আমার যত কথা : সাইফ শোভন

আমার যত কথা
সাইফ শোভন
প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, আলোর মেলা খেলাঘর আসর, গুলকী বাড়ী রোড, ময়মনসিংহ, জাতীয় শিশু কিশোর বুনিয়াদী সংগঠনের শাখা।
প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক, আলোর মেলা খেলাঘর আসর, গুলকী বাড়ী রোড, ময়মনসিংহ সদর, জাতীয় শিশু কিশোর বুনিয়াদী সংগঠনের শাখা।
প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক, খেলাঘর ময়মনসিংহ জেলা কমিটি।
প্রাক্তন সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি, জাতীয় শ্লোগান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোল।
প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ময়মনসিংহ শহর কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, আনন্দ মোহন কলেজ শাখা, ময়মনসিংহ।
প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ময়মনসিংহ জেলা সংসদ।
প্রাক্তন সদস্য ও সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি), ২ নং ওয়ার্ড শাখা, ময়মনসিংহ শহর কমিটি।
PRESIDENT, BANGLADESH INTERNET USERS COUNCIL.
FOUNDER DIRECTOR & ACTOR, BANGLADESH MIME & PHYSICAL THEATRE.
আমার শৈশব কাটে ময়মনসিংহ শহরের গুলকী বাড়ী রোডস্থ ১৩/ক নম্বরের বাসা থেকে। তার আগে অবশ্য নেত্রকোনা জেলার সুসং দূর্গাপূর থানায় বাবার চাকুরী কালীন অবস্থানের সুবাদে ২ বৎসর এর মত থাকা হয়। জন্ম হয় ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারের কোয়ার্টারে। সেখানে আমার নানা ছিলেন জেলার, তার কাছেই আমার জন্ম। নিজ জন্মস্থান ময়মনসিংহে শহরের উ্পকন্ঠে প্রায় ২০ বৎসরেরও বেশী সময় পার হয়। উপরের পদবী এবং সংগঠনের দিকে তাকালে বুঝা যায় ময়মনসিংহ জেলায় এবং কেন্দ্রীয় সংগঠন সমূহে আমার জীবনের ঘঠনাক্রমপুঞ্জি। ঘটনাক্রমে আমি ও আমারপরিবার চলে আসে ঢাকায়। বাবা ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সরকারী চাকুরে, পদবী ছিল পরিচালক। উনি বসতেন আজীমপুরের জনসংখ্যা ভবনে। সরকারী গাড়ী থাকা সত্বেও উনি গাড়ী ব্যবহার করেছেন কম। অফিস সময় ছাড়াও সময় দিতেন পরিবারে। এবং বাকী সময় লেখাপড়া করে সময় কাটাতেন। উনার ছিল প্রচুর পড়াশুনা। কিন্তু উনি লিখেছেন খুবই অল্প। উনার জিবদ্দশায় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় গবেষনাধর্মি লেখা ছাপা হয়। বাংলাদেশের ভূমি ব্যাবস্থাপনার উপর উনার ছিল ব্যাপক গবেষণা।
সারা জীবন উনি বামপন্থি রাজনীতির সমর্থন করে গেছেন। উনি কখনো নেতৃত্ব চাননী, সাধারন জীবন যাপন করেছেন। প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর উপর ছিল অগাধ ভালোবাসা কিন্তু পরবর্তিতে কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। সরকারী চাকুরী থাকা অবস্থায় তিনি নিয়মিত লেভী (চাঁদা) দিয়ে আসতেন। আমি বাবার পথ ধরে স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন এর সংগে যুক্ত হয়ে গেলাম। আমাদের মহল্লায় খেলাঘরের একটি শাখা আসর ছিল, প্রথম দিকে আমি বুঝিনি যে এর কেন্দ্রীয় সংগঠন রয়েছে। একদিকে ছাত্র রাজনীতি এবং অন্যদিকে শিশু কিশোরদের নিয়ে সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে এসেছি। মহামতি কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন ছিলেন আমার আদর্শ। বাবার কাছে লেনিন সম্পর্কে গল্প শুনেছি। বাবার বই কেনা ছিল শখ। শুধু শখ বললে ভুল হবে, তিনি ঐ সমস্ত বই একেবারে কন্ঠস্থ করেছেন। তার একটি পারিবারিক লাইব্রেরী ছিল যা তিনি নাম দিয়েছিলেন পারিবারিক কমিউন পাঠাগার। আব্বার মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার লাইব্রেরীতে বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় শত (৬ শত)। মুস্তাফা হুসেন আমার বাবা ময়মনসিংহ জেলার গফরগাও উপজেলার শাকচোড়া গ্রামে ১৯৪২ সালে জন্ম গ্রহন করেন। তার শিক্ষাজীবন কাটে ময়মনসিংহ শহরে। ১৯৫৮-তে তিনি মৃত্যূঞ্জয় হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং পড়ে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

চাকুরী জীবনে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পদে অধিষ্টিত হয়ে অবসর গ্রহণ করেন। চিন্তাধারা ও কর্মকান্ডে ছিলেন দেশের বামধারা রাজনীতির ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের একজন অকুতোভয় সৈনিক। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপেডিয়ায় ও তার রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত ১৯ জুলাই ২০০২ এ হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন। প্রসঙ্গক্রমে আমার ছোট ভাই সুমন বাবার সাথে সবসময় রাজনীতি/অর্থনীতি বিষয়ে আলোচনা করতো, মূলত আব্বা এবং সুমন মিলেই পারিবারিক পাঠাগারের নামকরন করেছিলেন। লাইব্রেরীর বই সংগ্রহ হতো আব্বা ও সুমনের হাত দিয়ে। পরবর্তিতে সুমন রাশিয়ার স্কলারশিপ নিয়ে মস্কো পেট্রিস লুমুম্বা ইউনিভার্সিটিতে চলে যায়। তৎকালীন সময়ে কমিউনিষ্ট পার্টির ময়মনসিংহ জেলার সম্পাদক শ্রী প্রদিপ চক্রবর্তী আমার যাওয়ার ব্যাপারে আব্বাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি এ বিষয়টির কোন কিছুই জানতাম না। তখন ১৯৮৬ সাল। সুমন হঠাৎ করেই মস্কো চলে যায়।
পাড়ার কেউ ব্যাপারটা বিশ্বাস করেনি। যা হোক আমি বিষয়টি মেনে নিই। সুমন পড়ালেখায় ভালো বলে তখন আমি কিছু বলিনি। আমি একটু দুরন্তপনা ছিলাম বলে বিষয়টি আব্বা এড়িয়ে যান। মহল্লার ছেলেরা বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। কলেজ জীবনে এসে আমি পুরদস্তুর রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আত্ম প্রকাশ করি।

স্বৈরাচারী এরশাদ এর বিরুদ্ধে তখন সারাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। আমিও এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে প্রথম সারিতে। ১৯৮৭ সাল, ১০ই নভেম্বর ঢাকা অবরোধ ডেকেছে বিরোধী জোট। তার আগে আর একটি কথা না বললেই হচ্ছে না, আমাদের পরিবারটি ময়মনসিংহের শহরের বিভিনড়ব আন্দোলন সংগ্রামে এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠা একটি পরিবার। আমরা ঢাকায় চলে আসার ফলে পুরো ময়মনসিংহে এর প্রভাব পরে। আমার মা ছিল নারী আন্দোলনের ময়মনসিংহের প্রথম সারির একজন নারী নেত্রী। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ময়মনসিংহের জেলা কমিটির প্রচার সম্পাদিকা ছিলেন। আমার বোন শুভ্রা রবীন্দ্র সংগীত চর্চা করতো বিধায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনায় ছিল অগাধ বিচরন।
ঢাকায় অবরোধে এসে এরেষ্ট হয়ে যাই। কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী হিসাবে ২ মাস থাকার পর জামিনে মুক্ত হয়েময়মনসিংহে ফিরে যাই। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আমি কারাগারে ছিলাম। যাহোক আমাদের পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এ এমএ ভর্তি হই। বাংলা সাহিত্যে মাষ্টার্স করার পর চাকুরি নিয়ে ময়মনসিংহে চলে যাই। নিজ বাসায় থেকে এনজিওর চাকুরী করা অবস্থায় ময়মনসিংহে প্রথম মাইম শো করি। ২ বৎসর এনজিওর চাকুরী করার পর আবার ঢাকায় ফিরে আসি। ঢাকায় মূকাভিনয়, খেলাঘর করতে থাকি। ২০০১ সালে আমি কম্পিউটার সাইন্সে ডিপ্লোমা পাশ করি। এর পর বিজনাস ডট কম একটি এমএলএম কোম্পানী যাতে আমি চিফ ফ্যাকাল্টি হিসাবে যোগদান করি।্য ১৯৯০ এর পর থেকে ঢাকায় থাকা হয়। এখন পর্যন্ত তার অর্থ ২০১৯ সাল পর্যন্ত গত ২৮ বৎসরব যাবৎ ঢাকায় থাকা হয়। প্রথমে শেরেবাংলা নগড়ের তালতলায় তারপরে পুর্বরাজাবাজারের বাসায় এবং পরবর্তিতে কলাবাগানের (পান্থপথ) বাসায় থাকার পর থেকে এক ধরনের অপপ্রচার শুনতে পাই। মূলত ১৯৯১ সাল থেকেই আমার সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের প্রচার শুরু হয়।
যেহেতু আমি বামপন্থি রাজনীতি করতাম সেইহেতু আমার আদর্শ বিরোধী বিভিন্ন গোষ্টি অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। প্রম দিকে আমি বিষয়টি গুরুত্ব দেই নি, কিন্তু পরবর্তিতে আমার বিরুদ্ধে এমন প্রচার চালানো হয় যা আমার নৈতিকতা ও আদর্শ বিরোধী। ২০০২ এর পর থেকেই শুরু হয় তীব্র পরনিন্দা পরচর্চা, যা কোরআন সুন্নাহ বিরোধী অপরাধ, এমন এমন কথা বলা হয় আমার বিরুদ্ধে যা কখনো বাস্তবে তো ঘটেইনি এবং বিষয়গুলি আমি জানিনা। গত ১৫/১৬ কবৎসরে আমি বিষয়গুলি শুনতে শুনতে আমার মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। আমার মানসিক অবস্থা যারপরনাই এতোটাই খারাপ হয় যে আমি যেটাকে বলবো সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট। আমার পঞ্চেন্দ্রিয় অবচেতন মনে কেউ কিছু বললে মাথা নারাতে থাকি। সবাইকে বিশ্বাস করি বলে আমার খুবই অসুবিধা হচ্ছে। আর এই বিশ্বাস করাই আমার জন্য কাল হয়ে দারিয়েছে। বিষয়টি এমন, ঢাকায় থাকার বিশ বৎসর পরে এসে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, হয় জনপ্রিয়তার জন্য, না হয় নিজেই নিজের কাছে এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে ৩০ বৎসর আগের ঘটনা (যেগুলি নিছক দুষ্টামী বা সামান্য ব্যাপার) এখন সারা দেশে প্রচার করে লাভ কি ? প্রম দিকে আমি ব্যাপারগুলিকে পাত্তাই দেই নি, কিন্তু পরবর্তিতে যখন বুঝতে পারলাম বিষয়টি আমাকে হেয় করার জন্য এবং সম্মান হানীর জন্য করা হচ্ছে, তখন আর আমি স্থির থাকতে পারলাম না। বিষয়টি আমি লিখিত আকারে প্রকাশ করলাম। যারা প্রচার করছে তাদের কিছুটা চিনতে পারলেও, ঢাকাতে যাদের কাছে বলছে তাদের কেউ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনেনা। চিলে কান নিয়েছে, সেখানে কান না ধরে, চিলের পিছনে ছুটাছুটি করাটা কি ঠিক। যা যারা শুনছে তারা ঐ রকম কান্ড করে যাচ্ছে।

সাইফ শোভন