সাজঘরে অন্যরূপ

ফারজানা সিদ্দিকা:   দ্বিতীয় মাসের বেতন নেওয়ার সময়ই একবার ভেবেছিল রেশমা ম্যানেজারকে বলে দেবে কথাটা। বলা হয়নি। মনে হয়েছিল, ম্যানেজারকে বলবার আগে হাবিবকে জানানো দরকার। কিন্তু গত এক মাসে হাবিবকেও সে কথাটা বলতে পারেনি। কী বলবে, কীভাবে বলবে যে সে চাকরিটা আর করতে চায় না। হাবিব প্রথমেই জিজ্ঞেস করবে, কেন ছাড়তে চাও? কী সমস্যা? শুধু হাবিব কেন, রেশমার মা-বাবা, ভাইবোন, শাশুড়ি-ননদ সবাই-ই তো জিজ্ঞেস করবে কেন চাকরিটা ছাড়তে চায় সে? সমস্যাটা কী? এই প্রশ্নের মানে এই সমস্যার যুৎসই কোনো উত্তর তো রেশমার কাছে নেই। বড়লোকের মেয়ে বা বউ তো সে নয় যে ইচ্ছে হলো আর অমনি চাকরি করতে ভালো লাগছে না বলে উদাসী ভাব নেবে। সারাদিনেও এখানে কোনো পুরুষের দেখা মেলে না, এমন নিরাপদ চাকরি কই পাবে আর? অবশ্য চাকরিটা সে করে টাকার জন্যেই।

সংসারে টাকার দরকার আছে। বেসরকারি বীমা কোম্পানির জুনিয়র অফিসার তার স্বামী। সাকুল্যে বেতন পায় একুশ হাজার টাকা। একরুমের বাসা ভাড়া, গ্যাস-কারেন্ট-পানি সব নিয়ে প্রায় সাত হাজার, বাড়িতে পাঠাতে হয় পাঁচ হাজার তারপর যা থাকে তা দিয়ে বাজারঘাট, যাতায়াত, সামাজিকতা, কাপড়চোপড়, অসুখ-বিসুখ আরও কত কী। বাড়িতে যে টাকা পাঠানো হয় তাতে অসন্তুষ্ট শাশুড়ি। তারই বা দোষ কী, রেশমার নিজের মা হলেও রাগ করত। অসুস্থ শ্বশুরের ওষুধপত্র, দুই দেবরের লেখাপড়ার খরচ, সংসারের খরচাপাতি তাতে এই পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিইবা হয়! তাও ভালো জমি থেকে ধান আসে, বছরের চালের খরচটা লাগে না। হাবিব আর রেশমা এসব বোঝে। হয়তো রেশমা শহরে স্বামীর কাছে চলে না এসে বাড়িতেই থেকে গেলে আরেকটু খরচ বাঁচানো যেত। বাসা ভাড়া করে না থেকে বিয়ের আগে হাবিব যেমন মেসে থাকত, তেমনই থাকার ব্যবস্থা করত। কিন্তু মেসের রান্না খেয়েই তো দুই দুইবার হাবিবের মারাত্মক জন্ডিস হয়েছিল। অফিস কামাই করতে গিয়ে চাকরিটাই তখন যায় যায় অবস্থা।

তারপরও তো বিয়ের পর প্রায় এক বছর রেশমা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতেই ছিল। নিজে থেকে একবারও সে হাবিবকে শহরে তার নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেনি। হাবিবই তাকে নিয়ে এসেছে নিজের কাছে। তারপর এক রুমের এই সংসারে রেশমা-হাবিবের প্রতি রাতের প্রেমময় পর্ব শেষে সূর্য উঠেছে, অফিসে বেরিয়েছে হাবিব সারাদিনের জন্যে আর একলা ঘরে রেশমা বসেছে হিসাবের যোগ-বিয়োগ করতে। কিছুতেই খরচ কমানোর উপায় না পেয়ে অবশেষে সে নিজেই তো হাবিবকে বলেছে, আমার জন্যে একটা চাকরির ব্যবস্থা করা যায় না? লেখাপড়ায় একদম খারাপ ছাত্রী ছিল না সে। এসএসসিতে ৩.৩ আর এইচএসসিতে ২.৮ নিয়ে একবারেই পাস করেছিল। ডিগ্রিতে ভর্তিও হয়েছিল। তারপরই তো হাবিবের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব এলো। ডিগ্রি পড়া আর হলো না। তবে কলেজের ভর্তি নাকি এখনও বাতিল হয়নি। ডিগ্রিতে তো তেমন কোনো ক্লাস করা লাগে না। সুযোগ পেলে পরীক্ষাটা দিয়ে দেবে সে। কিন্তু আপাতত এইটুকু শিক্ষার দৌড় নিয়ে এই চাকরিটাই জুটেছিল তার। হাবিবের অফিসেরই পরিচিত একজন খোঁজ দিয়েছিল চাকরিটার।

শ্বশুরবাড়ি-বাপের বাড়ির সবাই খুশি হয়েছিল রেশমার চাকরি পাওয়ার খবরে। সংসারের টানাটানির খবর তো সবাইই বোঝে। রেশমার বাবার বাড়ির অবস্থাও তো ভালো নয়। ভালো হলে রেশমা আরও পড়তে পারত, অন্তত বিএ পাস তো করত। পাঁচ বোন-দুই ভাইয়ের সংসারে রেশমা মেজ। কেবল বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বাকিরা সবাই লেখাপড়া করছে। রেশমা জানে, তার কৃষক আব্বা সংসার চালাতে গিয়ে কীরকম হিমশিম খায়! সে তুলনায় হাবিবদের সংসারটা ছোট। সবার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর হাবিবের ছোট দুই ভাইও লেখাপড়া করছে। বছর চারেক আগে শ্বশুরের স্ট্রোক না হলে সংসারে তেমন সমস্যা ছিল না। রেশমা শুনেছে, সুস্থ থাকা অবস্থায় খুব নাকি কর্মঠ ছিলেন শ্বশুর।

রেশমার বেতন পাঁচ হাজার টাকা মাত্র। আসলে মাত্র নয়, রেশমার জন্যে এটা অনেক টাকা। কিন্তু বেতনটা সই করে নেওয়ার সময় মাত্র কথাটা লেখা থাকে। তাই কেউ তার বেতন জিজ্ঞেস করলে মাত্র দিয়েই বলে সে। হাবিব তো প্রথম দিন খুব হেসেছিল এই মাত্র কথা নিয়ে। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে হাবিবকে সে একটা শার্ট কিনে দিয়েছিল। একা একা দোকানে গিয়ে নিজেই কিনেছে। পছন্দ হয়েছিল হাবিবের। আব্বাকে আর শাশুড়িকে এক হাজার করে বিকাশ করেছিল। বাকি টাকা তুলে দিয়েছিল হাবিবের হাতে। হাবিব সে টাকা পুনরায় রেশমার হাতেই গুঁজে দিয়েছে। বলেছে, নিজের কাছেই রাখো। তোমার নামে একটা ডিপিএস খুলে দেব। নাকি বীমা করবা? আমার স্পেশাল ক্লায়েন্ট? বীমার কথায় খুব হেসেছিল ওরা দু’জন।

বাসা থেকে লাইনের সিএনজিতে পাঁচ টাকা ভাড়া লাগে এখানে আসতে। চাইলে হেঁটেও আসা যায়। কিন্তু সকাল বেলা রেশমার তাড়া থাকে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ভাত-তরকারি রাঁধে। হাবিব আর সে দু’জনেই ভাত খেয়ে বের হয়। দুপুরে খাবার জন্যে বক্সে করে নিয়েও নেয়। বাইরের খাবার খেয়েই তো যত রোগ জোটে! তাছাড়া খরচও বেশি। ফলে সিএনজিতেই আসে রেশমা। শহরের নামকরা বিউটি পার্লারের চতুর্থ শাখা এটা। রেশমা ক্যাশে বসে। ম্যানেজার একজন আছেন তবে তাকে একসঙ্গে দুটো শাখার তদারকি করতে হয় বলে অনেকটা দৌড়ের ওপরই থাকতে হয়। ঠিক পৌনে ১০টায় ঢুকতে হয় রেশমাকে। ততক্ষণে ঝাড়পোছের বুয়া চলে আসে। বুয়া ঝাড় দেওয়ার সময় তার পিছে পিছে থাকতে হয়। ফার্নিচারের কোণগুলো ঠিকমতো ঝাড় দিতে চায় না। আরও একটা ব্যাপার আছে, চান্স পেলেই এটা সেটা চুরি করে ফেলে। বিশেষ করে চিরুনি আর ক্লিপ। চাকরির শুরুর দিনই ম্যানেজার তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন এসব দিকে কড়া নজর রাখতে।

আর নজর না দিয়েও তো উপায় নেই। হিসেব তো তাকেই দিতে হবে। ঝাড়ার কাজ শেষ হলে রেশমা ফেসিয়ালের রুমে ঢুকে কাপড় পাল্টায়। বোরকা-হিজাব খুলে পিংক শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে। নিজের কাপড়গুলো ব্যাগে ভরে পেছনের স্টোরে রেখে আসে। চুলটাকে উঁচু করে বাঁধে। চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা পিংক লিপস্টিক দেয়। উজ্জ্বল আলোর সামনে আয়নায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিনই তার হাসি পায়। মনে হয়, একদিন এই ড্রেস পরে যদি শ্বশুরবাড়ি গিয়ে হাজির হয় সে! কিংবা বাপের বাড়ি! কী হবে তখন? তামাশাটা মনে করে মনে মনেই মজা পায়। তবে চাকরির দ্বিতীয় দিনই সে গোপনে সেলফি তুলেছিল। বাসায় গিয়ে হাবিবকে দেখানোর পর দু’জনে মিলে কী হাসাটাই না হেসেছে! হাবিব বলেছে, একদিন এই ড্রেসের ওপরই বোরকা পরে বাসায় যেতে। কিন্তু বাসায় ড্রেস নেওয়ার পারমিশন নাই। দুই সেট ড্রেস। একটা ময়লা হলে ম্যানেজারই লন্ড্রিতে পাঠিয়ে দেন। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্যে এ পার্লারের নাকি সুনাম আছে।

শুরুর দিকে এসির ঠাণ্ডায় খাপ খাওয়াতে একটু ঝামেলাই হয়েছিল রেশমার। সকাল পৌনে ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একটানা এসির মধ্যে থাকতে গিয়ে মাথা ধরে যেত। এখন অবশ্য ঠিক হয়ে গেছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই কয়েকবার রঙ চা খেয়ে নেয় সে।

মোটামুটি সকাল থেকেই কাস্টমার আসতে শুরু করে। কাজের ধরন বুঝে রিসিট কেটে দেয় রেশমা। কাউন্টার থেকে কাস্টমাররা দ্রুত ঢুকে পড়ে ভেতরের ঘরগুলোয়। রিসিট কাটতে কাটতেই কাস্টমারের সঙ্গে যা টুকটাক কথা হয়। নতুন কোনো অফার থাকলে বলে। বিশেষ করে কি কি কাজ করালে ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে সেসব কাজের ফিরিস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে।। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই ভেতরের ঘরে ঢোকার জন্যে কাস্টমারের তাড়া থাকে। রেশমা শুনেছে, এই পার্লারের ওয়েবপেজে নাকি সব কিছুই দেওয়া থাকে। আর এই পার্লারের বেশিরভাগ কাস্টমারই নাকি চাকরিজীবী। এরা সব খোঁজখবর নিয়েই আসে। ফলে বেশি কথা বলার সুযোগ সে পায় না। কেবল বিয়ের পার্টির দিন ভিড় বেশি থাকলে কোনো কোনো কাস্টমারের সঙ্গে দু-একটা কথা বলার সুযোগ হয়। সেসব বাক্যও ফিক্সড :বউ কী হয় আপনার? এই শাড়িটা পরবেন? খুব সুন্দর শাড়ি!

ছয়জন কর্মী এখানে কাজ করে। এদের মধ্যে তিনজন সিনিয়র আর বাকি তিনজন প্রায় নতুন। সিনিয়র তিনজনই পুরনো শাখা থেকে এসেছে। অনেকদিন ধরেই সিনিয়র তিনজন এই নামকরা পার্লারে কাজ করে। নতুন তিনজনকে এরাই হাতে ধরে ধরে কাজ শেখায়। তবে এরা নাকি জন্মের পর থেকেই এসব কাজ টুকটাক জানে, শিখে ফেলে। ছয়জনই একই গ্রামের। ছয়জনই নাকি জ্ঞাতি সম্পর্কের আত্মীয়ও। আসলে নতুন তিনজনকে এই পুরনো তিনজনই নিয়ে এসেছে। এমনই নাকি নিয়ম। চেনা-পরিচিত না হলে এসব জায়গায় বিশ্বস্ততা থাকে না।

ছয়জনই গারো। ছয়জনই কাজের সময় বা কাস্টমার না থাকলে নিজেদের ভাষাতেই কথা বলে। অনর্গল। কথা বলে আর হাসে! কী নিয়ে এত হাসে? কাকে নিয়ে হাসে? এইসব হাসাহাসি আর কথা বেশি বলার জন্যে নাকি কাস্টমাররা দু-একবার কমপ্লেনও করেছে। বিশেষ করে ফেসিয়ালের কাস্টমাররা রিলাক্স মুডে থাকতে চায়। এত কথা বললে রিলাক্স থাকা যায়? কথা নিয়ে কমপ্লেনের কারণে শাস্তি হিসেবে বেতনও নাকি কেটে নেওয়া হয়েছে কারও কারও দু-একবার। বেতন কাটা যাওয়ার ভয়ে কয়েকদিন কথা কম হয় ভেতরে। তারপর আবার শুরু হয়ে যায় কথা। এত কী কথা এদের? অথচ, রেশমার সঙ্গে কথা বলার সময় মুখ দিয়ে মনে হয় শব্দই বের হয় না! আসলে ভেতরের ঘর থেকে খুব একটা বাইরের ঘরে আসেই না এরা।

কেবল কোনো প্রডাক্ট শেষ হয়ে গেলে দ্রুত এসে বলে যায়, দিদি, এটা শেষ। ম্যানেজারকে ফোন করে বলে দেন। বলেই হাওয়া! বাইরের ঘরে একা একা দমবন্ধ হয়ে আসে রেশমার। কাস্টমারদের সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা বারণ। ফোন করে যে হাবিব বা বাড়িতে বোনদের সঙ্গে কথা বলবে সে উপায় নেই। সিসি ক্যামেরা লাগানো।

প্রতিদিন ম্যানেজার ফুটেজ চেক করেন। ফোনে গল্প করতে দেখলে ভয়ানক রেগে যাবেন। কিন্তু এখানে চাকরি শুরুর এক মাস পর থেকেই কথা বলার নেশায় পেয়ে বসেছে রেশমার।

সারাদিন মন খুলে কথা বলতে পারে না বলেই তো চাকরিটা ছাড়তে চায় সে … অথচ হাবিবকে এ কথাটা বলবার মতো বাক্য গত দু’মাস ধরে কিছুতেই গুছিয়ে উঠতে পারছে না!