যাটাকে মরতে চায় না ! (তাজুরে ওয়াবির: ২০১১)।

অন্যদিকে ইয়েমেনের সানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাল্টি অব মেডিসিন এন্ড হেল্থ সাইন্সের ড. নাগীব হাসসান ও অন্যান্যদের (২০০৫) লেখা ‘খাট স্বাস্থ্য প্রেক্ষিত ও খাট চর্বন’ রচনা থেকে জানা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক ইয়েমেনীরা প্রতিদিন খাটপাতা চিবিয়ে খায়। এত ক্যাথেইনোনম নামক এক ধরণের কার্যকরী উপাদান রয়েছে যা দেহ মনে মৃদু উদ্দীপনা জাগায়। তবে এর গণস্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়া ও সমস্যার কথাও তারা জানেন। মানবদেহে এর প্রভাবে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র , কার্ডিওভাসক্যুলার, হজম, মুখ ও দাঁতের টিস্যু সর্বপোরি মুত্র নি:সরণ ও প্রজনন (জেনিটোরিনারি) সিস্টেমে খাট-এর প্রভাব বহুমুখী।

খাট-এর বহুমুখী প্রভাবে অনেক জটিল ও নেতিবাচক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। গবেষক নাসির তাজুরে ওয়াবির (২০১১)-এর খাট-এর উপর লেখা ’কেমিস্ট্রি, সাইকোলজি এন্ড টক্সিকোলজি অব খাট’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যায় ভয়ংকর কিছু তথ্য। তিনি খাটের বিষক্রিয়া সংক্রান্ত নানা জটিল অসুখের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, খাট সেবনের বিষক্রিয়ায় সেবনকারীর উচ্চ রক্তচাপ, নিদ্রাহীনতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাইগ্রেন, হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা, ক্ষুধামন্দা, ডিপ্রেশন, বদমেজাজী, কাজে অমনেযোগীতা, ঝিমুনি, পুরুষের যৌন অক্ষমতা ও মানসিক বৈকল্য ঘটতে পার।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে খাট একটি মাদকদ্রব্য। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮০ সালে এর ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে সতর্কবার্তা জানিয়ে দিয়েছে। উল্লিখিত ড. নাগীব বা ড. ওয়াবীরের গবেষণা ফলাফল ছাড়াও এ মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে আরো অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা হযেছে। জানা গেছে- খাটপাতা সেবন মানুষের দৃষ্টিভ্রম ঘটায়, ইন্দ্রিয় দৌর্বল্য আনে, যৌনশক্তি ও জীবনীশক্তি ফুরিয়ে ফতুর করে দেয়।

কয়েকমাস পূর্বে বাংলাদেশে হঠাৎ করেই নতুন মাদকদ্রব্য হিসেবে খাটপাতা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিমানবন্দরে এর অনেকগুলো চালান ধরাও পড়ছে। গ্রীন টি আমদানির নামে শুকনো খাটপাতা আমদানী করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু মানুষ মাদক সেবন করাকে খারাপ চোখে দেখে থাকে কিন্তু সরকারীভাবে দুর্বল ও শিথিল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ও ঘুষ-দুর্নীতিতে আইনি ভয় ও সামাজিক ঘৃণাবোধ না থাকায় বাংলাদেশের কিছু মানুষ খুবই বেপরোয়াভাবে মাদক ব্যবসাকে লালন করতে অভ্যস্ত।এদেশে একজন চিহ্নিত মাদকাসক্ত ব্যক্তি লোকলজ্জার ভয়ে কখনও মসজিদে প্রবেশের সাহস করে না অথবা তাকে মাতাল বলে মসজিদ প্রাঙ্গন থেকেই তাড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী,দুর্নীতিবাজ কিংবা ঘুষখোর ব্যক্তি অনায়াসে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা অনুষ্ঠানে দান-খয়রাত করতে পারে। এদের দেশপ্রেম বলতে কিছু নেই, পাপ অথবা ঘৃণাবোধ কেনটিই নেই। অনেক সময় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আভাষ পাওয়া মাত্র এরা নিজেদের লাভ-লোকসানের হিসেব কষে নিজেদের ভোল পাল্টিয়ে ফেলে। এরা ভন্ড, এদের চরিত্র বড় বিচিত্র। রাজনৈতিক নেতাদের সাথে এদের ঘনিষ্ঠ সখ্যতা লক্ষ্যনীয় এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকজনের সাথে এদের গোপন সংকেতে লেন-দেন হয়। কাজেই বাংলাদেশে এটা ওপেন সিক্রেট এবং এমনিতেই এদেশটি ইয়াবাসহ নানা মাদকদ্রব্যের নিশানাস্থল। সেজন্য দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য পাচারের অতি সহজ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে এ পর্যন্ত যতদুর জানা যায়- আকাশপথে সেবাদানকারী সংশ্লিষ্ট সেবক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষগুলোর অবহেলা, ও অনৈতিক কর্মকান্ড এক্ষেত্রে সিংহভাগ দায়ী। নতুন মাদক ‘খাট’ সে সুযোগে অবাধে বিমানবন্দর দিয়ে এদেশের সীমানায় ঢুকে পড়েছে! সম্প্রতি এ বিষয়ে আর নতুন কিছু দৃষ্টিগোচর না হলেও ভিন্ননামে ভিন্নভাবে এর ব্যবহার হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার।

আমরা জানি, সহজ-সরল, ধর্মভীরু, কর্মঠ, সৎ, প্রানচঞ্চল আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিটি জনমানুষ। আমাদের তরুন প্রজন্ম আমাদের ভবিষৎ ভরসা, আমাদের অহংকার। আমাদের কর্মস্পৃহাকে কৌশলে দমিয়ে দেয়ার জন্য সুকৌশলে একটি আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র কিছু এদেশীয় লোভী দালালদের সহযোগিতায় এই পুণ্যভূমিতে নিত্যনতুন মাদকের থাবা বিস্তার করার অপচেষ্টা করে চলেছে। অন্য কোন উপায়ে না পেরে মাদক ছড়িয়ে দিয়ে ঘৃণ্যভাব আমাদের আমাদের সৎ-চরিত্র নষ্ট করে দেবার পাঁয়তারা করে চলেছে। তাই ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে আজই এর চৌর্যবৃত্তিক ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। আজ আমাদের সবার নৈতিক ও নিজ নিজ ঈমানী দায়িত্ব হলো- সব ধরনের মাদকদ্রব্য এড়িয়ে চলা, ঘৃণা করা। পাশাপাশি মদ, গাঁজা, হেরোইন, তাড়ি, চোলাই মদ, বাবা ও ইয়াবা-খাটের মত মাদকের জঘন্য ব্যবসার সাথে যারা জিিড়ত (যত লম্বা হাতওয়ালা নামী-দামী ক্ষমতাধর-ই হোক না কেন !) ‘ইয়াবা-খাটের’ মত অবৈধ ও কালো ব্যাবসার হোতারা এখন পুলিশি অভিযানের ভয়ে খাট-পালঙ্কের নিচে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকলেও আসন্ন পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষায় অতি দ্রুত তাদেরকেও পাকড়াও করা ও সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। একটি ইতিবাচক সামাজিক বয়কট আন্দোলনই পারে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে দ্রু ত সব ধরনের মাদকের বিষথাবা থেকে মুক্ত করতে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।