চলে গেলেন ভাওয়াইয়া গানের কিংবদন্তি রাজা

নিউজ ডেস্ক:   সাংবাদিক ও ভাওয়াইয়া গানের কিংবদন্তি শফিউল আলম রাজা আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ১৭ মার্চ রোববার রাজধানীর মিরপুর পল্লবী এলাকার নিজের প্রতিষ্ঠিত ভাওয়াইয়া গানের স্কুল কলতানের একটি কক্ষের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হতে পারে বলে জানিয়েছে পরিবারের সদস্যরা। আকস্মিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ৫২ বছর বয়সে থেমে গেলো ভাওয়াই গানের কিংবদন্তি ও মেধাবী সাংবদিক শফিউল আলম রাজার জীবনের শ্রোতধারা। এদিকে শফিউল আলম রাজার আকস্মিক মৃত্যুর খবরে সাংবাদিক মহল ও শিল্পী মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার আকস্মিক মৃত্যুতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এবং শিল্পী সমাজের পক্ষ থেকে শোক জানানো হয়েছে। এদিকে রাজার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রোববার রাত ১০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নিয়ে আসা হয় তার মরদেহ। সেখানে প্রথম নামাজে জানাযা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে। সেখানে দ্বিতীয় নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, রাজা ভাওয়াইয়া গানের প্রসারের জন্য এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ওই স্কুলে রোববার দুপুরের দিকে একটি কক্ষের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজার পরিবারের সদস্যদের ধারণা, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। পারিবারিক সূত্র জানায়, রাজা কলতান নামে গানের ওই স্কুল চালাতেন। রোববার দুপুরের দিকে একটি কক্ষের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এদিকে শফিউল আলম রাজার মৃত্যুর খবরে পরিবার ও সহকর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইমরানুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিক রাজার হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছেন। তারপরও আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।

জানা গেছে, ১৬ মার্চ (শনিবার) রাতে এশিয়ান টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে সফিউল আলম রাজা পল্লবীতে তার নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’র একটি রুমে ফেরেন। আগে থেকেই তিনি রাতে সেখানে থাকতেন। পরে দুপুরের দিকে পরিচিতজনরা রুমের বাইরে থেকে তাকে ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছিল না। তখন ওই রুমের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সফিউল আলম রাজার মরদেহ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তার দাফন সম্পন্ন হবে। সফিউল আলম রাজা সর্বশেষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয় ডটকমের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে, এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন।

ভাওয়াইয়া গানের কিংবদন্তি রাজা

সফিউল আলম রাজাকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের শ্রোতা-দর্শকরা ‘ভাওয়াইয়া রাজা’ নামে ডাকতেন। ভাওয়াইয়া শিল্পীর পাশাপাশি একজন সাংবাদিক হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। ভাওয়াইয়া গানের এই শিল্পীর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায়। কৈশরে পিতা মরহুম নাজমুল হক ও মাতা মরহুমা শামসুন্নাহার বেগমের উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণায় তার গান শেখা শুরু। সংগীতে প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষাগ্রহণ করেননি। তবে ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী নুরুল ইসলাম জাহিদের কাছে সংগীতের তাত্ত্বিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন রাজা। সফিউল আলম রাজা বাংলাদেশ বেতারের ‘বিশেষ’ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘প্রথম’ শ্রেণীর শিল্পী ছিলেন। এছাড়াও তিনি দেশের সবকটি চ্যানেলে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে আসছিলেন। সংগীত পরিবেশন করেছেন বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চ এবং মিডিয়াতেও (এরমধ্যে কলকাতার তারা মিউজিক এবং কলকাতা টিভি উল্লেখযোগ্য)।

লোক সংগীতের অন্যতম ধারা ভাওয়াইয়া গানের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে শিল্পী রাজা ২০০৮ সালে রাজধানীতে ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও ২০১১ সালে রাজধানীতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভাওয়াইয়া স্কুল’। যে স্কুলে ভাওয়াইয়ার ওপর এক বছরের ফ্রি সার্টিফিকেট কোর্স করানো হয়। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি সংস্কৃতির সব শাখা নিয়ে রাজধানীর পল্লবীতে ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন এই শিল্পী। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘উত্তরের সুর’-এ চারটি মৌলিক ভাওয়াইয়া গান গেয়েছেন।

শিল্পী জীবনে স্বীকৃতিস্বরূপ সফিউল আলম রাজা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত বেঙ্গল বিকাশ প্রতিভা অন্বেষণে লোকসঙ্গীত বিভাগে (ভাওয়াইয়া নিয়ে) ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। রাজধানীতে এ পর্যন্ত রাজা’র ছয়টি একক সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দুটি, আঁড়িয়াল সেন্টারের উদ্যোগে একটি, আঁলিয়স ফ্রঁসেজের উদ্যোগে একটি, গুরুর চিকিৎসা সহায়তায় ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল-এর আয়োজনে একটি এবং ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে একটি একক সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে রাজার একটি মিক্সড অ্যালবাম এবং ভায়োলিন মিডিয়া থেকে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে একক ভাওয়াইয়া অ্যালবাম ‘কবর দেখিয়া যান’। সংগীত নিয়ে সফর করেছেন অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। তিনি সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে ‘বিচারক’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্পী সফিউল আলম রাজা পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন। ঢাকা রি?পোর্টার্স ইউ?নি?টির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য শফিউল আলম রাজা সংগঠনটির সাংস্কৃ?তিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক জনতা, দৈনিক অর্থনীতি, দৈনিক যুগান্তর এবং সর্বশেষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয় ডটকমের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। পেশাগত জীবনেও তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। সাংবাদিকতায় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুরস্কার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার, ডেমোক্রেসি ওয়াচ হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড, ইউনেস্কো ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। নিজের জন্মস্থান কুড়িগ্রামের চিলমারীর বন্দরে শান্তি নিকেতনের আদলে একটি ভাওয়াইয়া ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন সফিউল আলম রাজা।