আর নয় মৃত্যু, চাই ভবনে চাকুরীজীবীদের সুরক্ষা

সুমন দত্ত

ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, মানুষের রোগ, শোক ও মৃত্যু। এই তিনটি অবশ্যই প্রত্যেক মানুষের জীবনে ঘটবে। তাই এই তিন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদের সকলেরই পড়তে হবে। তেমনি ভবন থাকলে, সেখানে নানা দুর্ঘটনা ঘটবে। ভবনটি এক সময় জরাজীর্ণ হয়ে ভেঙে পড়বে। তার জন্য আমরা কি প্রস্তুত?

বাংলাদেশে ভবন ধসে পড়ে মৃত্যু কিংবা ভবনে আগুন লেগে মৃত্যু, নতুন কিছু নয়। তারপরও প্রতিটি ঘটনা নানা প্রশ্ন রেখে যায় মানুষের মনে। কেন বার বার এসব অবহেলায় মানুষের প্রাণহানি ঘটবে? বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুনে চলে গেল ২৬ প্রাণ। আহত ৭০ এর অধিক। কেন এত হতাহতের ঘটনা? যেখানে আমরা সকলে জানি কেন আগুন লাগে। লাগলে কি করা উচিত।

এক সময় বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ চলে যেত। প্রচার মাধ্যম শক্তিশালী হওয়ায় এবং উপকূলে নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মাণের কারণে ঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক অর্জন। যার কৃতিত্ব এদেশের মানুষেরই, সরকার ও বেসরকারি এনজিওগুলোর। ঝড়ে এখন উপকূলের জেলের জীবনও সুরক্ষিত। প্রাকৃতিক সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেলেও মানবসৃষ্ট বিপর্যয় থেকে আজ আমরা রক্ষা পাচ্ছি না। এ লজ্জা আমাদের।

আজ এক শ্রেণির দখলবাজ ব্যবসায়ী ফুটপাত দখল করে মানুষের চলাচলকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে তাদের জীবনকে অনিরাপদ করছে। অল্পবয়সী অদক্ষ লোকদেরকে গাড়ির চালক বানিয়ে দিয়েছি। মানুষকে দুর্ঘটনার মুখে ঠেলে দিচ্ছি। মাকড়সার জালের মত লোকালয়ে বিদ্যুৎ, ফোন,ইন্টারনেট, ডিশ সংযোগের তার শহর জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছি।

যেখানে সেখানে বাড়ির ওপর মোবাইল টাওয়ার তৈরি করে ক্যানসারের মত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছি। মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনে ডাবে থাকে না পানি, গাছে পাখি বাসা বানায় না। অজানা রোগে দলে দলে মরে কাক। সবকিছুর পিছনে কাজ করছে ব্যক্তি মানুষের লোভ। এই লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ নিজেই নিজের ক্ষতি করছে। এর থেকে বের হতে পারছে না সরকার, আদালত, গণমাধ্যম ও প্রশাসন।

তারপরও আশা মানুষ আবারো জেগে উঠবে। লোভ লালসা থেকে বেরিয়ে আসবে। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ঘটনা মানুষের মনে দাগ কাটবে। নগরীর প্রতিটি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেগুলোর ব্যবহার কীভাবে করা হবে তার প্রশিক্ষণ সবাইকে দিতে হবে। প্রতিটি ভবনে বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভবনের পাশে গা ঘেঁষে ভবন নির্মাণ করা যাবে না। যারা ভবন বানাবে তারা প্রত্যেকে নিজেদের জমির সীমানা থেকে ৩-৪ ফিট জায়গা ছেড়ে ভবন তৈরি করবেন। ভবনের নিরাপত্তা মনিটর করার জন্য সরকারের একাধিক সংস্থাকে দায়িত্ব দিতে হবে।

আগুন লাগলে যদি সেনা, নৌ, বিমান, দমকল সবাইকে ডাকতে হয় তবে ভবনের নিরাপত্তার দিকগুলো দেখার জন্য তাদের পরামর্শ নেয়া হোক। আগুন লাগলে তারা কাদের সমন্বয়ে কাজ করবে এই দায়িত্ব দমকলকে দেয়া হোক। বিদেশ থেকে দমকলের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি কেন আনা হচ্ছে না? কেন দমকলের জন্য নিজস্ব হেলিকপ্টার থাকবে না? মন্ত্রী এমপিদের জন্য রাস্তা যদি মিনিটে খালি করে দেয়া সম্ভব হয় তবে দমকলের গাড়ির জন্য কেন রাস্তা মিনিটে খালি করা যায় না?

বনানীতে ভবন নির্মাণে যারা রাজউকের নিয়ম মানেনি তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। সরকারি কাজে আদালত বাধা। এ কথা সরকারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা প্রায়শই বলে থাকেন। নিজেদের অবহেলার কথা তারা স্বীকার করতে চান না। এক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে তিনি যাদের বিচার করার দায়িত্ব দিয়েছেন তারা কোন প্রেক্ষিতে সরকারি কাজে বাধা দেয়ার আদেশ দিলেন।

বিজেএমইএ ভবন এখনো ঠায় দাড়িয়ে আছে হাতিরঝিলে। ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য আদালতের চূড়ান্ত আদেশেরও পরও এ রায় বাস্তবায়ন হয় না। নদীর জায়গা উচ্ছেদে আদালত বাধা, অবৈধ বস্তি উচ্ছেদে আদালত বাধা। এভাবে যারা আদালতকে ঢাল বানিয়ে নিজেদের আত্মরক্ষা করেন তাদের বিষয়ে আদালতের অবশ্যই বক্তব্য থাকা উচিত। প্রধান বিচারপতিকে এসব বিষয়ের ওপর অন্য বিচারপতিদের দিক নির্দেশনা দিতে হবে। তা না হলে এদেশের জনগণ শুনেই যাবে ভালো কাজ করা যায় না। আদালত থেকে আসে নানা বাধা।

পরিশেষে বলতে চাই। এভাবে মানবসৃষ্ট মৃত্যু দেখতে চাই না। চাই না শুনতে আর সাফাই। এখন শুধু কাজ করতে হবে। সেটা বহুতল ভবনে কাজ করা লোকদের জীবনের নিরাপত্তার। শহরের সব বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা লাগানোর কাজ আগামী কয়েকমাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটাই সরকারের কাছে জনগণের চাওয়া।

লেখক: সাংবাদিক