মিডিয়ায় চিকিৎসকদের নেতিবাচক প্রচার হয়

সুমন দত্ত: দেশের চিকিৎসকরা কলুর বলদের মতো চিকিৎসা দেয়। ১৭ কোটি লোকের জন্য আছে মাত্র ২১ হাজার রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ও ৩৫ হাজার নার্স। তাছাড়া নামে বেনামে আছে দেড় লাখ চিকিৎসক। এই জনবল দিয়ে উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়। তাই আবেগ দিয়ে নয় স্বচ্ছ ডেটা ও সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে চিকিৎসকদের সমালোচনা করা উচিত। মিডিয়া চিকিৎসকদের নেতিবাচক প্রচার হচ্ছে। ইতিবাচক দিকটি তুলে ধরা হচ্ছে না। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে চিকিৎসকদের নৈতিকতা চর্চা: বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া বক্তারা।

সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ডা. ফজলে আকবর। তিনি জাপানের এহিম ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট স্কুল অব মেডিসিনের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক কামরুল হাসান খান। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। এছাড়া ডা. মামুন আল মাহাতাব , ডা. ফয়জুল হাকিক প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, চিকিৎসকদের নৈতিকতা চর্চার বিলুপ্তির অন্যতম কারণ ব্যাক্তিকেন্দ্রিকতা। তবে এ দায় শুধু চিকিৎসকদের ওপরে চাপালে হবে না। কারণ নৈতিকতা শুরু হয় পরিবার থেকে। যার ক্রমবিকাশ ঘটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সামাজিক আচার আচরণে এবং কর্মপরিবেশ থেকে। ওষুধ কোম্পানির লোভনীয় সুযোগ সুবিধা বর্জন করা, এতে রোগীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় ওষুধের বোঝা কমবে। রোগ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ প্রত্যাখ্যান। এতে রোগীরা কম টাকায় রোগ নির্ণয় করতে পারবে। ব্যক্তিগত লোভ সংবরণ। এতে রোগীরা চিকিৎসকদের তাদের সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলতে পারবেন। বেসরকারি হাসপাতালের ফাদে না পড়া। এতে রোগীর আইসিইউ-সিসিইউ খরচ কমবে।

ডা. ফজলে আকবর বলেন, পৃথিবীর সব দেশে এক আইন নয়। এ কারণে সব দেশের নৈতিকতার মানদণ্ড এক নয়। কোনো দেশে গর্ভপাত বৈধ কোনো দেশে নয়। সব দেশের চিকিৎসা ব্যয়ও এক নয়। কারণ সব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। বাংলাদেশে জরুরি চিকিৎসা যেভাবে পাবেন আমেরিকায়  সেভাবে পাবেন না। আমেরিকায় ইনস্যুরেন্স না করলে আপনি চিকিৎসা পাবেন না। বাংলাদেশে আপনি ইনস্যুরেন্স ছাড়াই চিকিৎসা পাবেন। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা রোগীদের যেসব পরীক্ষা নিরীক্ষা দেন তার রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বে তা নয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে একটি পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে কয়েক মাস লেগে যায়। আবার বেশি টাকা দিলে দ্রুত দেয়া হয়।

ডা. ফয়জুল হাকিম বলেন, ভুল চিকিৎসার দায়ভার ডাক্তারদের ঘারে চাপিয়ে দিলে হবে না। এর সঙ্গে নার্সরাও দায়ী। আমার মাকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে নার্সরা ভুল করে। এতে তার বুকে পানি এসে যায়। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কারণে এক শ্রেণির লোভী চিকিৎসক তৈরি হয়েছে সত্য। কিন্তু অনেক ভাল ডাক্তারও আছেন। যার কারণে এখনো এদেশের মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে এদেশের মানুষ চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছে। এখন মানুষ কেন ভোট দিতে যায় না। তেমনি কেন এদেশের চিকিৎসার ওপর মানুষের ভরসা নেই। এসব খতিয়ে দেখতে হবে। আবেগ দিয়ে ভাবলে চলবে না। কিউবা উন্নত চিকিৎসা দিতে পারে যেটা আমেরিকাও পারে না।

ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, চিকিৎসকদের নৈতিকতা শিক্ষা তাদের আমলে দেয়া হতো না। এখন এসব কারিকুলামে দেয়া হয় কিনা জানি না। তবে এদেশে চিকিৎসকরা কলুর বলদের মত কাজ করে। তার কথা মিডিয়ায় উঠে আসে না। চিকিৎসকরাও মানুষ, তাদের লোভ থাকা স্বাভাবিক। নৈতিকতার চর্চা আমরা ভেঙ্গে ফেলি। রোগী দেখার সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে অন্য রোগী বসিয়ে আমাদের রোগী দেখতে হয়। এতে চেম্বারের কর্মচারীরা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। ১০০ ও ২০০ টাকা নিয়ে আরও ৪-৫জন রোগীকে আগে ঢুকিয়ে দেয়। এই অনৈতিক কাজগুলো আমরা হর হামেশা করে থাকি। উপজেলায় চিকিৎসকরা কেন যেতে চায় না। তার বহু কারণ আছে। সেগুলো অ্যাড্রেস না করে ঢালাও ভাবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কথা বলা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদেরের চিকিৎসার সময় দেবি শেঠি আসার আগ পর্যন্ত কোনো দৈনিক আমাদের সম্পর্কে ভালো বলেনি। অথচ তিনি বলার পর পত্রিকা গুলো আমাদের সম্পর্কে লিখলো।

অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, লোকজন জানে কত অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে আমাদের চিকিৎসা দিতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন ৯ হাজার রোগী দেখা হয়। সকাল ৮টা হতে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চলে এই রোগী দেখার কাজ। ভবিষ্যতে আমরা ক্যাপাসিটি আরও বাড়াবো। এদেশে চিকিৎসা সেবায় বাধা গুলো কি কি এ নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন। সেখানে এসবের উত্তর দেয়া আছে বলে জানান।

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকানিউজ২৪ডটকম