পাশেই মাদক, মুঠোয় অশ্লীলতা ও মেধার মৃত্যু!

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

গত বছর দিল্লীতে বাসে গণধর্ষণ, প্রেমিকাকে বন্ধুসহ গণধর্ষণ, ঢাকায় মেসে শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার ও হত্যা, ইত্যাকার নানা ঘটনার বর্ণনায় দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলো ছিল সরব। এবছর শুরু থেকেই এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে মাদকদ্রব্যের ব্যবহারজনিত নৈতিক স্খলণ, সামাজিক অস্থিরতা থেকে মানসিক বিপর্যয়, সেগুলো থেকে হতাশা ও অকাল মৃত্যু। সম্প্রতি আমাদের দেশের একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অর্থনীতি বিভাগর দু’জন মেধাবী শিক্ষার্থী সবার অগোচরে হঠাৎ ভেজাল চোলাই মদ খেয়ে এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে। যা শধু তাদের পরিবার বা অভিভাবকদের জন্যই নয়- আমাদের জাতির জন্য চরম দু:সংবাদ ও ভয়ংকর কিছুর ইঙ্গিত বহন করে।

মাদকের যে কত মারাত্মক মায়াবী রূপ ও ভয়ংকর মৃত্যু থাবা তা আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে সহজেই অনুমেয়। এর কারণ হলো আমাদের কাছেই মাদক, মুঠোয় অশ্লীলতা যা সবসময় সবার হাতে ইচ্ছা অনিচ্ছায় ভাইরাল হয়ে আসছে, কৌতুহল বাড়ছে, নৈতিক শিক্ষার অভাবে অভিভাবকের অগোচরে সেবন চর্চা হচ্ছে ও অকাল মৃত্যু ঘটছে। মানুষের নৈতিক বোধ ভোতা হয়ে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এর ন্যক্কারজনক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমে জানা গেছে- দেশে বিদেশে চার্চের পুরোহিত, মাদ্রাসা-মন্দির-এতিমখানার পবিত্র কর্ণধাররাও এসব কালিমাযুক্ত কাজে জড়িত হয়ে পড়ছেন! মাদকের সাথে লোভনীয় কালো ব্যবসা জড়িত থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিতদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করা বেশ জটিল হয়ে পড়েছে।মাদকের মৃত্যুথাবায় অত্যাসন্ন ভয়ংকর নৈতিক স্খলন ও সামাজিক ভাঙ্গন আমরা ‘রুধিব কেমনে?

চারদিকে নৈতিকতার অধপতন: ও ভয়ংকর নৈতিক স্খলন আমাদের চিরায়ত শক্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ক্রমাগত ভেঙ্গে ফেলছে। তাইতো, অনেকের মুখের কথা ও কাজের সাথে বাস্তবতার বড় অমিল। এ থেকে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। আজকাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত অস্থির মানুয় কোন কিছু করার পূর্বে স্বাভাবিক চিন্তা ভাগাভাগি করার ধার ধারছে না। ফলে ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা ও বাড়ছে অবর্ণনীয় যন্ত্রনা ও কষ্ট।

কিছুদিন আগে জরুরী কাজে পরিবার নিয়ে হাইওয়ে ধরে যাচ্ছিলাম। ড্রাইভারকে বললাম ধীরে ধীরে চালাতে। সে দ্রুতবেগে চালাচ্ছিল ও কাঁপছিল। আমি বললাম, আমাদের সময় আছে- সাবধানে ও ধীরে চালাও। সে উত্তরে বলল স্যার চা খাবেন? আমি বললাম কোথাও ভাল চায়ের দোকান দেখলে দাঁড়াও, সবাই চা খাব। আমরা চা খেলেও ড্রাইভার চা খেলনা! সে বড্ড দেরী করছে। আমি চায়ের দাম দিতে গিয়ে জানলাম সে এনার্জি ড্রিন্ক্স খেয়েছে। আমাকে জানালো এসব এনার্জি ড্রি্কংস-এ মাদকদ্রব্য থাকে। তাই কিছুটা নেশা হয় ও তার গাড়ি চালাতে ফুর্তি লাগে। ভাবলাম এনার্জি ড্রি্কংস- তো বিক্রি বন্ধ, তবুও পাওয়া যায় কেন? তার কথা শুনে আমি তো হতভম্ব। ইতোমধ্যে গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে। তাড়া থাকায় আমি তাকে গাড়ি থামাতে বলতেও পারছিলাম না। স্বাভাবিকভাবে আমার নিজের অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল। মনে পড়ল, ছাত্রজীবনের কথা। নাইট কোচে চেপে ঢাকা যেতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করার সময় আমাদের জেলা থেকে তখনও ডে-কোচ চালু হয়নি। গভীর রাতে নগরবাড়ি ফেরী ঘাটে কোচ পৌঁছুলেই হেল্পারের হাতে গাড়ি ফেরীতে তোলার দয়িত্ব দিয়ে ড্রাইভাররা ছুটতো চোলাই মদ পান করতে। দুই-তিন ঘন্টা তারা ফুর্তি করতো। ফেরী ঘাটে চাপলেই ত্বর সইতো না। নামার প্রতিযোগিতা শেষে রাস্তায় গিয়ে ওভারটেক করার প্রতিযেগিতা করে প্রায়শই: দুর্ঘটনা ঘটাতো । অনেক দিন আগে গভীর রাতে পাবনার কাছে আমি বাসের ভেতরে থাকা অবস্থাতেই পুকুরে পড়েছিলাম মদ্যপ ড্রাইভারের কারণে। পুকুরে পানি কম থাকায় আল্লাহর অসীম কৃপায় বেঁচে গিয়েছিলাম।

কথা হলো- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে কার্যক্রম থাকলেও চালকদের মধ্যে মাদকদ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কোন মাপকাঠি নেই। আরো মনে পড়ল, বিদেশে পড়াশুনা করার সময়কার একটি চমকপ্রদ কথা। একদা একাডেমিক কাজে দেরী হওয়ায় ইন্যুভার্সিটি থেকে অনেক রাতে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। তখন জাপানে চেরী ফুল ফোটার মৌসুম। শনিবারের রাত। চেরীতলায় ”হানামি”-অর্থ্যাৎ ফুল দেখা উৎসব শেষে সবাই ”সাকে”- (একধরণের মদ) খায়। এরা অনেকেই উল্টোপাল্টা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরে। তখন পুলিশ তাদের আটকিয়ে রাখে। হঠাৎ আমার সামনে দিয়ে উল্টোপাল্টা গাড়ি চালিয়ে একজন চলে যেতেই পুলিশ বলে উঠলো- ”তোমারে” -অর্থ্যাৎ, থামো ! সাথে সাথে আমাকেও থামতে হলো। পুলিশ ওই গাড়ি চালকের মুখে একটি লম্বা ডিটেক্টর ঢুকিয়ে দিয়ে মাদকের নমুনা পেয়ে জরিমানা করলো। তারপর এগিয়ে এলো আমার দিকে। মুখে একটি ডিটেক্টর ঢুকিয়ে দিয়ে কিছুই পেল না। বললাম আমি ”সাকে” বা মদ খাই না, মুসলিমদের জন্য মদ হারাম। পুলিশটি বেশ অবাক হলো। আইডেন্টিটি কার্ড দেখে আমাকে ইশারায় সামনে চলে যেতে বলল।

প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশে মব (উচ্ছৃংখল জনতা) নিযন্ত্রণে মরিচের গুঁড়ো কিনে টাকা খরচ করা হলেও মাতাল ড্রাউভার নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ মাদকের নমুনা মাপার ডিটেক্টর মেশিন কিনছেন না কেন? ছোট আকারের এই যন্ত্র কিনলে খুব দ্রুত মাদকের নমুনা টেষ্ট করা যাবে এবং চালকের মাদকাসক্তির কারণে ঘটা সড়ক দূর্ঘটনা কমে যাবে।

অধূনা শহর-গ্রামে ঘাটে, মাঠে, অলিতে গলিতে মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, ফেনসিডিল, স্পিরিট, চরস, ভায়াগ্রা, হাসিস, তাড়ি, ইয়াবা, এগুলোর ব্যবহারকারীরা খুন, গুম, হাইজ্যাক, চুরি, ডাকাতি, ইভ-টিজিং ও ধর্ষণের সংগে নির্দ্বিধায় জড়িত হয়ে পড়ে। উন্নত প্রযুক্তির উক্ত যন্ত্রের যথার্থ ব্যবহার দিয়ে এসব অপরাধীদেরও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজের সকল স্তরের নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক প্রযুক্তির পাশাপাশি আধুনিক যান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে। কারণ মাদকাসক্ত অপরাধীদেরকে অনেক সময় সামাজিকভাবে সচেতন করা হলেও মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না । তারা সেটা শীঘ্র ভুলে যায় অথবা গ্রাহ্য করতে চায় না। সুতরাং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করে ধর্ষকের মত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মোদ্দাকথা হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কার? এজন্য যিনি দায়িত্বরত রয়েছেন তিনি যদি তার বসকে প্রটোকল দিতে সব সময় ব্যতিব্যস্ত থাকেন তাহলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাজ কে করবেন? তিনি যদি নেতিবাচকভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাজটি সম্পন্ন করতে থাকেন তাহলে সামাজিক শিথীলতা দেখা দেবে এবং চুরি, ডাকাতি, ইভ-টিজিং মদ, জুয়া, ধর্ষণের মত সামাজিক অনাচারগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আর এগুলো থেকেই মিথ্যা, ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদির জন্ম হবে ও মানুষের নৈতিক চরিত্র নষ্ট হবে এবং মানুষ ও অবলা পশুতে কোন ভেদাভেদ থাকবে না। তাই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তৎপর থাকতে হবে।

সম্প্রতি ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ষণ বিষয়টি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যাপকতা সমাজ গবেষকদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিজ্ঞানের নব-নব আবিষ্কারের সাথে প্রতিনিয়ত মানুষের যোগাযোগ ঘটছে। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে মানুষ পরিচিত হচ্ছে বিশ্ব বাজারের সাথে। বাজার অর্থনীতি এখন সমাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সামাজিক রীতি-নীতি, বিশ্বাস, আদর্শ-মূল্যবোধ, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, উচিত-ঔচিত্য, বন্ধন সবকিছুই এখন মানুষের গ্লোবাল ধারণার কাছে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এখন গ্রামের সহজ-সরল মানুষটি ডিশ টিভি দেখে। মোবাইল ফোনে শুধু কথাই বলে না, ছবি তোলে, ইউটিউবে ভিডিও দেখে। আপত্তিকর ছবি ও নিষিদ্ধ নীলছবি নিয়ন্ত্রণে দেশে এখনও কার্যকর ইন্টারনেট ফায়ারওয়াল ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্ণ ছবিতে পরিবার বা রাষ্ট্র কারো কোন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। শুধু সাইট মুছে ফেললেই তা দূর হয় না। বরং নতুনরুপে বিদেশ থেকে নতুন নামে আবার অ্যাকসেস পাওয়া যায়। কারণ এগুলোর নির্মাতারা অত্যাধুনিক হ্যাকিং কৌশল করে যা নিত্যনতুন ভাইরাস বহন করে আমাদের কোলন সঞ্জাত সব ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অতি সহজে ঢুকে পড়ে। কৌতুহল বশত: মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটে টিপাটিপি করতে করতে নানা আপত্তিকর উলঙ্গ ছবি খুলে ফেলে। উঠতি বয়সের ছেলেমেেয়রা এগুলো দেখে এস.এম.এস-ও ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি নানা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এর মাধ্যমে অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও ছবি দেখে ভিনদেশী সংস্কৃতির চর্চ্চা করে। তারা জান না যে একদেশের বুলি অন্যদেশের গালি হতে পারে।

অনেক উন্নত দেশে বিয়ে না করেও সন্তানের মা-বাবা হওয়া যায়, এ দেশে সেটা অপরাধ। ভিনদেশে সব শিশুরাই স্কুলে যায়, এ দেশে সবাই এখনও যায় বলা হলেও নানা কারণে যেতে পারে না, সেসব দেশে শিশু-কিশোরদের যৌন শিক্ষা স্কুলের পাঠ্যভূক্ত, এদেশে নয়। দেশে দেশে কৃষ্টিগত ফারাক থাকলেও ইন্টারনেট-এ এই ফাঁরাক নেই। এমনকি আমাদের দেশে এখনও ইন্টারনেটে বাচ্চাদের জন্য কার্যকর ফায়ারওয়াল তৈরী করা হচ্ছে না। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সিংহভাগ পরিবারের বাবা মায়েরা নিজেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন না। তাঁরা বাচ্চাদেরকে চাহিদানুযায়ী টাচ মোবাইল সেট, বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে দিয়েছেন। বাচ্চারা সেটা দিয়ে কি কাজ করছে তা তদারকি করার জ্ঞান ও দক্ষতা বাবা মা অথবা অভিভাবকদের নেই। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ১ম বর্ষের ৩১ ভাগ শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কম্পিউটারে একাডেমিক কাজের পাশাপাশি ইন্টারনেটে যৌনতা সম্পন্ন পেজগুলো খোঁজার অভিজ্ঞতা আছে। তারা সবাই অবিবাহিত কিন্তুু বয়স্কদের মুভিগুলো দেখে থাকে। এদের মোবাইল ফোনে নীল ছবির ক্লিপ থাকে এবং তা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে থাকে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে এ ধরণের তথ্য যেমন সহজলভ্য তেমনি উৎকন্ঠার ও সামাজিক অনাচার সৃষ্টির জন্য এগুলো ভয়ংকরও বটে। সাম্প্রতিক কালের নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা, ভেজাল চোলাই মদ খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন মেধাবী শিক্ষাথীর মৃত্যু, খোপায় ইয়াবা, পাকস্থলীতে ইয়াবা, ইভ-টিজিং ও ধর্ষণের যেসব ঘটনা ব্যাপক আলোড়ণ সৃষ্টি করছে সেখানে ফায়ারওয়ালহীন ইন্টারনেট ও মোবাইল ভিডিও কতটুকু নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে তা এখনই গবেষণা করে জানা জরুরী হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রকেই তার সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হতে হবে, অঙ্গীকার করতে হবে। সোস্যাল নেটওয়ার্কগুলো কিভাবে কাজ করবে তার জন্য সোস্যাল মনিটরিং ও ফলোআপ আউটলাইন তৈরী করতে হবে। এছাড়া সোস্যাল মানচিত্র বানিয়ে সামাজিকভাবে দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোকে একটি এ্যাকশানপ্লানের আওতায় আনতে হবে। সমাজস্থ সকল মানুষের চাহিদা ও অনুভূত প্রয়োজন (ভবষঃ হববফ) পূরণের স্বার্থেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটেছে। সামজিক নিয়ন্ত্রণ বলতে কতগুলো শক্তি ও মূল্যবোধের সমষ্টিকে বোঝায়, যার দ্বারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ ও কলহের নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে যাতে সামাজিক দ্বন্দ ও কলহ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর শৃংখলার পরিপন্থী হয়ে না ওঠে। এটা অনাচার রোধ করে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং সমাজকে ইতিবাচকভাবে সক্রিয় ও গতিশীল রাখে। রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম, পরিবার ছাড়াও শিক্ষা, সাহিত্য, জনমত, নেতৃত্ব, আদব-কায়দা, শাস্তি, পুরস্কার, প্রশংসা, ইত্যাদি হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বাহন। এগুলোর মাধ্যমে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা তৈরী হয়।

টাকা ভর্তি সিন্ধুক খুলে দিয়ে ঘরের দরজা খুলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমালে যে অবস্থা হয়-আমাদের সমাজে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তাই হচ্ছে। বর্তমানে নবগঠিত অনু পরিবারগুলোতে পারিবারিক অনুশাসন নেই। বাবা-মা সবসময় মহাব্যস্ত থাকেন। সেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন নাই তা বলাই বাহল্য। বাচ্চাকে কম্পিউটার গেম খেলতে দিয়ে বাবা-মা খালাস। বাচ্চারা পেন ড্রাইভে বন্ধুদের নিকট হতে ভয়ংকর কার্টুন, শিশু পর্ণোগ্রাফি সংগ্রহ করে। শিশু পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে আমাদের যে আইনটির কথা বলা হয়েছে তার বাস্তবায়ন কে কিভাবে করবেন সেজন্য অদ্যাবধি কোন সামাজিক বা প্রাযুক্তিক নীতিমালা তৈরী হয়েছে বলে আমার জানা নেই। শিশু পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে আমেরিকা সরব প্রচারণার কথা বললেও এখনও শিশু পর্ণোগ্রাফি তৈরী ও প্রচার কাজে আমেকিার যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বর ও রাশিয়া দুই নম্বরে অবস্থান করছে। এরাই সারা বিশ্বে এসব শিশু পর্ণোগ্রাফি ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশের কোমলমতি শিশুরা এর সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।

তাই সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর আগে সামাজিক অনাচার ঘটার নোংরা ও জঘন্য পথগুলো তালাবদ্ধ করে দিতে হবে। কারণ মানুষ সবাই মহাপুরুষদের বা মহীয়ষীদের মত ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। সামাজিকভাবে মটিভেশন দ্বারা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে নির্দিষ্ট পর্যায় ও সময় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রন করা যায়। কিন্তু আইনের নিয়ন্ত্রণকারীকে সজাগ থেকে ও সততার সাথে নিবেদিতপ্রান থাকতে হয়, তা না হলে সেখানেই অকল্যাণ ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানুষের বৃহদান্তকে যেমন সুন্দর আবরণ দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন, দিনভর বয়ে নিয়ে বেড়ালেও নাপাকি লাগার ভয় থাকে না-ঠিক তেমনি সমাজের সব পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক আবরণ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরী করে নিয়ে একটি ইতিবাচক সমাজ ব্যবস্থার সাথে আমাদের সবাইকে বাচাঁর চেষ্টা করে যতে হবে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।| E-mail: fakrul@ru.ac.bd

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।