ঢাকায় সোয়া লাখ গাড়ি অ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবায়

নিউজ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকায় অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন (রাইড শেয়ারিং) করছে প্রায় সোয়া লাখ মোটরসাইকেল ও কার। এতে নগরবাসী সুবিধাও পাচ্ছে। কিন্তু এই সেবা এখনো আইনি ভিত্তি পায়নি, এক বছর আগের নীতিমালা কাগজে-কলমেই আছে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো করে সেবা দিচ্ছে।

সরকার ও রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, কোম্পানিগুলো দ্রুত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন চাইছে। বিআরটিএও চাইছে এই খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা, ২০১৭-এর তিনটি ধারা এবং পুলিশের দুটি আপত্তিতেই সব আটকে আছে। এখন সুরাহার জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো।

ঢাকায় ২০১৬ সালে অ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং সেবা উবার চালু হয়। বিআরটিএ শুরুতে এটি অবৈধ বলে ঘোষণা করে। পরে জনচাহিদার চাপে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা প্রণয়ন করে। গত বছরের মার্চে কাগজে-কলমে এই নীতিমালা কার্যকর হয়। নীতিমালা অনুসারে, রাইড শেয়ারিং কোম্পানি এবং তাদের চালানো যানবাহন আলাদাভাবে বিআরটিএ থেকে অনুমোদন প্রয়োজন। এটাকে বলা হচ্ছে ‘এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’। নীতিমালা প্রণয়নের পরই ১৬টি কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। এখনো সেই নিবন্ধন হয়নি।

নিবন্ধন না থাকার কারণে রাইড শেয়ারিং সেবায় পুলিশের ৯৯৯ কল করে যে সেবা পাওয়ার কথা, তা–ও পুরোপুরি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়লে চালকের সব তথ্য এবং যাত্রীর অবস্থান সরাসরি পুলিশের কাছে চলে যাওয়ার কথা। এর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারে সঙ্গে চালকের তথ্য যুক্ত থাকা দরকার। কিন্তু কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন না থাকায় এর কোনোটাই হচ্ছে না।

এই অবস্থায় রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাও লিমিটেড, সহজ লিমিটেড ও উবার বাংলাদেশ লিমিটেড গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মদকে চিঠি দিয়েছে। তারা এই খাতের বিকাশে বাধা হিসেবে পাঁচটি বিষয় চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য প্রতিমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছে। পাঁচটি বিষয়ের তিনটি নীতিমালায় আছে, দুটি বিষয় পুলিশের আপত্তি থেকে এসেছে। এগুলো হলো ১. একজন মালিকের একটি গাড়ি একটিমাত্র কোম্পানিতে চালাতে পারবে, ২. নিবন্ধন নেওয়ার এক বছরের মধ্যে রাইড শেয়ারিংয়ে দেওয়া যাবে না,৩. রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া ট্যাক্সিক্যাবের চেয়ে বেশি হতে পারবে না,৪. প্রতিটি কোম্পানি কত যানবাহন নামাতে পারবে (সিলিং), তা ঠিক করে দিতে হবে, ৫. ঢাকার বাইরে নিবন্ধন নেওয়া যানবাহন রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হতে পারবে না।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী গত ২৪ এপ্রিল বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং রাইড শেয়ারিং কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বৈঠক করেন।

বৈঠকে উপস্থিত সূত্র বলছে, সিলিং ঠিক করে দেওয়া, ভাড়ার হার, নিবন্ধনের এক বছরের মধ্যে মোটরযান রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত না করার বিষয়টি সুরাহা হয়নি। একজন মালিক তাঁর যানবাহন একাধিক কোম্পানিতে চালাতে পারবেন, এই বিষয়ে বিআরটিএ নমনীয়। আর ঢাকার বাইরের গাড়ি রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হবে না—এটা মেনে নিতে চায় কোম্পানিগুলো। বাকি সমস্যাগুলো সমাধানে পুলিশকে নিয়ে পুনরায় বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী।

জানতে চাইলে সহজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা কাদির প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের পাঁচটি আপত্তির সুরাহা এবং দ্রুত নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। সবাই এই খাতের ভালো চাইছে। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়নের এক বছর পরও জটিলতা রয়েই গেছে।

রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালার এক জায়গায় বলা হয়েছে, একজন মালিক শুধু একটি মোটরযান রাইড শেয়ারিংয়ের আওতায় পরিচালনা করতে পারবেন। এর অর্থ হচ্ছে, একজন চালকও শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে পারবেন। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো বলছে, এর ফলে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ব্যাহত করবে। এটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিপন্থী। এতে বাজারে চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হবে। মালিক-চালকের ওপর কোম্পানির কর্তৃত্ব বেড়ে যাবে। ফলে এই ধারা বাতিল করতে হবে।

নীতিমালার এক জায়গায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত মোটরযান নিবন্ধন নেওয়ার এক বছরের মধ্যে রাইড শেয়ারিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কোম্পানিগুলো মনে করছে, এর ফলে যাত্রীরা ভালো ও আরামদায়ক যানবাহনের সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। তা ছাড়া এটি উদ্যোক্তাদের জন্য বৈষম্যমূলক ও ব্যবসায়িক নীতিবিরোধী।

রাইড শেয়ারিং সেবার ভাড়া ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়ার চেয়ে বেশি না হওয়ার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর আপত্তি আছে। তারা চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ চায়।

বিআরটিএ সূত্র বলছে, ট্যাক্সিক্যাবের চেয়ে ভাড়া বেশি হবে না—বিষয়টি বিআরটিএ রাখতে চায়। ভাড়ার বিষয়টি নির্দিষ্ট করা না থাকলে কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো সুযোগ থাকবে না।

রাইড শেয়ারিং সেবা নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ চিঠি দিয়ে বিআরটিএকে তিনটি সুপারিশ করেছে। এগুলো হচ্ছে ১০ বছরের পুরোনো যানবাহন রাইড শেয়ারিং সেবায় নিয়োজিত না করার বিধান করা, রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ কী পরিমাণ যানবাহন নিবন্ধন করতে পারবে, তা ঠিক করে দেওয়া এবং শুধু ঢাকা মহানগর থেকে নিবন্ধন নেওয়া যানবাহনই কেবল এ সেবায় যুক্ত হতে পারবে, তা নিশ্চিত করা। পুলিশ বলেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জরাজীর্ণ ও পুরোনো কার-মোটরসাইকেল মেরামত করে ঢাকায় রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হচ্ছে। ঢাকায় ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের কাজের কারণে মূল সড়কের প্রশস্ততা কমেছে। রাইড শেয়ারিং চালু হওয়ার পর ছোট যান বেড়ে গেছে, যা যানজট সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া অদক্ষ চালকের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যেতে পারে। তাই কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ কত যানবাহন চালাতে পারবে, এর একটা সিলিং থাকা উচিত।

তবে বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশার সিলিং ঠিক করে দেওয়ার কারণে যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় এই খাতে নৈরাজ্য চলছে। নীতিমালার গলদের কারণে সরকার কয়েকবার চেষ্টা করেও ট্যাক্সিক্যাব সেবা চালু রাখতে পারেনি। এ ছাড়া মোটরসাইকেল ও কার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তাই রাইড শেয়ারিংয়ে কৃত্রিম বাধা তৈরি করে রাখার কোনো অর্থ হয় না।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ে জনগণ সেবা পাচ্ছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো এখনো আইনি কাঠামোয় আসেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছেন তাঁরা।

অ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং সেবা দিচ্ছে বা দিতে চায়—এমন ১৬টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য বিআরটিএতে আবেদন করেছে। এর মধ্যে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম, রাইডার রাইডশেয়ার এন্টারপ্রাইজ ইনক ও গোল্ডেন রেন লিমিটেড যানবাহনের সংখ্যা জানায়নি। সবচেয়ে বেশি যানবাহন আছে পাঠাও, সহজ, ওভাই সলিউশন, উবার, পিকমি ও হোস্ট ইন্টারন্যাশনালের। সব মিলিয়ে মোটরসাইকেল আছে ১ লাখ ৪ হাজার ৩৮৯, কার ১৮ হাজার ২৫৩টি।

রাজধানীতে প্রায় সাত হাজার বাস–মিনিবাস আছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। শ পাঁচেক ট্যাক্সি ক্যাব আছে, যা খুব একটা চলতে দেখা যায় না। এসব পরিবহনের জন্য আইন, নীতিমালা আছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবায় মানুষ উপকার পাচ্ছে। তবে কিছু কিছু অভিযোগও আসছে, এগুলোর সমাধান দেওয়ার মতো আইনি ও সাংগঠনিক কাঠামো নেই সরকারের। সরকারের ভুল নীতির কারণে বাস-মিনিবাস, ট্যাক্সিক্যাব ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা খাতে নৈরাজ্য চলছে। রাইড শেয়ারিং খাতও যেন এমন মুখ থুবড়ে না পড়ে।