বইমেলায় উপস্থিতির সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছে

নিউজ ডেস্ক:   ‘মা, আমি ভুতের বই নিতে চাই। ভুতের গল্প আমার ভালো লাগে’। জিসান নামের ৮ বছরের খুদে পাঠক এভাবেই আবদার করছিল তার মায়ের কাছে। পাশে থাকা বড় বোন সঙ্গে সঙ্গে জিসানকে ধমকের সুরে বলেন, ‘এমনিতেই ভুতের ভয়ে বাঁচে না। আবার ভুতের গল্প পড়তে চায়’। দুইজনের ‘ঝগড়া’ থামিয়ে অবশেষে মা জিসানকে কিনে দেন ভুতের গল্পের একটা বই।

ফাল্গুনের পড়ন্ত বিকেলে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শিশু চত্বরে দেখা মেলে জিসানের মতো অনেক শিশু-কিশোরের; যারা অভিভাবকের সঙ্গে বইমেলায় আসে। কেউ কিনছে, কেউ বা বই নাড়াচাড়া করেই চলেই যাচ্ছে। উত্তরা থেকে আসা রুমানা রহমান জানান, তার ছেলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। তার পছন্দ বিজ্ঞানের বই । রুমানা বলেন, ছেলে খুব ভাল করে বাংলা বানান করে পড়তে পারে না। তারপরও বিজ্ঞানই তার পছন্দ। এ কারণে ছবি আছে এমন কিছু বিজ্ঞানের বই কিনবেন।

অনেক অভিভাবকই জানালেন, বইমেলার শিশু চত্বরটা বেশ আকর্ষনীয় হয়েছে। শিশুরা এখানে এসে মজা পায়। তবে কেউ কেউ এর পরিধি আরেকটু বাড়ানোর ব্যাপারে মত দেন।

যারা এখনও বই পড়া শেখেনি সেইসব শিশুদেরও চত্বরের ঘেরা অংশে লাফালাফি করতে দেখা গেল। কোনও কোনও অভিভাবক আক্ষেপের সুরে বললেন, আজ তো হালুম থাকবে না। সিসিমপুরের হালুম তো শনিবারে থাকে।হালুম থাকলে শিশুরা আরও মজা পেত ।

বইমেলা ঘুরে কথা হয় নানা বয়সী দর্শনার্থীর সঙ্গে। বুয়েটের শিক্ষার্থী মৌমিতা ইসলাম জানান, মুহম্মদ জাফর ইকবালের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি তার ভালো লাগে। এছাড়া মেলায় আসা নতুন লেখকদের উপন্যাসও তার পছন্দ। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বই পড়ার সময় নেই- এমন প্রসঙ্গ টানতেই তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার বই পড়ার অভ্যাস। সারাবছরই বই পড়ার চেষ্টা করি। আর বইমেলা এলে নতুন কিছু বই কেনা হয়-ই।’

তার মতে, বাবা-মায়েরাই পারেন ছেলেমেয়েদের বই পড়তে উৎসাহিত করতে। তিনি বলেন, ছোট থেকেই যদি শিশুদের উৎসাহ দেওয়া হয় তাহলে তারা বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে।

ঘুরতে ঘুরতেই দেখা হয়, রাজধানীর সেন্ট্রাল ইউমেন কলেজের তিন বান্ধবীর সঙ্গে। জানা গেল, তাদের মধ্যে সাগুফতা আনিম নামের একজনই শুধু বই কিনতে এসেছেন। বাকীরা এসেছেন তাকে সঙ্গ দিতে। ঠিক কি ধরনের বই পছন্দ- জানতে চাইলে সাগুফতা বলেন, ‘অ্যাডভেঞ্চার ধরনের বই ভালো লাগে। আবার বিভিন্ন ধরনের লাভ স্টোরিও পছন্দ।’ তিনি জনান, নির্দিষ্ট কোনও লেখক নয়, যে বইয়ের বিষয়বস্তু ভাল লাগবে সেটাই কিনবেন।

কথা হয় ফরিদপুরের সদরপুর থেকে আসা স্কুল শিক্ষক মোমিনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, যখন ঢাকায় থাকতেন তখন প্রতিদিনই বইমেলায় আসতেন। এখন চাকরি সূত্রে ঢাকার বাইরে থাকলেও প্রতিবছর বইমেলার সময় দুই-একদিনের ছুটি নিয়ে চলে আসেন বইমেলায়। তিনি জানালেন, মেলা থেকে আহমেদ ছফার উপন্যাসসমগ্র, জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’সহ নতুন কয়েকজন লেখকের বই কিনেছেন।মোমিনুর বলেন, ‘আহমেদ ছফার বইগুলো আগে পড়া থাকলেও সংগ্রহে ছিল না।’

বিভিন্ন প্রকাশনীর বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুরুর দিকে বইমেলায় ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। তবে এখন মেলায় ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসের পর বইয়ের বিক্রি বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে কথা প্রকাশের ম্যানেজার মো. ইউনুস জানান, গত বছরের তুলনায় এবারে বইয়ের বিকিকিনি ভালো। তাদের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে কিশোর ক্লাসিক, উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধের বই, মনীষীদের জীবনী ভালো চলছে।

পার্ল প্রকাশনী থেকে জানা গেল, এবারে বইমেলার বিকিকিনি সন্তোষজনক। তাদের প্রকাশনার শিশু-কিশোরদের বইগুলো ভালো চলছে। ছেলেমেয়েরা ভুতের গল্প, অ্যাডভেঞ্চোর বই বেশি পছন্দ করছে। অনেক শিক্ষার্থীই দল বেঁধে শিক্ষকদের সঙ্গে আসছে বইমেলায়।

বইমেলার পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেন অন্যপ্রকাশ-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা আলাউদ্দীন টিপু। তিনি বলেন, ‘এবারের বইমেলা বেশ গোছানো। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি। এছাড়া বইমেলার জায়গা প্রশস্ত হওয়ায় সবাই বেশ স্বচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারছেন।’

টিপু জানান, হুমায়ুন আহমেদের বই এখনও পাঠকের পছন্দের শীর্ষে। তবে মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ অন্য লেখকদের বইও ভালো চলছে।