হতাশ কৃষক, সাগরডুবি ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার ভাবনা

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম

অধূনা মোটা হাইব্রীড ধানের আবাদ বেড়ে গেলেও অনেক মানুষ সে ভাত খেতে চান না। সম্পন্ন কৃষকরাই মোটা ধানগুলো দ্রুত বিক্রয় করে দিয়ে নিজেদের জন্য আমনের সুস্বাদুটা রেখে দেন। চিকন চালের ভাত না হলে শিক্ষিত ভদ্র মানুষের মুখে সেটা রোচে না। দেশে অনেক হাইব্রীড ধানের উৎপাদন হলেও শহরের কতটি বাড়িতে সেসব মোটা চালের ভাত রান্না হয়? প্রায় সব অনুষ্ঠানে পোলাও- বিরিয়ানীতে বিদেশী নানা সুগন্ধি চিকন ও বাঁশমতি চালের ব্যবহার হয়ে থাকে যার সিংহভাগই আমদানী করতে হয়। এই মুহুূর্তে এক কেজি হাইব্রীড মোটা চালের বাজার মূল্য ৩০ টাকা হলে সমপরিমাণ সুগন্ধি দেশী চিকন চাল ১০০ টাকা অথবা আমদানীকৃত বাঁশমোতি চালের মূল্য ৩০০ টাকা। অর্থাৎ, দশগুণ বেশী! এমনকি ইফতারীর খিচুড়িতেও চিকন চালের ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, ধান উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে কৃষকদের মধ্যেই বৈপরিত্য লক্ষ্যনীয়।

আমাদের দেশে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হাইব্রীড মোটা চাল মেশিনে কয়েকবার ছেঁটে চিকন করে তাতে আতরের গন্ধ লাগিয়ে বাজারে নকল পোলাও চাল হিসেবে ছড়িয়ে দিলেও সেগুলো মানুষ ধরে ফেলেছে এবং বাজারে মারপিটের ঘটনাও খবরে এসেছে। একমন ধানের দাম ৫০০ টাকা হলেও উৎপাদন খরচ ৭০০ টাকা। স্বভাবিক পন্থায় লাভের মুখ দেখতে না পারায় ব্যবসায়ীগণ অবৈধ পথের আশ্রয় নেন।এদিকে আমাদের দেশে শতকরা কতজন ‘আসল কৃষক’? প্রকৃত হিসেব করলে প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষীর সংখ্যাই বেশী হবে। আমাদের দেশে গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেই জীবিকার তাগিদে শহরে চলে যায়। আর গ্রামে ফিরে আসে না। তাদের জমিগুলো বর্গাচাষীদের হাতে চলে যায়। এভাবে কারো দশবিঘা জমিতে ধান চাষ করা হলে মলিক নয় বিঘায় মোটা হাইব্রীড ধানের আবাদ ও এক বিঘায় সুগন্ধি চিকন দেশীধানের আবাদ করতে নির্দেশ দেন-যেটা তার শহরের বাসায় পৌঁছিয়ে দেয়া হয়! বহু জমির মলিক শহরে বসে ‘ভালোটা’ ভোগ করেন। সবার মোটাধান একসংগে বিক্রির জন্য বাজারে গেলে হঠাৎ দরপতন ঘটে। উৎপাদন খরচ ও উৎপাদিত পণ্যের দামের মধ্যে বিস্তর লোকসান দেখলেই কৃষকদের মাথা গরম হয। শুধু টাঙ্গাইলের কালিহাতির কৃষকের ধানক্ষেতে আগুন দেয়াটাই নয়- প্রতিবছর আলু, টমেটো, ডিম, দুধ, পাট ইত্যাদি রাস্তায় ছুঁড়ে বা আগুন লাগিয়ে দিয়ে কৃষকদেরকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। কৃষিতে উৎপাদনের সাথে ব্যবস্থাপনার সাযুয্য না থাকলে ভবিষ্যতে এসব আরো বাড়তে থাকবে।

মেইজী আমলের পূর্বে জাপানের কৃষকদেরকে লোকসানের হতাশা থেকে এধরনের প্রতিবাদ ও আন্দোলন করতে দেখা যেত। এখন মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে জাপানের ছোট কৃষকদের বাঁচাতে সরকার সমবায়ের মাধ্যমে জাপান এগ্রিকালচার (ঔঅ) পণ্য বিক্রয় কেন্দ্র তৈরী করে ‘ক্রপ-হারভেষ্ট’ নিয়ন্ত্রণ ও নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের প্রতিবাদ সমস্যার সমাধান করেছেন। বাংলাদেশে ভূমিহীন বর্গাচাষী ও মার্জিনাল কৃষক বেশী। যারা স্বপ্ন দেখেন- একমন ধান বেচে মেয়ের ঈদের জামা কিনে দেবেন, বউয়ের শাড়ি-কাপড় কিনবেন। সেই আশায় গুঁড়েবালি হলেই তখন তাঁরা বিগড়ে গিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে আমাদের এই সকল ছোট কৃষকদের বাঁচাতে সরকার সমবায়ের মাধ্যমে জাপানের মত প্রতিটি ইউনিয়নে দ্রুত অন্তত: একটি করে (ইঅ) গঠণের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের পরিকল্পনা হাতে নিতে পারেন।

দেশে কৃষিতে কেন, কোথাও লাভ নেই বিধায় মৌলভীবাজারের এসএসসি পাশ তরুণটিও ভাগ্যান্বেষণে অবৈধ পথে বের হয়ে ভু-মধ্যসাগরে লাশ হয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল। অথচ দেশে যদি উদ্বৃত্ত আলু দিয়ে চিপসের কারখানা হতো, সিলেটের সাতকড়া দিয়ে আচারের কারখানা হতো, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুরের আম, লিচু ও উদ্বৃত্ত টমেটো দিয়ে স্থানীয়ভাবে আচার ও জুসের কারখানা হতো, অথবা সারা দেশে মোটা হাইব্রীড ধানের চাল দিয়ে ‘রাইস কেক’-এর কারখানা হতো তাহলে কত শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষের চাকুরী হতে পারতো। এদিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হতে পারতো। যদিও বর্তমানে দু’একটি দেশী প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরণের কাজ করে চলেছে। একাজটা সরকার করতে পারলে বেকার সমস্যার দ্রুত সমাধান হতো এবং স্থানীয় লাভজনক কৃষিপণ্য অপচয় না হয়ে কৃষকরা তা থেকে লাভবান হতো। বিশেষ করে মোটা হাইব্রীড ধানের বহুমুখী ব্যবহারের জন্য এই বাজেটেই বরাদ্দ রেখে দ্রুত অন্তত: একটি পাইলট পরিকল্পনা হাতে নিতে পারেন। কৃষিতে প্রকৃতিক দুর্যোগের ছোবল নতুন কিছু নয়। এর মোকাবেলায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত করতে আপদকালীন সেবাদান ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। কালবৈশাখী ঝড়ে একটি বিদ্যুৎ -এর খুঁটি উল্টে গেলে অথবা দু’টো গাছের ডাল ভেঙ্গে রাস্তায় পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে প্রয়োজনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সবল লোকদের নিয়ে দ্রুততার সাথে সামাল দেয়ার মত আপদকালীন সেবাদান ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। সব জায়গায় ভাড়া করা গাড়ি, ভাড়া করা মেধা ও কিনে আনা প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে বসে থাকেলে সেটাকে উন্নয়ন বলে না।

ক’ বছর পূর্বে ঈদের ছুটিতে আমার এক স্কুলের সহপাঠীর সংগে প্রায় ৩৩ বছর পর দেখা হয়েছিল। সে বিদেশ ফেরত, গ্রামের অবস্থাপন্ন কৃষকের ছেলে। তার কাছে গ্রীসে যাবার গল্প শুনছিলাম। সে সীমান্ত পথে পেরিয়ে ভারত হয়ে পাকিস্তানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে ইরানে ঢুকেছিল। সেসময় একটি পাহাড়ি খরস্রোতা নদী রাতের আঁধারে সাঁতরে পাড়ি দিতে হয়েছে। তাদের দলে দশ-বারোজন ছিল। উঁচু পাহাড়ের উপর ইরানী সীমান্ত রক্ষীদের সশস্র পাহারাকে ফাঁকি দিয়ে তারা বরফগলা ঠান্ডা পানির নদী পার হয়েছিল। সাঁতারের অভিজ্ঞতা থাকলেও এ যাত্রায় সবাই তীরে উঠতে পারেনি। দু’জন খরস্রোতে ভেসে গিয়েছিল। তাদেরকে আর কোনদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি! বাকীরা তুরস্কে বহুদিন থেকে বহুকষ্টে সীমান্তপথেই গ্রীসে চলে যায়। ক’বছর পূবে গ্রীসের অর্থনৈতিক মন্দার সময় সে নানা কষ্ট স্বীকার করে দেশে চলে আসে। এই ছিল নিয়তি। গেল সপ্তাহে তিউনিশিয়ার কাছে ভূ-মধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে কলেজ ছাত্র বড়লেখা উপজেলার কৃষক পরিবারের সন্তানের সাগরেডুবে মৃত্যুর কথা সংবাদে পড়ে মর্মাহত হয়েছিলাম। এ ঘটনার পর আমাদের দেশের মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই মনে হয।

আমরা অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে ‘আকামাহীন’ ‘ওভারস্টে’ বা ভবঘুরে হয়ে পালিয়ে থাকতে চাই না। গৃহকর্মের চাকুরী নিয়ে সৌদিতে গিয়ে আমাদের মা-বোনেরা কেন নির্যাতিত হবে? এসএসসি-এইচএসি পাশ তরুণেরাও ভাগ্যান্বেষণে অবৈধ পথে বের হয়ে ভু-মধ্যসাগরে বাতাসে ফুলানো বোট ডুবিতে অকালে মারা পড়ে কেন বার বার লাশ হবে? কে বা কারা তাদেরকে দেশ থেকে ভুলিয়ে অজানা পথে পাড়ি জমানোর অবৈধ সুযোগ করে দেয়? প্রতিদিন কেন হাজার হাজার তাজা ইয়াবা ধরা পড়ে? ‘ইয়াবাই’-দুবৃত্তরা কার ইন্ধনে বা আশ্রয়ে কেনইবা এত শক্তিশালী? পরিবেশ রক্ষা ও ব্যবস্থপনার উন্নয়ন না করে শধু অবকাঠামো বানানোর উন্নয়নে কার পকেট তাজা করার মহরৎ চলছে? দেশে প্রান্তিক কৃষক বা চাষীর মাসিক আয় ও চাকুরীজীবিদের মাসিক আয়ের মধ্যে বিস্তর ফাঁরাক তৈরী হওয়ায় কৃষকরা হতাশ হয়ে শেষ সম্বল কৃষি জমিটুকু বন্দক রেখে বা বিক্রি করে তাদের কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া সস্তানকে ঘুষ দিয়ে হলেও সরকারী চাকুরীর পাবার জন্য উৎসাহিত করছে। অধিকাংশ সময় তারা দেশে চাকুরী পাবার প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হয়ে কোন কোন সময় বিভিন্ন দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে ঘুষের টাকাটাও উদ্ধার করতে না পেরে আদরের সন্তানকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশে পাঠাতে কুন্ঠিত হচ্ছে না। যার চরম পরিণতি সাগরে ডুবে মৃত্যু! এর সুষ্ঠু জবাব কে দেবেন?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।