পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের অনশন

নিউজ ডেস্ক:  দেশের শেয়ারবাজারে পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। টানা পতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। লেনদেনও নেমেছে তলানিতে। প্রতিবাদে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক ছেড়ে রাজপথে নেমেছে। প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল প্রতীকী অনশন করেন তারা।

এ সময় বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনের পদত্যাগের দাবি করেন। অনশনে অংশ নেওয়া বিনিয়োগকারী আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, তিন মাস ধরে পুঁজিবাজারে দরপতনে নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ জন্য বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধও করেন। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৪ জানুয়ারির পর থেকে বাজারে টানা দরপতন হচ্ছে। আলোচ্য সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ৭৭৫ পয়েন্ট কমেছে।

বাজার মূলধন কমেছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। হাজার কোটি টাকার লেনদেন নেমেছে ২০০ কোটি টাকার ঘরে। বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বাজারে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে। ডিএসইর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী আমাদের সময়কে বলেন, বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য বাজারকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রীর সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত। এর প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে।

গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ৬২ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১৭৫ পয়েন্টে নেমেছে। আর লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্য কমেছে। ডিএইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২১৭টির এবং দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৪টির। লেনদেন হয়েছে ২৯৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ টাকার। সে হিসাবে লেনদেন কমেছে ৪৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএসসিএক্স ১০৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬০২ পয়েন্টে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ৪৭টির, কমেছে ১৫৭টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৯টির।

অন্যদিকে আইন লঙ্ঘন করে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে খায়রুল হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে-এমন অভিযোগ করে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, আগামী বাজেটের আগেই আমরা বিএসইসিতে পরিবর্তন দেখতে চাই। শেয়ারের অব্যাহত দরপতনের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার ‘বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতীকী গণঅনশনে সংহতি প্রকাশ করে তিনি এ কথা বলেন। মেনন বলেন, রবিবার সংসদে প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন ‘পুঁজিবাজারে সংকট আছে। সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করা না গেলে আমাদের শিল্প, বাণিজ্য কোনোটাই হবে না। কারণ পুঁজিবাজার থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা হয়।’

সংসদে সত্য কথা বলায় আমি অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু সত্য কথা বলেই শেষ হবে না। আমাদের কথা হচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান আইন ভঙ্গ করে পর পর তিনবার কীভাবে থাকে, এর জবাব আপনাদের দিতে হবে, বলেন সাবেক মন্ত্রী মেনন।

মেনন আরও বলেন, আইপিও নিয়ে যারা ষড়যন্ত্র করেছে আমি তাদের বিচার চাই। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে চক্রান্ত চলছে এমন ইঙ্গিত করে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান বলেন, আর্থিক খাত সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকে আমাদের দুর্ভাগ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিন-রাত পরিশ্রম করে এই দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে গেছেন, সেখানে আমাদের আর্থিক খাতের পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট। কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট যদি কনটিনিউ করে, তা হলে জানবেন দেশের অর্থনীতি খারাপ, সামষ্টিক অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। তা হলে কোন চক্রান্ত চলছে আজকে বাংলাদেশে?

অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেনন বলেন, সমস্যা যখন সৃষ্টি হয়, তার সমাধান আছে। আপনি বলেছেন আগামী বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হবে। এই প্রণোদনা কী হবে, সেটা যদি বিস্তারিত বলেন তা হলে ভালো। এর আগে সকাল থেকে ১২ দফা দাবি সম্বলিত ব্যানার নিয়ে বিনিয়োগকারীরা অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। এক পর্যায়ে দুপুর আড়াইটার দিকে সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন সেখানে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একাত্ম প্রকাশ করে তাদের শরবত পান করিয়ে অনশন ভাঙান।

বিনিয়োগকারীদের ১২ দফা দাবির মধ্যে ছিল-ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করা শেয়ারগুলো ওই কোম্পানির পর্ষদে বাইব্যাক করা; প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ, যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে তাদের ন্যূনতম ১০ শতাংশ লভ্যাংশ নিশ্চিত; স্ক্রিপ নিটিং তথা শর্ট সেল আইন বাতিল; খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী দোষীদের আইনের আওতায় আনা; পুঁজিবাজারে অর্থের জোগান বৃদ্ধির জন্য সহজ শর্তে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া; অপ্রদর্শিত অর্থ পুঁজিবাজারে বিনাশর্তে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া; পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের এক্সপোজার বাজার মূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে গণনা করা; ২ সিসি আইনের বাস্তবায়ন করা; এই আইন যারা বাস্তবায়ন না করবে তাদের বিচারের আওতায় আনা; মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে পুঁজিবাজারে সক্রিয় করা; একই সঙ্গে ফান্ডগুলোর ন্যূনতম ৮০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ; পুঁজিবাজার সম্পর্কে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত; ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট-২০১৫ বাস্তবায়ন; ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিপরীতে বাংলাদেশ স্টক এক্সচেঞ্জ নামে বিকল্প স্টক এক্সচেঞ্জ করা।