ছড়িয়ে দিতে হবে নারীর সাফল্যের গল্পগুলো

সাজিদা ইসলাম পারুল:  বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৯৪ শতাংশ নারীই গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হন। এ অবস্থায় নারীর নিরাপদ চলাচলে এক অভিনব পন্থা বের করেছেন আতিকা রোমা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘যাবো বহুদূর’ নামক স্কুটি চালানোর প্রতিষ্ঠান। গত এক বছরে ২৬৫ জন নারীকে স্কুটি চালানোয় প্রশিক্ষিত করে তুলেছেন তিনি। রোমার মতো আরও ১৪ জন সাহসী নারী গতকাল শনিবার তাদের সফল হওয়ার গল্প বলেছেন রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ঢাকায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড-ওয়াও’ ফেস্টিভ্যালের ‘স্পিড মেনটরিং’ অনুষ্ঠানে।

একাডেমির আর্ট জোনে (আমগাছ তলায়) ভিন্নধারার উপস্থাপনার মাধ্যমে ছেলেরাও যে ঘরের রান্না করতে পারেন, খাবার পরিবেশন করতে পারেন- তা দেখিয়েছেন শিল্পী জয়দেব রোয়াজা। আদিবাসীদের কিছু জনপ্রিয় খাবার তৈরি করে দর্শনার্থীদের মাঝে পরিবেশন করেন তিনি। একইসঙ্গে আগত দর্শনার্থীদের নারী-পুরুষে ভেদাভেদ ভুলে সমতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা আমাদের ভাগ করে পাঠাননি। ভাগাভাগি শিখিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এসব ভুলে দুইয়ে মিলে সংসারের সব কাজ করা জরুরি। মেয়ে-ছেলে ভাগ করা ঠিক নয়।’

নারীর সফলতা, তাদের অর্জনগুলো উদ্‌যাপন এবং বিশ্বজুড়ে নারীরা যে ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তার ওপর আলোকপাত করেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এই ফেস্টিভ্যাল। এটি নারীর জন্য বিশ্বে সবচেয়ে বড় উৎসব। ২০১০ সালে লন্ডনে এ উৎসবের যাত্রা শুরু হয়।

গতকাল বিশিষ্টজনকে নিয়ে পাঁচটি প্যানেল আলোচনা, পাপেট শো, উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য, পারফরমেন্স আর্ট, সিসিমপুর, অভিনয়শিল্পী রাফিয়াত রশিদ মিথিলার সঞ্চালনায় শিশুদের জন্য আন্ডার টেন’স ফেমিনিস্ট কর্নার (গল্প শোনা), চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডেও ছিল নারী-পুরুষে সমতা তৈরির বিষয়। লিঙ্গবৈষম্য দূর করাসহ নারীর অধিকারের বিষয়গুলো দু’দিনের এই ফেস্টিভ্যালে উঠে এসেছে।

এর আগে শুক্রবার নারী ও কিশোরীর ক্ষমতায়নের অগ্রগতিতে বৈশ্বিক আন্দোলন সৃষ্টিতে আয়োজিত এ ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নাসিম ফেরদৌস, ওয়াও ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জুড কেলি সিবিই এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের উপপরিচালক অ্যান্ড্রিউ নিউটন।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় দীপু মনি বলেন, বাংলাদেশে জেন্ডার সমতার ভিত্তিতে সমাজ বিনির্মাণের মূলে রয়েছে নারী ও কিশোরীর অগ্রগতি। এসডিজি অর্জনে নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও বিশেষ জোর দিচ্ছে। যদিও এ লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে আমাদের গর্ব করার সুযোগ রয়েছে, তবুও কিছু ক্ষেত্রে এখনও বাধা রয়ে গেছে। এসব বাধা নিরসনে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম অনুশীলনীগুলো জানা এবং নারী ও কিশোরীর অগ্রগতির পথ সুগম করে দিতে দেশে ‘উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’র মতো গণঅংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্ম শুরু করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমরা আশা করি এ রকম একটি ফেস্টিভ্যাল বাংলাদেশের নারী ও কিশোরীর জীবনে গঠনমূলক পরিবর্তন আনবে।

জুড কেলি বলেন, বাংলাদেশে ওয়াও ফেস্টিভ্যাল শুরু করা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি আয়োজন। কেননা, প্রতিনিয়ত নারীর সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলো তুলে আনে ওয়ায় ফেস্টিভ্যাল, আর দেখাতে চায় কীভাবে একসঙ্গে সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যান্ড্রিউ নিউটন বলেন, এ উৎসব কেবল শুরু। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রচুর আয়োজন করা হবে। সব ওয়াও ফেস্টিভ্যালেই নারী ও কিশোরীর অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে ধারাবাহিকতা, সেটি অক্ষুণ্ণ ছিল ওয়াও ঢাকা ফেস্টিভ্যালেও।

গতকাল ফেস্টিভ্যালের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জুড কেলি, ব্রিটিশ কাউন্সিলের ডিরেক্টর বারবারাহ উইলিয়াম, আফসানা শাহীন ও রাফিয়াত রশিদ মিথিলা। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্যানেল আলোচক ছিলেন নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, মঙ্গলদ্বীপের প্রতিষ্ঠাতা এবং ওয়াও ঢাকা ফেস্টিভ্যালের কিউরেটর সারা যাকের, মানবাধিকারকর্মী মুক্তাশ্রি চাকমা সাথী, নৃগোষ্ঠীর প্রথম নারী বিচারক ভিক্টোরিয়া চাকমা, চলচ্চিত্র পরিচালক শারমীন শামস, গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট উছাছা এ চাক ঊষা, নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্তা, গবেষক ইমতিয়াজ পাভেল, আলম খোরশেদ, নেপালের মানবাধিকার কর্মী সারিনা রায়, সেলিনা রায় সুপ্রভা প্রমুখ।

বিশিষ্টজনের মতে, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা দূর করে নারীর অগ্রগতির পথ সুগম করতে হবে। শৈশবেই ছেলেমেয়ে সন্তানদের মাঝে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের বীজ বুনতে হবে। পরিবারই পারে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রথম পদক্ষেপ নিতে। ছড়িয়ে দিতে হবে নারীর সাফল্যের গল্পগুলো।

গত বছর ব্রিটিশ কাউন্সিল রংপুর, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ওয়াও চ্যাপ্টারসের কয়েকটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। দেশের পাঁচটি বিভাগীয় শহরে ওয়াও চ্যাপ্টারস আয়োজনের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ওয়াও ঢাকা ফেস্টিভ্যাল’।

সূত্র: সমকাল