নির্বাচন ব্যবস্থায় অশুভ শক্তির প্রভাব বাড়ছে: মেনন

নিউজ ডেস্ক:  দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় অশুভ শক্তির প্রভাবের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ দেশের ওপরে নিয়ন্ত্রণারোপ করে তাহলে রাজনৈতিক দল কেবল নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও অপ্রসাঙ্গিক হয়ে উঠবে। এটা যেমন আমাদের জন্য প্রযোজ্য, সরকারি দলের জন্যও তা প্রযোজ্য। নির্বাচনকে তাই যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

রোববার সংসদের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে মেনন এ কথা বলেন। এর আগে বিকেলে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

দেশের উপজেলাগুলো চলমান নির্বাচন প্রসঙ্গে সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকে। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং দলীয় নেতারা যখন ভোটারদের বলেন ‘ভোট তো দেখেছো? ভোট দিতে যেতে হবে না।’ তখন সেই ভোট সম্পর্কে কী মনোভাব সৃষ্টি হয়। একটি সামগ্রিক অনাস্থার জন্ম হয়। নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধাদান, মনোনয়নপত্র ছিড়ে ফেলা, উপরমহলের ক্লিয়ারেন্স আছে কী না-সেই নিয়ে প্রার্থীদের পুলিশের প্রশ্ন এবং টাকা ছড়ানোর উদ্বেগজনক খবর আসছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় যেতে নিষেধ করেছেন। বলেছেন কমিশনের আইন মেনে চলতে। কিন্তু সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে নিশ্চয়তা বিধান না করা হয় তাহলে মানুষের মাঝে যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়েছে তা রয়ে যাবে। এই নেতিবাচিক দৃষ্টিভঙ্গী দূর করতে উপজেলা নির্বাচন অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। প্রশাসনের সকল হস্তক্ষেপ মুক্ত করতে হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন উভয়কেই এই নিশ্চিয়তা বিধান করতে হবে।

আওয়ামী লীগের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলেও সরকারের শরিক না হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের শরিকদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলেছেন। কিন্তু যদি গণতান্ত্রিক স্পেস না থাকে তাহলে কেউ সংগঠন নিয়ে, আন্দোলন নিয়ে, ভোট নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না। সেই স্পেস তৈরি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন ও জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের আন্দোলন করে সফলতা অর্জন করেছিল। তা যেন এভাবে হারিয়ে না যায়। এব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

তিনি বলেন, চুরিহাট্টার অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আমরা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে একে অন্যের প্রতি দোষারোপের অবসান হওয়া দরকার। এ ধরনের আগুনের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হওয়া দরকার।

রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশের উন্নতি হচ্ছে তবে এই উন্নয়নের সুফল জনগণ পাচ্ছে কী না তা দেখার জন্য গবেষণার দরকার নেই। খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। উন্নয়নের অসম বন্টন হচ্ছে। বাংলাদেশে সল্ফপ্রতি অতি ধনীর সংখ্যা চীন থেকেও বেশি বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়ছে তবে, এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রতি বছর আট লাখ মানুষ বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।

আর্থিক খাতের সমস্যার কথা তুলে ধরে মেনন খান বলেন, দেশের অর্থনীতির ওপর লুটেরাদের আধিপাত্য আরও দৃঢ়ভাবে চেপে ধরেছে। এর পরিণতি হচ্ছে বিনিয়োগ না করে অর্থ বিদেশে পাচার করা, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি, ব্যাংকিংখাতে নৈরাজ্য, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারী ইত্যাদি। এসব বিষয় প্রতিবিধানে বিভিন্ন আইন হলেও তা কার্যকর হয়নি। বরং দেখা গেছে, ব্যাংকিং সেক্টরে পারিবারিক মালিকানাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়াই ব্যাংক খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। একই ব্যক্তি এখন ৬/৭ ব্যাংকের মুল শেয়ার হোল্ডার। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পরিবর্তে এই সব মালিকেরা নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে যান। দেশে একটি নতুন শ্রেণি গড়ে উঠেছে যারা সেকেন্ড হোম করছেন কানাডায়, থাইল্যান্ডে। আর নীচ তলার মানুষগুলা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের দুর্নীতিকে আমলে নেয় কিন্তু বেসিক ব্যাংকের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। বেসিক ব্যাংকের সেই সাবেক চেয়ারম্যান দুদকের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

মেনন আরও বলেন, নদী দূষণ, শব্দ দূষণ, বায়ু দুষণ এগুলো আমরা ঠেকাতে পারছি না। বনাঞ্চল ধ্বংস করে আমরা শিল্প স্থাপন করছি। আমরা সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধীতা করেছিলাম কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি। এখন ওই স্থানকে কেন্দ্র করে পরিবেশ দুষষণকারী নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠছে।

সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, বহুদিন পরে আমরা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করেছিলাম। সেই শিক্ষানীতি ৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা এখন শতভাগ পাস, জিপিএ ৫ এর ছড়াছড়ি, এমবিএ-বিবিএ কে আমরা শিক্ষার সুফল করে গর্বভরে তুলে ধরি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক তার প্রতিবেদনে বলেছে ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা জীবনের ১১ বছরের ৪ বছর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা বাংলাও লিখতে পড়তে পারে না। অঙ্কও তারা করতে পারে না।

তিনি বলেন, আমাদের পাঠ্যক্রমগুলোকে ধর্মীয়করণের প্রচেষ্টা, তেঁতুল হুজুরের আব্দারে এটা করা হয়েছে।

এদিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের গ্রেফতারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই আইন পাসের সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদে ওয়াদা করেছিলেন এই আইনে কোন সাংবাদিক গ্রেফতার হলে তিনি কোন ফি না নিয়েই আইনজীবী হিসেবে সাংবাদিকের পক্ষে আদালতে দাড়াবেন। এই মুহুর্তে তিনজন সাংবাদিক জেলে আছেন। তাদের পক্ষে আইনমন্ত্রী দাড়িয়েছেন কী-না সেটা জানতে চান তিনি।