প্রতিটি খাবারে বিষ আতঙ্ক

মোহাঃ খোরশেদ আলম:    ঘরে-বাইরে, হোটেল-রেস্তোরা, ক্লাবে-মেসে অথবা নিজস্ব খাবার ব্যবস্থাপনার মাঝে সর্বত্র বিষ আতংক বিরাজ করছে মানুষের মাঝে। প্রত্যেক দিনের আহারে সন্দেহ ও নাভিশ্বাস উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলছে। ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ভেজালবিরোধী অভিযান শুরু করলেও তা কাংখিত সফলতার মুখ দেখছেনা। কারণ বিভিন্নভাবে এর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যদিও বলা হচ্ছে জনবলের ঘাটতির কারনে এমনটি ঘটছে।

ভোক্তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর রমজান মাস এলেই বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ডিসিসিসহ বিভিন্ন সংস্থা হোটেল-রেস্তোরা, ইফতারী বিক্রেতা ও অন্যান্য ভাসমান দোকানগুলোতে সাড়াসি অভিযান কেবল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণির হোটেল-রেস্তোরার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠিত হোটেল-রেস্তোরাগুলোতে ও ফাস্টফুডের কথিত অভিজাত দোকানগুলোতে কোন অভিযান চালানো হয়না। অতি সম্প্রতি অভিজাত শ্রেণির হোটেল-রেস্তোরোগুলোতে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালাতেই বেরিয়ে আসে নানান ঘৃণ্যচিত্র। ভেজালবিরোধী অভিযানে জরিমানাসহ বিভিন্ন কারাদন্ডাদেশ দেওয়ার পরও হোটেল-রেস্তোরাগুলোতে মরা-মুরগীর বাণিজ্য অব্যাহত আছে।সম্প্রতি ভ্রাম্যমান আদালত প্রায় দেড় মণ মরা-মুরগীর মাংসসহ দুই জন বিক্রেতাকে হাতে-নাতে ধরে ফেলে।

তাদের দেওয়া তথ্য মতে মরা-মুরগীর ক্রেতা হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে অভিযান চালিয়ে সেসব তথ্যের সত্যতা ও পরে হোটেলগুলোতে তিন লাখ টাকা জরিমানাসহ তিন মাস কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়। এর আগে ধানমন্ডির একটি স্বনামধন্য রেস্টুরেন্ট থেকে ৩০০ পিছ মরা পঁচা মুরগীসহ দু’জনকে হাতে-নাতে ধরে র‌্যাব। তারপরও এসব নামীদামী রেস্টুরেন্টগুলোতে পূর্বের ন্যায় রমরমা ব্যবসা চলছেই। সম্প্রতি একটি মানবাধিকার সংস্থা হিডস-এর উদ্যোগে ভেজাল খাদ্যের উপর একটি ডকুমেন্টারী করতে তাদের মাঠে থাকা টিমের বিভিন্ন কর্মীর সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারা যায় প্রায় প্রতিটি ছোট-বড়-মাঝারি হোটেলগুলোতে নানান অনিয়ম চোখে পড়ে।

প্রায় হোটেলগুলোর ভেতরে নোংরা, স্যাতস্যাতে এবং কোথাও পানির নর্দমা। ময়লার বিভিন্ন ডাস্টবিন যত্রতত্রভাবে পড়ে আছে। সেখানে মশা-মাছি ভ্যান ভ্যান করে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর আগের দিনের বাসি খাবারগুলোতে বিশেষ করে মাছ-মাংসগুলো ইঁদুর খেয়ে খর্ত করে রেখেছে। হয়তোবা লোক চক্ষু থেকে দূরে রাখতে অনেক হোটেলগুলোতে রান্না করা হয় হোটেল থেকে অনেক দূরে। কোন হোটেলের সাথে রান্নাঘর থাকলে সেগুলো অত্যন্ত নোংরা। ভেজাল তেল, ভেজাল অন্যান্য উপকরণ যাচাই-বাছাই করা সম্ভব না হলেও যারা দুই চারটি হোটেলে রান্নাঘরের অন্দমহলে প্রবেশ করবেন, তারা হোটেল-রেস্তোরাগুলোতে খাবারের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। রান্নাঘরগুলোতে ভেতরে-বাইরে কাঁদা পানি, ময়লা-আবর্জনাযুক্ত দুর্গন্ধের ছাড়াছড়ি পরিবেশ। কোথাও একাধিক কাঁচা-পাকার টয়লেটের কারনে খাবার খাদ্যে বিভিন্ন নোংরা বস্তু ঢুকে পড়ে অথচ এই খাদ্যগুলো যখন বিক্রির উদ্দেশ্যে বাহারিভাবে প্রদর্শিত করা হয়, তখন বুঝার কোন উপায় থাকেনা।

আবার শাক-সব্জি, ফলমূল, বাচ্চাদের দুধ, ঔষধে নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি খাবারে বিভিন্ন ধরণের ফরমালিন মিশিয়ে খাবারগুলোকে অযোগ্য করে তুলছে। বিশেষ করে, নকল-ভেজাল ওষধে মানুষের জীবন একেবারে বিপন্ন। নজল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা। ফলে এসব ভেজাল ও নকল ওষধ খাওয়ার ফলে রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরো অসুস্থ বা কখনো মৃত্যুও ঘটছে।

আবার অস্বাস্থ্যকর ও ভেজাল খাবারের ফলে মানুষের শরীরে বিভিন্ন জটিল কঠিন রোগ বাসা বাঁধছে। মায়েরা এসব ভেজাল খাধ্য গ্রহণের ফলে জন্মগ্রহণ করছে বিভিন্ন বিকলাঙ্গ শিশু। ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভারের জটিলতাসহ বিভিন্ন কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ভেজাল খাদ্যভোগী মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হোটেল-রেস্তোরা, ফুটপাথ দোকানের খাবারের মান নিয়ন্ত্রণসহ তা কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত তা নির্ণয় করার মূল দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের হলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সব সময় লোকবল স্বল্পতার কথা বলে নিজেদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। দেশে ভেজাল খাদ্যপণ্য শনাক্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১৭টি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিটি খাবার মান সম্মত কিনা এবং প্যাকেট তৈরি করার পূর্বৈ বিএসটিআই-এর অনুমতি বা সীল সম্বলিত কিনা তা যাচাই বাছাই করা ও তদারকী করা অতীব জরুরী। স্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার, পরিবেশ দূষণ, পানিসহ বিভিন্ন অধিদপ্তর রয়েছে যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরীক্ষার পর তা জনগণের ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করবে। কিন্তু ভুক্তভোগী নাগরিকরা সংস্থাগুলোর কোন তৎপরতা দেখতে না পারার কারনে ঘরে-বাইরে প্রত্যেক খাবার গ্রহণকালে বিষ আতংকে থাকে।

নাগরিক সমাজ আশা করে সিটি কর্পোরশেন ও সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান ভেজাল খাদ্য বা দ্রব্য মান নিয়ন্ত্রণে আছেন, তাদের পাশাপাশি কিছু কিছু বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও বা মানবাধিকার সংস্থাসহ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে কিছু শর্তসাপেক্ষে দায়িত্ব দিলে সাধারণ জনগণও এর সুফল পাবেন।

 লেখক: মোহাঃ খোরশেদ আলম, বার্তা সম্পাদাক, সাপ্তাহিক দেশের ডাক