ঘূর্ণিঝড়ের নামে নারীর প্রাধান্য যে কারণে

আলতাব হোসেন:  ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিয়ে কৌতূহল সবারই। শুরুতে কঠিন কঠিন নামকরণ হলেও বর্তমানে সহজ নামে ডাকা হয় ঘূর্ণিঝড়কে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নামগুলোর বেশির ভাগই নারীর নামে। যেমন- রিটা, ক্যাটরিনা, নার্গিস, স্যান্ডি, রেশমি, বিজলি, অগ্নি, নিশা, গিরি, হেলেন, চপলা, অক্ষি, লুবান, তিতলি, বাজু, নাদা, মেঘ, প্রিয়া, নিলুফার, মাদি, শ্যামা, হিকা, সোবা ইত্যাদি। মেয়েদের নামে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে। অভিযোগ আছে, বিশেষজ্ঞরা প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে প্রেমিকাদের নামে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেন। ঘূর্ণিঝড়ের আকৃতি হয় নারীদের ডাগর চোখের মতো। তাই অনেক সময় নারীদের নাম দেওয়া হয়।

এ নিয়ে প্রতিবাদ, আন্দোলনও করেছে নারী সংগঠনগুলো। এরপর ঠিক করা হয়, জোড়া সংখ্যার সালগুলোতে ঝড়ের নাম হবে পুরুষের নামে আর বেজোড় সালে হবে মেয়েদের নামানুসারে। তবে এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আবহাওয়াবিদরা মেয়েদের নামেই ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে থাকেন। নিন্দুকেরা বলেন, নারী আর প্রকৃতির ওপর কখনও লাগাম টানা সম্ভব নয়।

আবহাওয়াবিদ আবুল কাশেম বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের নাম নারীদের নামে কেন- এ নিয়ে অনেকে রসিকতা করেন। ঘূর্ণিঝড়ের মতিগতির ওপর নির্ভর করে সহজ নাম দেওয়া হয়, যাতে মানুষ মনে রাখতে পারে। আর মানুষ নারীদের নাম সহজে ভোলে না। তাই নামকরণের ক্ষেত্রে মেয়েদের নাম প্রাধান্য দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে পুরুষ ও অন্যান্য প্রাণীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় যেহেতু মৃত্যু ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাই কোনো নাম দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় না।

অতীতে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হতো অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের ওপর ভিত্তি করে। তখন বলা হতো ৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৬২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের ঝড়টি এখন

বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। ঘূর্ণিঝড়ের এ বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য লাগত। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসে মানুষ বা নৌযানগুলো সতর্ক হতে পারত না। একই সময়ে একাধিক ঝড় সৃষ্টি হলে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য সহজে মনে রাখা এবং পার্থক্য করা যায় এমন নাম রাখার প্রস্তাব আসে। এ কারণে ২০০৪ সাল থেকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোয় ঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। সে সময় আটটি দেশ মিলে মোট ৬৪টি নাম প্রস্তাব করে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক কমিটিই ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে থাকে। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে থাকে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, মিয়ানমার ও ওমানের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার একটি প্যানেল এসকাপ এ অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে। বহু আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হতো।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, ভয়াবহতার দিক থেকে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের বৈশিষ্ট্য প্রায় একই। তবে স্থানীয়ভাবে ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন- সাইক্লোন বলা হয় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোকে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় টাইফুন। আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়গুলোকে বলা হয় হারিকেন। সাধারণত একটু শক্তিশালী ঝড়কেই (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৪ মাইলের বেশি) হারিকেন নামে ডাকা হয়, যার নামকরণ করা হয়েছে ওই অঞ্চলের আদি অধিবাসী মায়াদের ঝড়বৃষ্টির দেবতা ‘হুরাকানের’ নামে।

এবারের মহাপরাক্রমশালী ঘূর্ণিঝড়ের নাম ফণী। এর অর্থ সাপ বা ফণা তুলতে পারে এমন ভয়ঙ্কর প্রাণী। ফণী নামটি বাংলাদেশের দেওয়া। এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা নামগুলো ছিল হেলেন, চপলা ও অক্ষি। এর পরের ছয়টি ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করা আছে। সেগুলো হলো- বায়ু, হিক্কা, কায়ার, মাহা, বুলবুল, পাউয়ান এবং অম্ম্ফান।

সাবেক আবহাওয়াবিদ আশরাফুল আলম বলেন, সাগর-তীরবর্তী উপকূলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় এক আতঙ্কের নাম। শুনতে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর নামের ঘূর্ণিঝড়গুলো অনেক সময় প্রলয়ঙ্করী হয়ে ওঠে। তছনছ করে দেয় উপকূলের সবকিছু। হিংসুটে কিংবা ঝগড়াটে নারী যেমন মূহূর্তে সব ধ্বংস করে দিতে পারে, তেমনি ঘূর্ণিঝড় মূহূর্তে সব ধ্বংস করে চালাতে পারে তাণ্ডবলীলা। তাই ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম দেওয়া হতো প্রেমে প্রত্যাখ্যাত আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সাবেক প্রেমিকাদের নামে। তবে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সব শ্রেণির মানুষ নামটি যাতে সহজে মনে রাখতে পারে।