ধর্ম যার যার, উৎসব সবার ঠিক না বেঠিক

সমুন দত্ত
ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে দেশের বুদ্ধিজীবীরা এই স্লোগান দিলেও অনেকে এর প্রতিবাদ করেন। এর সমালোচনা করেন। সবকিছু নিয়ে বিতর্ক করা জাতির বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যারা সাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে তাদের কাছ থেকে এই স্লোগানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসে বেশি।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক কে বলাতে শোনা যায় উৎসব সবার কথাটি পরিবর্তন করে বলুন রাষ্ট্র সবার। মানে ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।

আমার মতে দুটো স্লোগানই ঠিক। তরবারির মাধ্যমে বঙ্গে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তেমনি এদেশে হিন্দু মুসলমানের উৎসবে সব শ্রেণি পেশার মানুষের অংশগ্রহণ পুরানো রেওয়াজ। ৮০’র দশকে এই অংশগ্রহণে ভাটা পড়েছিল। এজন্য বাউল শাহ আবদুল করিম গান লেখেন আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। এই গানটাই প্রমাণ করে দেশ ভাগের আগে এই বঙ্গ ছিল অসাম্প্রদায়িক। পরে এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ হয়েছে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রটাই ছিল আগাগোড়া সাম্প্রদায়িক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শাসকদের দমন পীড়নের কারণে এদেশের মোল্লাদের সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায়নি। দেশ স্বাধীনের পর বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর পাকিস্তান থেকে যে শয়তানগুলো ফিরে আসলো তাদের দ্বারাই সাম্প্রদায়িকতার নতুন বীজ এদেশে রোপণ হয়। যা জিয়া এরশাদ পর্যন্ত ফুলে ফেঁপে উঠে।

এদের মাধ্যমে দেশের মোল্লারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করলো। যার ফলশ্রুতিতে শাহ আবদুল করিমকে লিখতে হয় আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। আজ বাংলাদেশে ঈদের নামাজ পড়তে হয় পুলিশের পাহারায়। হিন্দুদের পূজা, হ্যাপি নিউ ইয়ার ও বড়দিন পালিত হয় পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থেকে। কারণ এক শ্রেণির উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এদেশে এখনো সক্রিয়। এরা হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান সবার শত্রু। সরকার আজ এদেরকে দমন না করে তাদের সাম্প্রদায়িক বিষকথা ওয়াজের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়। আর তারই ফলশ্রুতিতে দেশের উৎসবগুলোতে পুলিশ পাহারা বসাতে হয়।

দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন উচ্চারণ করেন ধর্ম যার যার, উৎসব সবার, তখন ওই শ্রেণির সাম্প্রদায়িকরা বলে উঠে, এটা ঠিক নয়। উৎসব সবার হয় কি করে?

ধর্মান্ধ এই গোষ্ঠী বলে ঈদে হিন্দুরা কি নামায পড়তে যায়? হিন্দুরা কি গরু কোরবানি দেয়? এসব উদ্ভট অবান্তর প্রশ্ন করে তারা। অথচ এরা জানে না উৎসবে যোগ দেয়ার অর্থে বলা হয় উৎসব সবার। এদেশের হিন্দু -খ্রিস্টান-বৌদ্ধরা রোজার ঈদে প্রতিটি মুসলিম বাড়িতে অতিথি হয়ে যায়। সেখানে সবার সঙ্গে আনন্দ ফুর্তি করে।   বাংলাদেশে বহু হিন্দু ছেলে মেয়ে ঈদের দিন গুরজনদের সালাম দিয়ে সেলামি পেয়েছে। কোরবানি ঈদে বহু মুসলিম পরিবার খাসি কোরবানি দিয়ে হিন্দু বাড়িতে পাঠিয়ে দিত। এই রেওয়াজ পুরান ঢাকায় এখনো আছে।

এক সময় শবেবরাতে হিন্দু মুসলিম সবার বাড়িতে নানা ধরনের হালুয়া রুটি যেত। তাই প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান সার্বজনীন রুপ পেত। এটা হয়ত সেই সব মুসলমানরা জানে না যারা ওভাবে কারো সঙ্গে মেশেনি কিংবা দেখেনি। তাই তারা উৎসবের আনন্দটা যে সবার সেটা মানতে চায় না। এটাই সবাই জানে ঈদ মুসলমানের, পূজা হিন্দুদের, বড়দিন খ্রিস্টানদের। কিন্তু এসব অনুষ্ঠান ঘিরে যে আনন্দ উৎসব হয় তাতে সবাই যোগ দেয়। আর এই অর্থেই কথাটা বলা হয় ধর্ম যার য়ার, উৎসব সবার। এটা যারা বুঝেও বুঝতে চান না তারাই বেকুবের মত তর্ক জুড়ে দেন।  

হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো হিন্দুরাই করে থাকে। দুর্গা পূজা হিন্দুরাই করে থাকে। মুসলমানরা দুর্গাপূজা করে না। মুসলমানরা দুর্গাপূজা দেখে। যেমন হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। হিন্দুদের দুর্গা পূজা ঘিরে চারদিন ব্যাপী উৎসব হয়। চারদিন বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে পরিবার নিয়ে হিন্দু মুসলমান সবাই ঘোরাঘুরি করে।

এছাড়া পূজার শেষ দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের সময় আর বিসর্জনের আগে হিন্দুদের সঙ্গে অন্যধর্মের লোকদের আনন্দ ফুর্তি করতে দেখা যায়। এজন্য দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন বলা হয়েছে। বাংলাদেশে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ার বাসিন্দারাও এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করে। বিজয়া দশমীতে হিন্দুরা মুসলিম বন্ধুদের লাড্ডু খাইয়ে দিনটি উদযাপন করে।

এভাবে হিন্দুদের দোল (হোলি) উৎসব অন্যধর্মের লোকরা রঙ মেখে আর দীপাবলি (দিয়ালী)সবাই প্রদীপ জেলে এসব অনুষ্ঠান পালন করে। এসব অনুষ্ঠান আজ আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। কারণ এই উৎসবগুলো এখন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পালিত হয়।  আর এতে যোগ দেয় সব ধর্মের ও সব বয়সের মানুষ। এজন্যই আজ বলা হয় ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এসব উৎসবের মাঝে কাউকে ধর্মান্তরের মতো ঘৃণিত কাজের উসকানি দেয়া হয় না। তাই ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখুন আর উৎসবকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন।

আজ বাংলাদেশের তরুননা হ্যাপি নিউ ইয়ার পালন করবে, পহেলা বৈশাখ পালন করবে এতে কি কারো পাপ হবে? আমেরিকার বহু বাঙালী হিন্দু মুসলিম ক্রিসমান ট্রি সাজিয়ে বড়দিন পালন করে। তাতে কি তারা খ্রিস্টান হয়ে গেল?  সবাই জানি ক্রিসমাস শুরু হয় সকাল বেলা গির্জায় যীশুর ও মাতা মেরির কাছে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। যেটা শুধু খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারিরাই করে থাকে হিন্দু কিংবা মুসলমান করে না। কিন্তু উৎসবটা শেষ হয় ক্রিসমাস ট্রি তৈরি করে ও নানা ধরনের গিফট উপহার দিয়ে।যাতে অংশ নেয় সব ধর্মের মানুষ।  

আসুন সবাই পুলিশি পাহারা ছাড়া ঈদ, পূজা, বড়দিন, পহেলা বৈশাখ পালন করি। যেদিন এটা করতে পারবো সেদিনই আমরা জোর গলায় বলতে পারবো ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। সেদিন আমরা পাব সেকুলার বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

লেখক সাংবাদিক