মানবসভ্যতায় প্রভাব বিস্তারী ১০ বই

নিউজ ডেস্ক: বিজ্ঞানের চিরায়ত বা ক্ল্যাসিক বই। এ ধরনের বই ইচ্ছে করলেই লেখা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে সময়, পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট এবং পর্যাপ্ত তথ্যাবলি। তাই বিজ্ঞানের চিরায়ত বই স্বাভাবিকভাবেই অনেক কম। কিন্তু এসব বই কী দারুণভাবে সমাজসভ্যতাকে পাল্টে দিয়েছে, চিন্তা করলে অভিভূত হতে হয়! যেমন ধরুন ১৬৬৩ সালে ২০ বছর বয়সে স্টোয়ারব্রিজের মেলাতে গিয়েছিলেন আইজ্যাক নিউটন। গভীর আগ্রহে তিনি সেখান থেকে জ্যোতিষশাস্ত্রের (হাত দেখার শাস্ত্র) ওপর পড়ার জন্য একটি বই কেনেন। একটানা বইটি পড়ে যেতে শুরু করলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না বোঝার কোনো অসুবিধা হলো। তারপর এক জায়গায় ত্রিকোণমিতি না জানার কারণে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। ফলে তাঁকে ত্রিকোণমিতির ওপর একটি বই কিনতে হলো। কিন্তু নিউটন শিগগিরই নিজেকে আবিস্কার করলেন যে তিনি জ্যামিতির যুক্তিপ্রমাণ বুঝতে অক্ষম। অগত্যা খুঁজে বের করতে হলো ইউক্লিডের এলিমেন্টস অব জিওমেট্রি গ্রন্থটি এবং তা পড়া শুরু করলেন। এর দু’বছর পরেই প্লেগ মহামারীর সময় উলসথর্পে তিনি ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস আবিস্কার করেন, যা গাণিতিক নিয়মে প্রকৃতির বিষয় অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়। আমার চোখে ১০ গুরুত্বপূর্ণ চিরায়ত গ্রন্থের কথা তুলে ধরলাম-

১. ইলিয়াড ও অডিসি

হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড ও অডিসি। এটা কি সাহিত্যের, না বিজ্ঞানের ক্লাসিক, কোনোদিনই তা বলা সম্ভব হবে না। অথচ এই মহাকাব্যেও সময়কালকে গ্রিক বৈজ্ঞানিক যুগের সাহিত্যিক যুগমাত্র অথবা বিজ্ঞানের প্রস্তুতির যুগও বলা হয়ে থাকে। কারণ হোমারের ইলিয়াড, অডিসিকে কেন্দ্র (উপজীব্য) করে কবিরা তাদের গীতিকাব্য, চারণগাথায় মানবতার এই বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন- ‘মানুষ নিয়তির বশ নয়, সে নিজের ভাগ্য গড়ে নিতে পারে, দেব-দেবীরাও মানুষের মতো দোষে-গুণে অতি মানুষ মাত্র।’ এই সত্য উপলব্ধি মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে ধাবিত করল। কারণ জ্ঞানই ক্ষমতার উৎস, জ্ঞানই তাকে অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে। ইলিয়াড, অডিসির সেই অসহায়ত্বের যে মর্মবাণী চারণকবিদের মাধ্যমে ইজিয়ান সাগরের দ্বীপপুঞ্জে কেঁদে ফিরছিল তা আয়োনীয়দের কানেও পৌঁছেছিল।

২. ইউক্লিডের এলিমেন্টস

মহাকালের পথিকরা যে কাজ শুরু করেছিলেন, তারই একটা ধারাকে ইউক্লিড সম্পূর্ণ করেন ৭০০ বছর পরে ‘এলিমেন্টস’-এর মাধ্যমে। প্রায় সব গণিতের আকর গ্রন্থ হলেও এলিমেন্টস ইউক্লিডের জ্যামিতি গ্রন্থ হিসেবেই পরিচিত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন গণিতকে পদ্ধতিগত রূপ দিয়েছিলেন ইউক্লিড তার ১৩ খণ্ডে সম্পূর্ণ এ গ্রন্থে। ২২ শতাব্দী আগে এটি রচিত। ইউক্লিড জ্যামিতিকে এক বিশাল অবরোহী পদ্ধতিতে পরিণত করেছিলেন। মানুষের সূত্রবদ্ধ চিন্তার সেই শুরু। এই গ্রন্থ অবিরত উৎসাহ জুগিয়েছে প্রতিভাদের, উৎসাহ জোগাবে অনাদিকাল। এলিমেন্টস-এর সবচেয়ে আলোচিত ও উল্লেখযোগ্য সমান্তরাল স্বীকার্য মানব জাতিকে শত শত বছর বিভ্রান্তির জালে আটকে রেখেছে, আবার জ্ঞান ও যৌক্তিক উপলব্ধির নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে।

৩. দ্য রেভোলিউশানিবাস অরবিয়াম কোয়েলেসটিয়াম

জ্যোতির্বিজ্ঞান তথা বিশ্বচিন্তায় অসম্ভব আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থটির নাম হচ্ছে দ্য রেভোলিউশানিবাস অরবিয়াম কোয়েলেসটিয়াম। সংক্ষেপে রেভোলিউশানস। প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও টলেমির চিন্তাধারা থেকে মানব জাতি এ গ্রন্থের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। নিকোলাই কোপার্নিকাসে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৫৪৩ সালে। এ গ্রন্থের মাধ্যমে দেড় হাজার বছরের টলেমির ভূকেন্দ্রিক মতবাদের সমাধি রচিত হয়। ছয় খণ্ডে রচিত গ্রন্থটি তৃতীয় পোপকে উৎসর্গ করে কোপার্নিকাস বলেন, গণিতশাস্ত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে কেউ যেন এ গ্রন্থের সমালোচনা না করেন। তিনি আরও বলেন, পৃথিবী থেকে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ অনেক বেশি জটিল হওয়ার কারণ পৃথিবীর নিজের ঘূর্ণন। কিন্তু বাস্তবিকই সূর্য থেকে দেখলে অধিকতর সরল ও একটি সাধারণ গ্রহ। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে গ্রন্থটি তার হস্তগত হয়। ১৫৪৩ সালের ২২ মে ৭০ বছর বয়সে কোপার্নিকাস মারা যান। তিনি বলেছিলেন, সূর্যের চারদিকে পৃথিবী আবর্তন করায় ঋতু পরিবর্তন ঘটে। এই মতবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মানব জাতি বিশ্বের কেন্দ্রের মতো অনন্য অবস্থা থেকে সরে যায়।

৪. হারমোনিকস মান্ডি বা হারমোনি অব দ্য ওয়ার্ল্ড

উপবৃত্তাকার পথের ধারণা কেপলারই দিয়েছিলেন। তিনি প্রথম দুটি সূত্রে বলেছিলেন, সূর্যকে ঘিরে গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে। তাই কখনও ওরা ঘুরতে ঘুরতে সূর্যের নিকটবর্তী হয়, কখনও আবার দূরে সরে যায়। তৃতীয় সূত্রটি হলো হারমোনিকস সূত্র। এটি এমন একটি সূত্র, যা বিভিন্ন রকম গ্রহগতিকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে এবং সঠিকভাবে সৌরজগতের ঘড়ির নিয়ম মেনে চলা কর্মকাণ্ডকে সুবিন্যস্ত করে। কেপলারের হারমোনিকস মান্ডি যা হারমনি অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামে পরিচিত গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত আছে। তিনি অনুভব করেছিলেন, যে বিশ্বে মানুষের সঙ্গে মানুষের আচরণ মানবিক ও পবিত্র হয় না, সেখানে বৃত্তাকার পথের ধারণা বলবত রাখার যুক্তি অযৌক্তিক। তিনি দেখিয়েছিলেন, সদ্য উদ্ভাবিত গ্রহগতিবিদ্যা দিয়ে পৃথিবীর মানুষ একদিন গ্রহ-গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়াবে। সেদিন কত অর্থহীন মনে হবে সম্পদের কুক্ষিগতকরণ।

৫. প্রিন্সপিয়া ম্যাথমেটিকা

নিকোলাই কোপার্নিকাস, জোহানস কেপলার এবং গ্যালিলিও গ্যালিলির কাজকে সমন্ব্বয় ও একীভূত করেছিলেন আইজাক নিউটন। তিনি তারই বর্ণনা করেছিলেন ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিজ প্রিন্সপিয়া ম্যাথেমেটিকাতে। নিউটনের এ গ্রন্থটির তিনটি সংস্করণ বের হয়েছিল। প্রথমটি কেম্ব্রিজ, ট্রিনিটি কলেজ, ৮ মে, ১৬৮৬। দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়েছে লন্ডন ২৮ মার্চ, ১৭১৩, তৃতীয় সংস্করণ লন্ডন, ১২ জানুয়ারি ১৭২৫-২৬। তিনটিতেই নিউটনের নিজের লেখা ভূমিকা আছে। প্রতিটি সংস্করণ সংশোধন, পরিবর্ধন হয়েছে। বর্তমানে বইটির প্রারম্ভে নিউটনের তিনটি সংস্করণের ভূমিকা দেওয়া আছে।

৬. ইউক্লিড ফ্রিড অব এভরি ডিফেক্ট

সুইস পাদ্রি জিরোলামো সাখেরি (১৬৬৭-১৭৩৩)। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে তিনি সমান্তরাল সরল রেখা ছাড়াও জ্যামিতি গড়ে তুলতে সমর্থ হন। এ গ্রন্থের উপসংহারে এসে তিনি লেখেন, এখানে যৌক্তিক কোনো ত্রুটি নেই; যদিও এটা অসম্ভব, বাস্তবতার সঙ্গে যায় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১০০ বছরের মধ্যে এ গ্রন্থের খবর কেউ রাখেনি। তবে এই জ্যামিতিতে ত্রিভুজের তিন সমকোণের দুই সমকোণের সমান, ছোট ও বড় হয়; তা আমরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে জার্মানির কার্ল ফ্রেডারিক গস (১৮২০), রাশিয়ার নিকোলাই লোবাচেভস্কি (১৮২৬) ও হাঙ্গেরির জেনাস বোলাই (১৮৩২) প্রমুখের গবেষণাপত্র থেকে জ্যামিতিশাস্ত্রের এসব প্রকৃতি বুঝতে পারি।

৭. অরিজিন অব স্পিসিচ

১৮৫৯ সালের মার্চ মাসে পাণ্ডুলিপিটি লেখা শেষ হয়, আর প্রকাশিত হয় নভেম্বরে। একটি ঐতিহাসিক রূপরেখাসহ ১৪ অধ্যায়বিশিষ্ট অরিজিন অব স্পিসিচের মূল বক্তব্য হচ্ছে, প্রকৃতি বহুসন্তান প্রসবা, যা টিকে থাকবে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্ম হয় এবং পরিবেশ নির্বাচন করে ওই প্রকারগুলো যেগুলো টিকে থাকার জন্য, দৈবক্রমে, অপেক্ষাকৃত বেশি উপযোগী। মিউটেশনস- বংশগতিতে আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটায় ও বংশবিস্তার করে সত্য। তারা বিবর্তনের কাঁচামাল সরবরাহ করে। পরিবেশ নির্বাচন করে ওই অল্প কিছু পরিব্যক্তিকে, যারা টিকে থাকাকে উপযোগী করে। ফলস্বরূপ পর্যায়ক্রমিক ধীর রূপান্তরের মাধ্যমে জীবন এক কাঠামো থেকে অন্য কাঠামোতে যায়, নতুন প্রজাতির উৎপত্তি ঘটে।

৮. এনসিয়েন্ট সোসাইটি

ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনতত্ত্বে জীবজগতের বিবর্তনের পর স্বাভাবিকভাবেই এসে যায় মানব সমাজের অগ্রগতির বিষয়টি। হঠাৎ এটা এখানে আসেনি। এর রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস ও বিবর্তন। বর্বর অবস্থা থেকে সভ্যতায় যাত্রার বিষয়টি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন লুইস হেনরি মর্গান। এটা করতে গিয়ে লিখে ফেলেছেন ‘এনসিয়েন্ট সোসাইটি’ শিরোনামে একটি গবেষণা গ্রন্থ। ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত সমাজ বিবর্তন নিয়ে এই গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে পুরো সমাজবিজ্ঞানকে একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। গ্রন্থটি প্রমাণ করে- স্বাধীন চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ যে গভীর বৈজ্ঞানিক সত্যে নিয়ে যেতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এনসিয়েন্ট সোসাইটি।

৯. দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান

জ্যাকব ব্রনোওস্কির গ্রন্থ ঞযব অংপবহঃ ড়ভ গধহ একই সঙ্গে একটি টিভি সিরিজ। আবহমানকাল থেকে পৃথিবীর মানুষ সভ্যতার প্রয়োজনে, শিল্প-সংস্কৃতিতে, প্রাণের প্রকাশে বৈজ্ঞানিক চেতনা কীভাবে জড়িয়ে গেছে, সমগ্র প্রকৃতি জগৎ কীভাবে মৌলিক যুক্তিসহ বৈজ্ঞানিক প্রবাহধারায় নিমজ্জিত থেকে স্পন্দিত হচ্ছে; তা তুলে ধরাই ছিল এ গ্রন্থটির উদ্দেশ্য। বই ও টিভি সিরিজ দুটিতেই ১৩ অধ্যায় ও ১৩টি পর্ব আছে। এর চলচ্চিত্রায়ন হয়েছিল জুলাই ১৯৭১ ও ডিসেম্বর ১৯৭২-এর মধ্যে। প্রচারিত হয় ১৯৭৩ সালে এবং গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় ওই বছরই। দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান-এ প্রজাতি হিসেবে এবং নিজস্ব পরিবেশের কাঠামোয় মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশের পথরেখাকে দেখানো হয়েছে।

১০. কসমস

বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রথম মানুষ অনুভব করল, এত অর্জন আর সমৃদ্ধি সবকিছু জলাঞ্জলি হতে পারে মহাবিশ্বের বিকাশের সঙ্গে নিজেকে সংশ্নিষ্ট করতে ব্যর্থ এবং মানব সমাজে নিজেরা পরস্পরকে বুঝতে অসমর্থ হলে। এ অবস্থান থেকেই কার্ল সাগান তার অসাধারণ গ্রন্থ ‘কসমস’ লিখলেন। কসমসে তিনি বললেন, বিশ্বের শুধু বিকাশোন্মুখ সৌন্দর্য রয়েছে বা এটি মানুষের পক্ষে শুধু অনুধাবন করাই সম্ভব নয় বরং এটিও দেখিয়েছে যে অত্যন্ত বাস্তব এবং নিগূঢ়ার্থে আমরা মহাবিশ্বের একটি অংশ। আমরা জন্মেছি এটি থেকে; আমাদের নিয়তি এটির সঙ্গে জড়িত। মানবেতিহাসের সবচেয়ে মৌলিক ঘটনা এবং পেছনের তাৎপর্যহীন অতি সাধারণ ঘটনা; এ সবকিছুই এই মহাবিশ্ব এবং তার উৎপত্তির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট। অনেকেই এটিকে বিজ্ঞানের বই বলে অভিহিত করেন। কিন্তু আমার মনে হয়, এটি শুধু বিজ্ঞানের বই নয়; বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গতি না থাকলে সভ্যতায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।