সময়ের কথা: পয়সার হাটে টাকার গাছ

অজয় দাশগুপ্ত:   আগৈলঝাড়া উপজেলার যে ৩০০ একর জমিকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইপিজেড গড়ে তোলার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখান থেকে মোটরসাইকেলে মাত্র এক মিনিটের দূরত্বেই পয়সার হাট সেতু। প্রশস্ত নদীটির নাম ‘সন্ধ্যা’। পয়সার হাট যুগ যুগ ধরেই ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সন্ধ্যা নদী চলে গেছে শিকারপুরের দিকে। সেখান থেকে ঢাকা কিংবা পিরোজপুর-বাগেরহাট যাওয়া যায় সহজে। কয়েক বছর আগে পয়সার হাট সেতুটি চালুর পর থেকে প্রতিদিন দলে দলে নারী-পুরুষ-শিশু আসে বেড়াতে। ইপিজেডের জন্য এই সন্ধ্যা নদী ব্যবহার করা যাবে। আর সড়কপথ তো রয়েছেই। সমুদ্রবন্দরও দূরের পথ নয়।

বরিশাল জেলার গৌরনদী থেকে আগৈলঝাড়া উপজেলার ভেতর দিয়ে একটি প্রশস্ত পাকা সড়ক চলে গেছে কোটালীপাড়া হয়ে বিভিন্ন গন্তব্য- গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর প্রভৃতি জেলা শহরে। পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকা থেকে ঘণ্টাতিনেকের মধ্যেই পৌঁছানো সম্ভব হবে আগৈলঝাড়ায়। দূরত্ব একশ’ কিলোমিটারের মতো। এ গৌরবের সেতুর সঙ্গে রেলপথ চালু হলে গৌরনদী-আগৈলঝাড়া-গোপালগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার অনেকের ধারণা- ‘বাড়িতে থেকেই প্রতিদিন ঢাকায় অফিস করা যাবে।’ পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের জীবন যে আমূল বদলে দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। এ সেতুর কাজের অগ্রগতির দিকে তাদের এখন প্রতিদিনের নজর। ধান-নদী-খালের দেশ বরিশাল- এটা এ অঞ্চলের গর্ব। একই সঙ্গে তারা চাইছে কারখানা। ১০০ ইপিজেডের একটি আগৈলঝাড়ায় গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা তাদের মধ্যে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। তারা ভাবতে শুরু করেছে- এ অঞ্চলেও তাহলে কারখানার ভোঁ শোনা যাবে, চিমনির ধোঁয়া উড়বে। শ্রমিকরা দলে দলে যাবে কারখানায় কাজের জন্য।

এ ইপিজেডের জন্য মোট জমি চিহ্নিত হয়েছিল ৩০০ একর। এর একদিকে পয়সার হাট, আরেকদিকে বড় মাগড়া। অন্য পাশে রয়েছে জলিরপাড় ও কোদালধোয়া। গৌরনদী থেকে যে পাকা সড়কটি প্রস্তাবিত ইপিজেড এলাকার পাশ দিয়ে খুলনা-যশোর চলে গেছে, সে পথ ধরেই স্বল্প সময়ে চলে যাওয়া যায় মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরে।

১৯ এপ্রিল বিকেলে ওই এলাকায় যাই আগৈলঝাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রইস সেরনিয়াবাত, বাকাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিপুল চন্দ্র দাস এবং আগৈলঝাড়া প্রেস ক্লাব সভাপতি আজাদ রহমান ও সহসভাপতি এসএম শামিমের সঙ্গে। প্রস্তাবিত ইপিজেড এলাকায় কোনো বসতি নেই। উঁচু জমিতে ধান চাষ হয়। এখন বোরো ধান কাটা চলছে। পয়সার হাটের আবদুল জব্বার তালুকদার সচ্ছল কৃষক। একই উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের গৌতম সরকারের পরিবারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমির মালিক। দু’জনেরই জমি চিহ্নিত হয়ে আছে আগৈলঝাড়া উপজেলায় প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য। বাংলাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যেসব এলাকা বেছে নিয়েছেন, তার মধ্যে পড়েছে উভয়ের জমি। প্রস্তাবিত ইপিজেড এলাকাতেই দু’জনের সঙ্গে দেখা। সরকারকে জমি ছেড়ে দিতে অনেকের আপত্তি থাকে। কিন্তু তারাসহ অন্য যাদের জমি এ প্রকল্পের জন্য পড়েছে, তাদের মনোভাব ভিন্ন। শুধু আগৈলঝাড়া বা পাশের উপজেলা গৌরনদী নয়, গোটা বরিশাল অঞ্চলই যেন শিল্পশূন্য। আগৈলঝাড়ার পাশের উপজেলা কোটালীপাড়া। এটি গোপালগঞ্জের মধ্যে পড়েছে। আরেক পাশে রয়েছে মাদারীপুর জেলার কালকিনি। সব কৃষি এলাকা। এককালে মাছের জন্যও সুপরিচিত ছিল। প্রশ্ন করি কয়েকজনকে- ‘শিল্প হলে জমি চলে যাবে। তখন হা-হুতাশ করবেন না?’ উত্তর মিলল এভাবে- ভালো কাজের জন্য জমি নিলে আপত্তি নেই। পদ্মা সেতুর জন্য অনেকের জমি গেছে। তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এখানেও নিশ্চয় তেমন সুবিধা মিলবে। কারখানা হলে ছেলেমেয়েরা এখানে থেকেই চাকরি করতে পারবে। অন্য ব্যবসাও বাড়বে। কেবল কৃষির ওপর এখন আর ভরসা করা যায় না।

পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়। এ সেতুটি চালু হলে রাজধানী ঢাকার খুব কাছের এলাকায় পরিণত হবে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি প্রভৃতি জেলা। খুলনা-যশোরও পরিণত হবে কাছের শহরে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে যত সময় দরকার হয়, তার তুলনায় অনেক কম সময়ে ঢাকা থেকে মোংলা ও পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো যাবে। আগৈলঝাড়ায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে সেখানকার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাঁচামাল ও মেশিন নিয়ে আসা এবং উৎপাদিত পণ্য দেশের ভেতরে ও বাইরে পাঠানোর জন্য যাতায়াতে কোনো সমস্যা হবে না। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর এ এলাকা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। যদি উদ্যোক্তারা ভারতের বাজারকে টার্গেট করেন রফতানির জন্য, তাহলে ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই ট্রাক ব্যবহার করে সেটা করা সম্ভব।

প্রস্তাবিত ইপিজেড এলাকাটি পড়েছে বরিশাল-১ সংসদীয় আসনে। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর যাতায়াতের সমস্যা পদ্মা সেতু চালু হলে একেবারেই থাকবে না। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমরা বহু বছর ধরে প্রকৃতির হাতে জিম্মি- গ্রীষ্ফ্মে ঝড়, বর্ষায় নদী প্রমত্ত, শীতের মৌসুমে কুয়াশা। বাস-লঞ্চ-বিমান চলাচল নির্ভর করে প্রকৃতির খেয়ালের ওপর। পদ্মা সেতু চালু হলে এ সমস্যা থাকবে না।’ তার এ বক্তব্যের সঙ্গে কারও দ্বিমত করার অবকাশ নেই। তিনি বলেন, আগৈলঝাড়ায় ইপিজেড চালু হলে শিল্প-বাণিজ্য বাড়বে। কৃষির বাইরে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বরিশাল অঞ্চলে শিক্ষার হার বেশি। গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় এ হার জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি। এ দুটি উপজেলায় রয়েছে অর্ধশতাধিক হাই স্কুল এবং কয়েকটি কলেজ। টেকনিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠছে। সড়কপথে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। পয়সার হাট থেকে রাজধানী ঢাকায় দিনে-রাতে সরাসরি বাস যোগাযোগ চালু আছে। বেনাপোল স্থলবন্দরেও প্রতিদিন কয়েকটি বাস যাতায়াত করে। পয়সার হাটের সন্ধ্যা নদীও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য খুব সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে।

সরকার যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার অন্যতম উদ্দেশ্য অনুন্নত এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেওয়া। এ এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে, কিন্তু মানবসম্পদে এগিয়ে। সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। ইপিজেড এলাকা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে মনসা মঙ্গলের কবি বিজয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত মন্দির। পাঁচশ’ বছর আগে তিনি বাংলায় যে মঙ্গল কাব্য রচনা করেছেন, তা এখনও সমাদৃত। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা পাঠ্য। এ মন্দিরটি এখন নতুনরূপে সাজানো হয়েছে। মন্দিরে রয়েছে প্রায় এক টন পিতল দিয়ে নির্মিত মনসা দেবীর মূর্তি, যার সামনে রাখা আছে মঙ্গল ঘট, বিজয় গুপ্ত যে ঘটে দেবীর পূজা করেছিলেন। শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে ‘বিল এলাকা’ হিসেবে যুগ যুগ ধরে অবহেলিত অঞ্চলটি নতুন প্রাণ পাবে।

প্রস্তাবিত ইপিজেডের কাছেই রয়েছে গোপালগঞ্জের রামশীল এলাকা। সেখানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা এক দুর্ভেদ্য ঘাঁটি গড়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গানবোট নিয়ে দুই দফা চেষ্টা করেও এ এলাকা দখলে নিতে পারেনি; বিপুল ক্ষতি স্বীকার করে ফিরে গেছে। বলা যায়, কোদালধোয়া-আস্কর, বড় মাগড়া, পয়সার হাটসহ গোটা অঞ্চলই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের স্মারক। এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকাররা প্রতিদিন গণহত্যা চালিয়েছে; বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। নারী ধর্ষণ করেছে, লুটপাট চালিয়েছে। কিন্তু জনগণ মাথা নত করেনি। তারা হেমায়েত বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বে অসম সাহসে লড়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের চার যুগ এ বছরে পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে যথেষ্ট। এ এলাকাও তার সুফল ভোগ করছে।

পয়সার হাটের সন্ধ্যা নদীতীরে একটি ইকোনমিক জোন গড়ে উঠলে আগৈলঝাড়া অঞ্চলটি প্রকৃতই সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এখানে জমির সমস্যা নেই। নিকটেই রয়েছে বড় নদী। কিছু দূরেই বেনাপোল স্থলবন্দর এবং পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দর। এমন অনুকূল সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ করার মতো সম্পদ যাদের রয়েছে, তারা কেবল সরকারের অনুকূল সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। এলাকাটি যেহেতু ভারত সীমান্ত থেকে খুব দূরে নয়; এ কারণে সেখানকার উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার জন্যও প্রস্তাব যেতে পারে।

পয়সার হাটে এখন আর পয়সায় কেনাবেচা হয় না। তবে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে নিশ্চিতভাবেই সেখানে কেবল পয়সা নয়, কোটি কোটি টাকার লেনদেন হবে প্রতিদিন। তখন পয়সার হাট পরিণত হবে টাকার গাছে।

সাংবাদিক

ajoydg@gmail.com