বিমান ছিনতাই-এর চেষ্টা ব্যর্থ, বের হবে কখনো আসল রহস্য !

মোহা: খোরশেদ আলমঃ ২৪ ফেব্রুয়ারি ময়ুরপঙ্খী উড়োজাহাজ(বিজি-১৪৭ ফ্লাইট) ৫টা ৫মিনিটে ছেড়ে চট্টগ্রাম হয়ে দোবাই যাওয়ার পথে ২৫ বছর বয়সী মাহাদী ওরফে পলাশ নামে এক তরুণ বিমান ছিনতাই করার চেষ্টা করে। দুই ঘন্টা টান টান উত্তেজনায় পাইলটের সাহসী বুদ্ধিমত্তায় উড়োজাহাজের ১৫০ জন যাত্রী, পাইলট ও ক্রুসহ সকলে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন।
কথিত বিমান ছিনতাইকারীকে পেশাদার জঙ্গি হিসেবে ছবিতে মনে না হলেও তার হাতে একটি খেলনা পিস্তল দিয়ে প্রায় দুই’শ জন মানুষকে দুই ঘন্টার পর জিম্মি করে রাখাটা সাংঘাতিক ব্যাপার। মাত্র ৮ মিনিটে জিম্মিকারীকে হত্যা করে বাহবা নিতে পারলেও আসল রহস্য উদঘাটন করা কি সম্ভব হবে? একজন জিম্মিকে জীবিত অবস্থা পাকড়াও করা আর হত্যা করে ধৃত করা পার্থক্য অনেক। আমাদের দেশে যে কোন সন্ত্রাসীকে পাকড়াও করতে আক্রান্ত না হলে গুলি ছোড়েননা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গন্য মাধ্যমে এসব খবর হরদম দেখতে পাই। আসামী ধরতে গেলে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণে সে মারা যায়। কিন্তু ময়ুরপঙ্খী উড়োজাহাজে যা ঘটে তা অন্যসবের চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আবার দেরীতে হলেও একদিন পর র‌্যাবের বর্ননা বলা হয়, প্লেন ছিনতাই চেষ্টায় নিহত সন্ত্রাসী র‌্যাবের অপরাধী ডাটাবেজের অন্তর্ভূক্ত। তাহলে ইমিগ্রেশন ভেদ করে এরকম একজন অপরাধী ব্যক্তি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে অস্ত্রসহ প্রবেশ ও প্লেনে উঠে কিভাবে? 
চট্টগ্রামে সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমানের ভাষ্য মতে, বিমানের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী, ১৪ জন ক্রু ও ২ জন পাইলট বেরিয়ে যাবার পর বিমানের ভেতরে অভিযান চালানোর সময় ঐ ব্যক্তিকে নিবৃত্ত করার চ্ষ্টো করা হয়। ঐ ব্যক্তি আত্বসমর্পনের অস্বীকৃতি জানালে গুলি চালানো পর ছিনতাইকারীর মৃত্যু হয়। তিনি আরও জানান, লে. কর্ণেল ইমরুলের নেতৃত্বে সেনা কমান্ডো দল মাত্র ৮ মিনিটে অভিযান শেষ করে। তিনি জানান, এই কমান্ডো দলটিই ঢাকায় হলি আর্টিজান সন্ত্রাসী হামলা মোকাবেলায় অভিযান পরিচালনা করেছিল। জে. রহমান জানান, নিহত যাত্রীটি তার নাম মাহাদী বলেছিল এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চেয়েছিল। উল্লেখ্য, নিহত ব্যক্তির সাথে তার স্ত্রীর মাঝে মনমালিন্য ছিল বলে একাধিক সূত্রে জানতে পারা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকটিকে বাঁচিয়ে রেখে অপারেশনটা শেষ করা যেত এবং রহস্যের বেড়াজাল ভেদ করা সহজ হতো। লোকটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চেয়েছেন, সে তো বলেনি আমি বিমানটিকে অন্য একটি দেশে নিয়ে যাব? তাহলে নিরস্ত্র ছিনতাইকারীকে ৮ মিনিটে হত্যা করে অপারেশন শেষ করতে হবে। তার কাছে খেলনা এক পিস্তল ছাড়া অন্য কিছু ছিলনা, তাই তার প্রতিরোধ করার ন্যুনতম কোন শক্তি না থাকলেও উপর্যপুরি গুলি করে যখন হত্যা করে মিশন শেষ করা হয়, তখনই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। সদ্য নির্বাচনের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিচালনায় যখন দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন একটার পর একটা দুর্ঘটনা মানুষের মাঝে নানান প্রশ্নের জন্ম দেয় অর্থাৎ এক সপ্তাহ আগে চকবাজারের ট্রাজেডি, বিমান ছিনতাই ঘটনার দিন বা পরদিন অর্থাৎ ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর ট্রাজেডি দিবস। উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিমান ছিনতাই নাটকের দিনে চিটেগাং বিমানবন্দর হয়ে ঢাকায় আসেন। তাই ঘটনাটি একেবারে ঠুনকো নয়। এভাবে দেশে একটার পর একটা ঘটনা-দূর্ঘটনা সংঘটিত হলে দেশে-বিদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে যে নিরাপত্তা বলয় রয়েছে তাতে অস্ত্র নিয়ে বিমানে উঠা অসম্ভব। তিনি আরো আশংকা করছেন, এরকম ঘটনা বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে খারাপ বার্তা দেবে। তিনি আরো বলেন, এসব ঘটনা ঘটার ফলে বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদের বিমানের ফ্লাইট অবতরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের দেশের সেনবাহিনীর বিচক্ষণতা ও দক্ষতা দেশে-বিদেশে প্রশংসনীয়। তাদের যে কোন কাজ বা অপারেশন অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ন্যায় গদবাধা মিডিয়াতে অন্য পক্ষ উল্লেখ না করে, তাদের নিজস্ব বিষয়গুলি তাদের প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ পেলে জনমনে বিতর্ক সৃষ্টি হবেনা। আমরা ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে বিতর্কমুক্ত ও স্বচ্ছতা আশা করবো। ঘটনার পর গতানুগতিক তদন্ত হবে কিন্তু কোন তদন্তে আজ অবধি জনগন আসল ঘটনা জানতে পারেনি, এবারো পারবে কিনা সময় কথা বলবে। তবে খামখেয়ালীপনায় বড় ধরণের নাশকতা সৃষ্টিকারী, অতিমাত্রায় মুনাফাখোরী ব্যবসায়ীদের উচ্চা আকাঙ্খা চরিতার্থ করতে এবং সরকারকে বিব্রত বা ব্যস্ত রাখতে পুরান ঢাকার বিগত নিমতলি ট্রাজেডি, চকবাজারের সদ্য অগ্নিকান্ড ট্রাজেডি এবং বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টার ট্রাজেডি যেন পূনরাবৃত্তি না ঘটে এসব বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে এবং এসব বিষয়ে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। 
বিমান ছিনতাইকারী নিহত, তাই তার কাছে তথ্য পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের দাবি, সত্য ঘটনা উন্মোচিত হোক কারন এর সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত এবং আমাদের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জড়িত। আমাদের আরো দাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলি যেন আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল হকের মতে, একটি আন্তর্জাতিক বিমানব্দর থেকে কোনো যাত্রী বিমানে অস্ত্র নিয়ে উঠে যাবেন, এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। আর দুবাইগামী ফ্লাইটের সেই যাত্রী ঢাকায় হযরত শাহ্জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই উড়োজাহাজে উঠেছিলেন। তাই তার কাছে যদি অস্ত্র থেকে থাকে, সেটা শাহজাহাল (রহ.) বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শিথিলতার কারনেই হয়েছে। এত বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বিমানবন্দর পরিচালনা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে প্রশ্ন উঠবে। এব্যাপারে এয়ার কমোডর (অব.) ইসফাক এলাহী বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। এমনকি বাংলাদেশকে কালো তালিকাভ‚ক্ত করার ঘটনাও আছে। এমন সময় চট্রগ্রামের ঘটনা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেক দফা ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো রকমের ঝুঁকি না নিয়ে একেবারে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। বার্তা সম্পাদক, দেশের ডাক