ক্ষমা চাইবে না জামায়াত, নতুন উদ্যোগ নিয়ে সংশয়

নিউজ ডেস্ক:  মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার কারণে ক্ষমা চাওয়া ও দলের সংস্কারকে কেন্দ্র করে দলের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করলেও ক্ষমা চাইবে না জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা ও নির্বাহী পরিষদের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এমন মনোভাব জানা গেছে। একইসঙ্গে শুরা সদস্যদের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন নামে সংগঠন করার বিষয়ে অনেকটা এগিয়ে গেলেও তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে দলের অভ্যন্তরে। এ বিষয়টিকেই কেন্দ্র করেই লন্ডন থেকে চিঠি পাঠিয়ে দল থেকে সরে গেছেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক। বহিষ্কার হয়েছেন শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু।

জামায়াতের নতুন উদ্যোগের প্রত্যাশায় থাকা নেতারা বলছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে ক্ষমা চাওয়া একটি বিবেচ্য বিষয়। ক্ষমা চাওয়ার সঙ্গে দলের সিনিয়র নেতাদের মান ও মর্যাদা যুক্ত। ক্ষমা চাইলে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের প্রত্যাশা ছিল, জামায়াতের হাইকমান্ড নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু করবেন।

কিন্তু গত জানুয়ারিতে মজলিসে শুরার সদস্যরা নতুন নামে সংগঠন করার বিষয়ে মতামত দিলেও তা প্রকাশ পায় এ মাসে। এখানেই দলের পরিবর্তন প্রত্যাশীদের প্রশ্ন।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জানুয়ারিতেও এ মত দিয়েছেন। তার মত ছিল, ক্ষমা না চাইলেও অন্তত দল বিলুপ্ত করে দেওয়া হোক। যদিও জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির অর্ধেক সময় পর্যন্ত জামায়াতের হাইকমান্ড দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি।

শুক্রবার দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন শিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের মজলিসে শুরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছি। অনেক ওয়ার্ক করা হয়েছে, তৃণমূল থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে। আমাদের জানানো হয়েছে, যে আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। তবে এখন এসে বলা হচ্ছে, আমরা ৫ সদস্যের কমিটি করেছি। আমার কাছে বিষয়টি মনে হয়েছে, বর্তমানে পরিবর্তনের যে দাবি উঠেছে, তা জাস্ট ফেস করার একটি চেষ্টা।’

মঞ্জুর পর্যবেক্ষণ, ‘নতুন উদ্যোগের বিষয়ে জানুয়ারিতে সিদ্ধান্ত হলো। ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। জানানো হলো অধঃস্তনদেরকে, প্রেসকে জানানো হয়নি। কারণ কী, মানে হচ্ছে অধঃস্তনদের শান্ত রাখতে চাচ্ছে। তথ্যের লুকোচুরি করা হয়েছে। রাজ্জাক সাহেব ভদ্রলোক মানুষ, নিয়মতান্ত্রিকভাবে তিনি সবকিছু করে এসেছেন।’

এ বিষয়ে নির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে সবকিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে মৌলিক কোনও সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারিনি।’

নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্যের বরাত দিয়ে ছাত্র শিবিরের একজন সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ‘নতুন নামে সংগঠনের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ দিকে। সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে। এ কমিটির প্রতিবেদনের পরই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেবে জামায়াত।’

জামায়াতের রাজনীতির পর্যবেক্ষক, সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান অবশ্য ৫ সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘শফিকুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বে কমিটি হয়েছে। এখন যারা কথা বলছে, তারা ইসলামের নৈতিকতায় বিশ্বাস করে না। এটা তো সবার জানার কথা না, এটি দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘ক্ষমা না চাওয়া কিংবা নতুন সংগঠনের বিষয়ে এটা হতে পারে, যে একটা কাজ যখন আপনি প্রথমেই না করেছেন, সেটা পরবর্তীতে দলের পরের নেতারা ভাবছেন, আগে যারা ছিলেন তারা তো করেননি, সেক্ষেত্রে কেন করবো। এই যে ধারাবাহিক সমস্যা। ড্রাফট করেছিলো, কী ভাষায় ক্ষমা চাইবেন। সেখান থেকেও নেতারা সরে এসেছেন।’

শিবিরের সাবেক এই সভাপতি ব্যাখ্যা করেন, ‘পার্টির মধ্যে এখন বিরাট প্রশ্ন, আমরা যদি ক্ষমা চাই তাহলে আমাদের নেতারা যারা শহীদ হয়েছেন, যারা নিহত হয়েছেন, তাদেরকে ব্লেম করা হয়। কথাটা কিন্তু যুক্তিপূর্ণ, আবেগ জড়িত। আমি এটাই বলেছি যে, পার্টিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগে যে, আগে ভুল করেছে নাকি সঠিক করেছে। যদি সঠিক হয়, তাহলে ক্ষমা চাইবেন কী না। যদি ভুল করে তাহলে প্রশ্ন হবে, আদর্শিক সংগঠন হিসেবে সেই ভুল নিয়ে আপনি চলবেন কী না। হ্যাঁ ভুল করেছেন, জাস্টিফাই করেননি। জাস্টিফাই করা হলে ফলাফল ভয়ঙ্কর হবে, তাহলে পার্টি বিলুপ্তি করে দিন। রাজ্জাক সাহেব তো এ কথাই বলেছেন।’

মঞ্জুর বহিষ্কার হওয়ার একদিন আগে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক। তিনি তার পদত্যাগের কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন এবং দফায়-দফায় ক্ষমাগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন। যদিও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোনও কার্যকর উদ্যোগ না পেয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

পদত্যাগপত্রের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‌‘সর্বশেষে ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে আমার মতামত চাওয়া হয়। আমি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেই। তবে অন্য কোনও বিকল্প না পেয়ে বলেছিলাম, জামায়াত বিলুপ্ত করে দিন।’

এদিকে, জামায়াতের সাবেক সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ, মঞ্জুর বহিষ্কারের পেছনে ভিন্ন কোনও কারণ আছে কী না, এ নিয়ে জামায়াত ও শিবিরের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়।

জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মনে করেন, বহিষ্কারের সংখ্যা বাড়তে পারে। ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় একনেতার সন্দেহ, ‘তাদের পদত্যাগ ও বহিষ্কারের পেছনে নতুন উদ্যোগ যুক্ত কী না, এমন ধারণা আমাদের কারও-কারও আছে।’