হাওরের কৃষক রক্ষায় চালু হচ্ছে শস্য বীমা

নিউজ ডেস্ক:   দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হাওর এলাকার সাত জেলায় শস্য বীমা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে সাধারণ কৃষকদের রক্ষায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের থেকে প্রিমিয়াম হিসেবে নামমাত্র টাকা নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম চালু হবে। প্রিমিয়ামের বাকি অর্থ দেবে সরকার। পাশাপাশি বিদেশি দাতা সংস্থাকেও এ প্রকল্পে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। এজন্য সাধারণ বীমা করপোরেশন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

সাধারণ বীমা সূত্র জানায়, প্রথমে সাধারণ বীমা করপোরেশন ও বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে বীমা প্রকল্প চালু করা হবে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তত্ত্বাবধানে নীতিনির্ধারণী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এ বীমা কার্যক্রমের প্রিমিয়ামে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হবে। সেজন্য আসন্ন বাজেটে সরকার বরাদ্দ রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এ জন্য কী পরিমাণ বরাদ্দ লাগবে তা এখনও ঠিক হয়নি। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে প্রণোদনার পরিমাণ জানা যাবে। সরকারের পাশাপাশি বিদেশি দাতা সংস্থাকেও এ প্রকল্পে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, অনেকদিন ধরেই শস্য বীমা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সরকার হাওরের জন্য শুরু করছে। এ উদ্যোগের ফলে হাওরের কৃষকদের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এ উদ্যোগকে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো সাধুবাদ জানায়। সরকার চাইলে বেসরকারি বীমা কোম্পানি এ উদ্যোগে সম্পৃক্ত হবে।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, হাওরে বন্যার পরে সরকার কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। এতে সরকারের অনেক ব্যয় হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার কারণে কৃষক প্রকৃতপক্ষে লাভবান হন না। তবে সরকারের ত্রাণ বাবদ ব্যয় যদি বীমার প্রিমিয়ামে প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়, তাহলে কৃষকরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহায়তা পাবেন।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভূপ্রকৃতিগত কারণে বাংলাদেশ যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণও। বর্তমানে এ দেশের ৪৮ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান ১৫ শতাংশের বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হন। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকা হাওরবেষ্টিত হওয়ায় সেখানে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার ফলে অনেক ঝুঁকি তৈরি করে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় শস্য বীমা থাকা আবশ্যক।

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পুরো হাওর এলাকা বাধ্যতামূলকভাবে বীমার আওতায় থাকবে। সাধারণ বীমা করপোরেশন পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে প্রকল্পটি পরিচালনার চেষ্টা করছে। এ প্রকল্পে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি অধিদপ্তর, ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাকেও সম্পৃক্ত করা হবে। কৃষি ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা এ বীমার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কৃষকদের ঋণ দেওয়ার সময় ঋণের শর্ত হিসেবে বীমা করা হবে। এতে ঋণ যেমন নিরাপদ হবে, তেমনি বীমা কার্যক্রম সহজে পরিচালিত হবে। তবে যেসব কৃষক ব্যাংক ও এনজিওর ঋণে সম্পৃক্ত নয়, তাদেরও বীমার আওতায় আনা হবে।

সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হাওরবেষ্টিত। এই সাত জেলার মোট কৃষি জমির পরিমাণ ১৯ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর। হাওরের সংখ্যা ৩৭৩। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে বোরো ধান উৎপাদিত হয়, মোট কৃষি জমির ৯০ ভাগ এলাকায় বোরো চাষ হয়। এছাড়া আউশ ও আমন ধান হয়ে থাকে। তবে প্রায় প্রতি বছর বন্যার কারণে হাওর এলাকায় কৃষকদের জানমাল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে কৃষকরা বিশেষ করে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারগুলো আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। পরের বছর কৃষকরা স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে পারেন না। এতে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হয়ে জাতীয় অর্থনীতি চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শস্য বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

২০১৭ সালে হাওর এলাকায় অকাল বন্যায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। সরকার নিজে ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করে বাজার সামাল দেয়। এর আগে ২০০৪, ২০১০ ও ২০১৩ সালেও হাওরে বন্যা হয়েছিল।