সামপ্রদায়িক ও বর্ণবাদী উস্কানি সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারেন্টদের জন্ম

মোহা: খোরশেদ আলম: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে বহুল আলোচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে হিলারী ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লিঙ্গের বৈষম্য, বর্ণবাদী বৈষম্যের ধোঁয়া তুলে জনপ্রিয় প্রার্থী হিলারী ক্লিনটনকে পরাজিত করেন। পাশাপাশি অভিভাষন নীতিতে ট্রাম্পের ঘোর বিরোধিতা তার নির্বাচনী জয়কে ত্বরান্বিত করে। ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ের পর মেক্সিকোর অভিবাসন অনুপ্রবেশ প্রত্যাশীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেন। বিপরীতে তার নীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান নেন তার স্ত্রী মোনালিসা ট্রাম্পসহ সাবেক ফাস্টলেডীগণ। বিশ্লেষকদের ধারণা, কোনা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে মার্কিন ফাস্টলেডীদের এমন ঐক্যের ঘটনা মার্কিন ইতিহাসে বিরল।
মার্কিন সদর দফতর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলেছে, মার্কিন অবৈধ প্রশাসনের পরিচালিত কঠোর অভিযানে ১৯ এপ্রিল থেকে ৩১ মের মধ্যে আটক হওয়া ব্যক্তি ১৯৪০ এবং ১৯৯৫টি শিশুকে পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। শিশুদের কার বয়স কত তা মার্কিন প্রশাসন জানায়নি। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এই নির্দয় ও অভিভাষন বিরোধী ব্যক্তিটি বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি দেশ আমেরিকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। ট্রাম্পের ততকালীন সময়ে অভিভাসন বিরোধী স্লোগান ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের আগে স্লোগান দিয়ে সেসব দেশের নেতারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে। আজ নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিকামী দেশে ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নামক এই দুধর্ষ সন্ত্রাসী মসজিদের মুসুল্লীদের উপর গুলিবর্ষণকারী অস্টেলিয়ান অধিবাসী এবং সে কঠোর অভিবাসী ও ইসলামপন্থী বিদ্বেষী। ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নিজেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক বলেও দাবি করে, অর্থাত সে ট্রাম্পের ন্যায় অভিবাসন নীতির ঘোর বিরোধী।
অপরদিকে অন্য আরেকটি গনতান্ত্রিক দেশের নাম না বললেই নয়, সেদেশে অন্য গনতান্ত্রিক দলের বিপরীতে তারা সাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে ক্ষমতা আসতে বিশেষ ততপর। গত নির্বাচনে তারা উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে নিরংকুশ জয়লাভের পর ২০১৯ সালে আবারও পূর্বের ন্যায় জয়লাভের স্বপ্ন দেখছে বিজেপি দল। ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের মতে, “আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এখন চলছে সংঘর্ষ, খুন, হত্যা, লুট এবং দলবদলের কেনাবেচা। গেরুয়া বাহিনী দ্বিতীয়বার ক্ষমতা আসার জন্য সারা দেশে এক অঘোসিত সন্ত্রাস শুরু করে দিয়েছে। শুধু ভারতের আভ্যন্তরীন খবরই নয়, আমেরিকার সিনেটেও এরকমই একটি রিপোর্ট জমা পড়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, লোকসভা ভোটের আগে ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের প্রবল আশংকা রয়েছ। সে দেশের গুপ্তচর বাহিনীর সর্বেসর্বা ভ্যান কোটস্থ রিপোর্টে তিনি লিখেছেন, নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবনার জোর দিলে সাধারণ নির্বাচনের সময় ভারতে সাম্প্রদায়িক হিংসার আশংকা রয়েছে। শুধু আমেরিকার সিনেটরের এই গোপণ রিপোর্ট নয়, চাকুরির ভয়ে মুখ খুলতে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা অনুরূপ আশংকা করেছেন। সুখরঞ্জন বাবু উল্লেখ করেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অমিতশাহ দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে ধর্মীয় উস্কানিই দিচ্ছেননা, তারা হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করে চলেছেন“। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক ও শান্তি প্রিয় দেশ, তাই পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক দল এমন কোন উস্কানী দেবেনা, যারফলে এদেশের বিভিন্ন ধর্মের লোকের মাঝে কোন অশান্তি সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা সদ্য কাস্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের পেছনে রয়েছে ভারতের আসন্ন নির্বাচন। আর এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি বলেন, দআমার সন্দেহ আছে এবং অবাক হচ্ছি যে নির্বাচনের ঠিক আগেই পুলওয়ামা হামলার ঘটনা ঘটল। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর সমালোচনা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশগুলো নির্বাচনের আগে বিভিন্ন উগ্রবাদের স্লোগান তুলে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায় বা ক্ষমতায় আসতে চায়। রাষ্ট্রীয় এসব উগ্রবাদের প্রপাগান্ডার ফলে দেশে দেশে বিভিন্ন দল, মতের সৃষ্টি হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠ-পোষকতা দেয়া হয়। বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত নির্বাচনগুলোতে আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ডানপন্থীদের উত্থান ঘটে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পাশাপাশি আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ মুসলিম দেশগুলোতে আমেরিকার নেতৃত্বে যুদ্ধের পর সেসব জায়গায় কিছু ধর্মান্ধ জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমা দেশগুলো এসব ধর্মান্ধ জাতীয়তাবাদীদের বা কথিত মুসলমানদের সহিত সকল মুসলমানকে সন্ত্রাসী নামে বাজারজাত করার চেষ্টা করে। নিউজিল্যান্ডে একক হত্যাকান্ডের নায়ক ব্রেন্টন ট্যারেন্ট অস্ট্রেলিয়ার অধিবাসী। হলি আর্টিজনের পর এই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশকে কম নাস্তানাবুদ করেননি। তারা নিরাপত্তার নামে যে খামখেয়ালীপনা আচরণ করেছে, তা বাঙ্গালীদের হৃদয়ে আজও ক্ষত তৈরি হয়ে আছে। আমরা আশা করব অস্ট্রেলিয়ার এই সন্ত্রাসী যুবকের ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার সরকার দায় এড়াতে পারেনা। তাই নিউজিল্যান্ড সরকারকে যথোপযুক্তভাবে তদন্তে সহায়তা করা এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল সেসব দেশে খেলতে গেলে খেলোয়াড়দের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তার নিশ্চিত করা। নিউজিল্যান্ডে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিরাপত্তার অজুহাতে সকল মসজিদ সাময়িকে বন্ধ রাখা, এটাও ধর্মকামী মানুষদের জন্য কাম্য নয়। সেসব দেশ নিজেদের সন্ত্রাসমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিরাপত্তার নামে ছবক দেয়, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী যথার্থই বলেছেন বাংলাদেশকে যেসব দেশ সন্ত্রাসের ব্যাপার ছবক দিত, এখন সেসব দেশ বাংলাদেশ থেকে ছবক নিক।

বিশেজ্ঞদের ধারণা, সন্ত্রাসবাদী দমনে বিশ্ব নেতাদের একসঙ্গে কাজ করার এখনই সময়। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষের জীবন ও সন্মান সমান মযাদা দিতে হবে। শক্তিশালী রাষ্ট্র যুদেধ অপরাধ করলে মাফ পেয়ে যাবে এবং দুবল রাষ্ট্রের সৈন্যদের বিচার হবে, এটা হতে পারেনা। এসব থেকে বিভিন্ন উগ্রবাদীর জন্ম হয়। তাই নিউজিল্যান্ডের শ্বেতাঙ্গ জঙ্গির অতর্কিত আক্রমনে মসজিদে নামাজরত ৫০ জনকে ঠান্ডা মাথায় কাপুরুষিতভাবে হত্যা ও প্রায় সমান সংখ্যককে আহত করা, এর সুষ্ঠু ও দৃশ্যমান বিচার দেখতে চায় বিশ্বের শান্তিকামী মুসলিম সম্প্রদায়। যদিও অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডে বিশ্ব নেতারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, শুধু মুসলিম সম্প্রদায় হতাহতের ফলে বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া জোড়ালা হয়নি বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা । লেখক: বার্তা সম্পাদক, দেশের ডাক