বিমানের নিরাপত্তায় ‘ওয়েক আপ কল’

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী: রোববার সন্ধ্যার পর বিমান ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টা ঘিরে হঠাৎ হতচকিত হয়ে উঠেছিল সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ‘ব্রেকিং নিউজ’ দিয়ে শুরু করে গতকাল মধ্যরাত পর্যন্ত নাগরিক পরিসরগুলো এই ইস্যুতে ছিল সরগরম। আমি নিজেও এ বিষয়ে রোববার রাতে টক শোতে অংশ নিয়েছি, পত্রিকাগুলোকে মতামত দিয়েছি। সোমবার সকালে সমকালের জন্য এই লেখা লিখছি।

রোববার চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই ‘ইভিনিং ড্রামা’ বাংলাদেশের জন্য নানা অর্থেই নতুন। এর আগে কখনও রাষ্ট্রীয় ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার বাংলাদেশ বিমান এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। ১৯৭৭ সালে এ ধরনের আরেকটি ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর। কিন্তু সেটা আমাদের দেশে ঘটনাচক্রে এসেছিল। জাপানের উগ্রবাদী সংগঠন রেড আর্মির একটি দল জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে ঢাকার পুরনো বিমানবন্দরে অবতরণ করায়। দেড় শতাধিক যাত্রীবাহী ওই বিমান ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ভারতের মুম্বাই হয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক যাচ্ছিল। মুম্বাই থেকে উড়ানের পরপরই ছিনতাই করা হয় এবং সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকার আকাশসীমায় নিয়ে আসে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও জোর করে অবতরণ করায়। পরে রেড আর্মির দাবি অনুযায়ী তাদের ৯ সদস্যকে জাপানের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়া এবং ২০ লাখ ডলারের বিনিময়ে এক সপ্তাহের জিম্মিদশার অবসান ঘটে। বিমানটি পরে ঢাকা থেকে উড়িয়ে কুয়েত ও সিরিয়া হয়ে আলজেরিয়ায় গিয়ে শেষ জিম্মিদেরও ছেড়ে দেয়। ঢাকায় এসে এ ব্যাপারে দর কষাকষি করেছিলেন যে জাপানি মন্ত্রী, সেই হাজেমি ইশিই তখনকার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি এর বাংলা সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে।

জাপানি বিমান ছিনতাই করে ঢাকায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে জঙ্গি রেড আর্মির সদস্যরা ছিল মারমুখী। তাদের গুলিতে দু’জন সেনাসদস্যও নিহত হন। আমাদের স্বস্তি যে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের অঘটনে যাত্রী, ক্রু বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ক্ষতি হয়নি। বিশেষত বিমান কর্তৃপক্ষ এবং বিমানের পাইলট ও ক্রুরা প্রথমে যেভাবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি হ্যান্ডেল করেছেন, তাতে তাদের সবাই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতাও আরেকবার প্রমাণ হয়েছে। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে, মাত্র কয়েক মিনিটে এর অবসান ঘটাতে পেরেছে।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের এই অঘটনে শেষ পর্যন্ত ছিনতাই চেষ্টাকারী বা হুমকিদাতাকে জীবিত আটক করা যায়নি। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে। সব দিক থেকে ভালো হতো ওই তরুণকে জীবিত ধরতে পারলে। আমার মনে হয়, আরেকটু কৌশলী হলে সেটা একেবারে অসম্ভব ছিল না। কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের আগেই সব যাত্রী, পাইলট ও ক্রুরা বিমান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু একজন ক্রু তার সঙ্গে ‘জিম্মি’ হিসেবে ছিলেন। কমবেশি দুই ঘণ্টা ধরে ছিনতাইকারী তরুণের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে; সেটা ছিল আরেকটি ইতিবাচক পরিস্থিতি। আমার ধারণা, তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বা কথা বলিয়ে দিয়ে তাকে নিরস্ত্র করা বা জীবিত আটক করা যেত। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত যে বড় অঘটন এড়ানো গেছে, সেটাই সবচেয়ে স্বস্তির।

সোমবার বিডিনিউজসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষকে উদ্ব্দ্রীতি করে জানাচ্ছে, ওই তরুণের হাতে পিস্তলটি ‘খেলনা’ ছিল। দুঃখজনক ব্যাপার, কমান্ডো অভিযানে ছিনতাই চেষ্টাকারী তরুণ নিহত হওয়ার আগেই পিস্তলটি শনাক্তকরা গেল না।

বস্তুত তরুণটিকে জীবিত ধরা গেলে এ ঘটনার নেপথ্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হতো। ইতিমধ্যে তার পরিচয় পাওয়া গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্ব্দ্রীতি করে সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখেছি, তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। তার পিতা মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী ছিলেন। ওই তরুণ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। পরে এফডিসিতে কাজ করত। একজন চিত্রনায়িকার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা, এমনকি বিয়ের দাবিও করা হয়েছে পরিবার থেকে। তার ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ সম্পর্কে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে সে ‘অনেক বদলে’ গিয়েছিল। মালয়েশিয়া গিয়েছিল। বাড়িতে গিয়ে একা থাকত, কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলত না। ধর্মকর্মে অস্বাভাবিক মনোযোগী হয়েছিল। আমরা জানি, জঙ্গিবাদে জড়িত তরুণদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। এই তরুণও কি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল? এ ব্যাপারটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদের সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। তরুণকে জীবিত ধরা গেলে কাজটি অনেক সহজ হতো নিঃসন্দেহে।

সার্বিকভাবে দেখলে, এই অঘটন বাংলাদেশের বিমান ব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ওয়েক আপ কল’। সত্যিকার হোক বা খেলনা পিস্তল হোক- এটা নিয়ে বিমানে প্রবেশ করতে পারল কীভাবে? বিমানে ওঠার আগে সব লাগেজ ও দেহ তল্লাশি করা হয়। যদি খেলনা পিস্তলও হয়, তাহলেও স্ক্যানার মেশিনে দেখা যাবে। এমনকি কোনো বাচ্চাও তার খেলনা পিস্তল নিয়ে বিমানে উঠতে পারবে না। আমার জানা মতে, গত কয়েক বছরে বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশন বিভাগের চেয়ারম্যান সংবাদমাধ্যমে বলছিলেন, এখনকার তল্লাশি ব্যবস্থায় কেউ নেইল কাটার নিয়েও বিমানে উঠতে পারবে না। তাহলে ওই তরুণ খেলনা বা আসল পিস্তল নিয়ে উঠল কীভাবে?

এখন আমরা জানতে পারছি, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী ওই বিমানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দুই প্রকার যাত্রীই ছিলেন। যতদূর বুঝতে পারছি, প্রথমে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীরা আন্তর্জাতিক টার্মিনাল থেকে বিমানে ওঠেন। তারপর অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীরা অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল থেকে বাসে গিয়ে ওই বিমানে ওঠেন। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের একই ফ্লাইটে আরোহণ যে কোনো বিচারেই শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার পরিপন্থী। আমার জানামতে, বিশ্বের আর কোনো দেশে এটা হয় না; হওয়া উচিতও নয়।

দেখা যাচ্ছে, নিহত তরুণ ঢাকা-চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী হিসেবেই ঢাকা-দুবাই আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটটিতে উঠেছিল। তার মানে, অভ্যন্তরীণ রুটের নিরাপত্তা তল্লাশিতে কোনো ত্রুটি রয়েছে? নাকি, তল্লাশি শেষে বাসে যাওয়ার সময়ই তার কাছে খেলনা বা সত্যিকার অস্ত্রটি সরবরাহ করা হয়?

প্রথমে যেমনটি মনে করা হয়েছিল, প্রেম ও হতাশাজনিত মানসিক পরিস্থিতি থেকে তরুণটি বিমান ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে; তা হলে বিষয়টি এক ধরনের। কিন্তু তার এই অঘটন ঘটানো এবং তার সঙ্গে বাইরের কোনো পক্ষ যুক্ত থাকলে বিষয়টি আরেক ধরনের। যাই হোক না কেন, এই অঘটন আমাদের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তার ফাঁক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

এটা ঠিক যে, আমাদের বিমানবন্দরগুলোতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি শুধু যান্ত্রিক নয়। এগুলো পরিচালনাকারী কর্মীদের একাগ্রতা ও আন্তরিকতাও থাকতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ রুটের মধ্যে ভিন্ন হতে পারে না। বিমানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রতিটি ফ্লাইট, প্রতিটি যাত্রীই সমান মনোযোগের দাবি রাখেন। আমরা যারা প্রায় নিয়মিত অভ্যন্তরীণ বিমান ব্যবহার করি, তারা এ ব্যাপারে ঘাটতি দেখতে পাই। এমনকি বিমানবন্দরের ভেতরে স্বাভাবিক শৃঙ্খলারও অভাব থাকে। এমন অনেক স্থানে কোনো কাজ ছাড়াই কিছু লোক ঘোরাফেরা করে। আমাদের মনে আছে, কিছুদিন আগে এক পুলিশ সদস্য তার আত্মীয়কে বিদায় দিতে থাই এয়ারের ফ্লাইটে উঠে বসে ছিল!

আমি মনে করি, এই ঘটনা থেকে বিমান কর্তৃপক্ষের শিক্ষা নেওয়ার বিকল্প নেই। অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক- যে ফ্লাইটই হোক; ঢাকা বা সৈয়দপুর, সে বিমানবন্দরই হোক; নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ফাঁক রাখা চলবে না। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। আমি আশা করি, তারা বের করতে পারবে, কাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত গাফিলতিতে ঘটনা এতদূর গড়িয়েছিল।