বাংলাদেশের মিডিয়ায় কংগ্রেস বন্দনা, ফেরদৌস নূরের কি দোষ

সুমন দত্ত
ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয় ভারত। সুতরাং উপমহাদেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি হবে। মুখে যতই প্রগতিশীলতার বাণী বলা হোক। মুসলমান মুসলমানই থাকবে। হিন্দু হিন্দুই থাকবে। হিন্দুকে মুসলমান কিংবা মুসলমানকে হিন্দু বানানো যাবে না। ভারতের কমিউনিস্টরা বহু চেষ্টা করেছিল, হিন্দুকে মুসলমান ও মুসলমানকে হিন্দু বানাতে। উৎসাহ দিয়েছিল হিন্দু মুসলমান বিয়েতে। তারা আজ পরাজিত। বিলুপ্ত শক্তি। সম্প্রচার মাধ্যমে ভারতের বামরা হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে গরু খাওয়ার আয়োজন করলেও ইসলামি জঙ্গিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে তাদের কাউকে মদ কিংবা শুয়োর খেতে দেখা যায়নি। উল্টো পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জঙ্গিদের কথায় লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে সেই রাজ্য ছাড়তে হয়।

ভারতে শুরু হয়েছে লোকসভা নির্বাচন। দেশটির অধিকাংশ রাজ্যেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি)। হিন্দি বলয়ে এক কালে ছিল কংগ্রেসের দাপট। সেই দাপটের সুবাদে জন্ম হয়েছিল বহু লেখক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, অভিনেতা ও সাংবাদিক। রাষ্ট্রীয়ভাবে এদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়।

কালের বিবর্তনে বিজেপির কাছে কংগ্রেস ধরাশায়ী হলে এসব কবি সাহিত্যিকরা এতিম হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে এদের ডাকা হয় না। বরং এদের যারা প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমালোচক তাদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয় বিজেপি। আর এ কারণে বিজেপি বিরোধী প্রতিবাদ সভায় জাতীয় পুরস্কার ফেরত দেয়ার ঘোষণা দেয় ওই গোষ্ঠী। অভিনেতা গিরিশ কানরাড এই দলের নেতা। বর্তমান ভারতীয় মিডিয়ায় এদের প্রচারও হয় জোরে সোরে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মিডিয়াতে এদের প্রাধান্য আছে। যেমন আজ ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সারির দৈনিক যুগান্তরে পবিত্র সরকার নামে পশ্চিমবঙ্গের এক ভুয়ো পিএইচডিধারী শিক্ষাবিদ কলাম লিখেন। যার প্রতিটি ছত্রে বিজেপি বিরোধিতা ও কংগ্রেসের দালালি।

ভারতের লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে যতগুলো কলাম বা প্রতিবেদন লেখা হচ্ছে তার বেশিরভাগই কংগ্রেসের পক্ষে বিজেপির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়াগুলো তাদের লেখাই প্রাধান্য দিচ্ছে যেগুলোতে শাসক বিজেপির সমালোচনা করা হচ্ছে বেশি। আর এতে রসদ যোগাচ্ছে ভারতীয় কংগ্রেসের সেই সব ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা। প্রতিদিন বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো এসব লেখকের লেখা প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশের যেকোনো ব্যক্তিই বিজেপি বিরোধী শক্তিকে সমর্থন জানাবে। আর এ কারণেই বাংলাদেশ থেকে অভিনয় করতে যাওয়া ফেরদৌস আহমেদ ও গাজী আবদুল নূর নামের অভিনেতারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিরোধী শক্তির হয়ে ভোট প্রচারে নেমেছেন। তাদের মনে নেই বিজেপির সঙ্গে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সুন্দর সম্পর্কের কথা।

এতে তাদের আর দোষ কি। এরা নিজেদের দেশের পত্রিকাগুলোতে যা পাবে সেটাকেই সমর্থন জানাবে। ভারতের কিছু ট্রেডমার্ক সাংবাদিক আছে যারা এদেশে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে খবর কলাম দুই পাঠায়। এরা সকলেই বিজেপি বিরোধী লেখা লিখে থাকে। যে কারণে বাংলাদেশে বিজেপি বিরোধী সেন্টিমেন্ট বেশি। অথচ ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসলে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যা সমাধান হয়, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভারত বাংলাদেশের ছিট মহলগুলো বিনিময় হয়।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে বিজেপি সরকারের এগিয়ে আসা এবং দুই দেশের ভিসা ব্যবস্থা সহজ করা এক অন্যান্য অর্জন। কিন্তু দু:খের বিষয় বাংলাদেশে জন্ম নেয়া ও ভারতে আশ্রয় নেয়া পবিত্র বাবু টাইপের লোকদের নরেন্দ্র মোদীর এসব কাজ চোখে পড়ে না। তাদের চোখে পড়ে আখলাখের বাড়ির ফ্রিজে গরু না খাসি ছিল, বালাকোটে ভারতের বিমান হামলায় কাক মরেছে। মোদ্দা কথা কংগ্রেসের প্রধান কর্তা রাহুল গান্ধি ওরফে পাপ্পুর চোখ যা দেখে তারই প্রতিধ্বনি করে থাকেন এই পবিত্র বাবুরা। ফেরদৌস নূরদের ভুল এখানেই। তারা পবিত্রবাবু টাইপ লোকদের কথায় নেমে পড়েন বিজেপি বিরোধী প্রচারে। ভুলে যান নিজ বাংলাদেশের প্রতি নরেন্দ্র মোদীর অবদানের কথা। আজ তারই মাসুল দিতে হলো ভারত থেকে বিতাড়িত ও চরম অপমানিত হয়ে। কালো তালিকাভুক্ত করা হয় এদের। যেন তারা দাগী অপরাধী কিংবা সন্ত্রাসী। অথচ এরা ছিলেন রাজনীতির বাইরে। বাংলাদেশকে অপমানিত করলেন তারা। নায়ক ফেরদৌসকে ধন্যবাদ। তিনি এক অনলাইন পোর্টালে এজন্য ভারত সরকারের কাছে দু:খ প্রকাশ করেছেন।

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। নরেন্দ্র মোদীর মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা ৫ বছর ভারত শাসন করল। তারপরও কেউ বলে না ভারত বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দুর দেশ। এর আগে অটল বিহারী বাজপেয়ী জোটগতভাবে ভারত শাসন করে গেছে। তখনও ভারতের এই গণতান্ত্রিক পরিচয়টাই বজায় ছিল। বিশ্বে ভারতের অনেকগুলো পরিচিতি আছে। তার অন্য আরেকটি পরিচিতি ভারত বহু ভাষাভাষীর দেশ। পৃথিবীতে এত ভাষাভাষীর লোক এক সঙ্গে থাকার নজির বিরল। এটাই ভারতকে করেছে সবার চাইতে আলাদা।

এই এক সঙ্গে থাকার পিছনে রয়েছে ভারতের দর্শন। সেই দর্শনের উত্তম প্রবক্তা স্বামী বিবেকানন্দ। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, গর্বের সঙ্গে বলো আমি হিন্দু, আমি এই ভারত মায়ের সন্তান। স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণীকে সামনে রেখেই বিজেপির বর্তমান রাজনীতি। আর যারা ভারতে থেকে বলবে আমি সেকুলার,আমি গরু খাই। তারা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আজ ত্রিপুরা,পশ্চিমবঙ্গ থেকে গরুখোর সিপিএম পার্টি নাই হয়ে গিয়েছে। মার্কসবাদ, লেনিনবাদ আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এবারের লোকসভা নির্বাচনেও তেমন আশা নেই তাদের। অথচ এরাই ছিল চ্যাম্পিয়ন সেকুলার। ভারতের বর্ণচোরা কংগ্রেস ও বামরা বিজেপিকে হিন্দুত্ববাদী বলে প্রচার করেছে। নরেন্দ্র মোদীকে কসাই আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গমনে বাধা দিয়েছে। নিষিদ্ধ তালিকায় তার নাম তালিকাভূক্ত করেছিল। তার ফল কি? মনমোহন সরকার বিদায় আর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের চাকরি ছেড়ে আগাম অবসর নেন সেই নারী যিনি নরেন্দ্র মোদীকে কংগ্রেসের কথায় কালো তালিকাভূক্ত করেছিল।

বিশ্বে ভারত এখনো গণতান্ত্রিক দেশ ও বহুভাষাভাষির দেশ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। আর এর বিপরীতে রাজনীতি করতে গিয়ে বিরোধীরা নাই হয়ে গেছে। কংগ্রেস নামক সর্বভারতীয় দলগুলো এখন আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে। আর আঞ্চলিক দলগুলো ভারতে বিলুপ্ত হতে চলেছে। এই যখন অবস্থা তখন নিজেদের অস্তিত্ব বাচাতে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধি মনোনয়ন জমা দেবার আগে গির্জায় না গিয়ে এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী পার্টি সদস্যের বাড়িতে সপরিবারে হোম যজ্ঞ করেন। সেটা আবার সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটা করে দলের অনুগতদের নিয়ে রাম নবমীর উৎসব মহা ধূমধামে পালন করছেন। এই মমতা কয়দিন আগে সিপিএমের সঙ্গে গলা মিলিয়ে রাম নবমীর বিরোধিতা করেছে। একে বাইরের রাজ্যের উৎসব, অবাঙ্গালীদের উৎসব বলে সমালোচনা করেছেন। আজ যখন টের পাচ্ছেন সিপিএমের মত দশা তারও হতে পারে তখন রামের শরণে চলে যাচ্ছেন তিনি। আর মুসলমানদের কাছে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি ফেরদৌস ও নূরকে ভাড়া করেছেন।

লোকসভার ফল যাই হোক ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি এখন একটি শক্তি। একে টেক্কা দিতে হলে রামের শরণ নিতে হবে। রহিমের শরণে গেলে সিপিএেমর মত দশা হবে। এটা মমতা ব্যনার্জী বুঝে গেছেন। সোনিয়া গান্ধিও বুঝে গেছেন। তাই মন্দির যাত্রা করেই অতীতের পাপ ধুয়ে রাজনীতিতে বিজেপির মুখোমুখি হতে হবে এদের। এর বিকল্প নেই।

লেখক : সাংবাদিক