জামায়াত বদলাবে না ভাঙবে?

নিউজ ডেস্ক:   মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন নামে দল গঠনের দাবি করা নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন জামায়াতে ইসলামীতে। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের জামায়াত ত্যাগের পর দলটি থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু।

জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ, মজিবুর রহমান মঞ্জুর বহিস্কার এবং গত কয়েকদিনের ঘটনাক্রমে স্পষ্ট জামায়াতে পরিবর্তনের চেষ্টা ভেস্তে গেছে। দলটি ভোটের রাজনীতিতে না থাকলেও নীতি বদল করবে না। একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইবে না। জামায়াতে সংস্কার না হলে দলটি ভেঙে নতুন দল হতে পারে- এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। দিনাজপুরের খানসামায় স্থানীয় এক নেতা আবদুর রাজ্জাকের সমর্থনে জামায়াত ছেড়েছেন। আরও অনেকে ছাড়তে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।

জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম নির্বাহী পরিষদের কেউ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। নির্বাহী পরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের  বলেছেন, ‘চলমান ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন জ্যেষ্ঠ নেতা হয়ে তিনি এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারেন না।’

প্রায় পাঁচ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা আবদুর রাজ্জাক লন্ডন থেকে টেলিফোনে সমকালকে বলেন, তিনি আর রাজনীতিতে নেই। তারপরও প্রত্যাশা করেন জামায়াত নিজেকে বদল করবে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইবে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবদুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, তিনি চান না জামায়াত ভেঙে যাক। তিনি চান পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবর্তন আসুক জামায়াতে।

তার মতকে সমর্থন করায় মজিবুর রহমান মঞ্জুকে জামায়াত থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। এ ঘটনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না আবদুর রাজ্জাক। তিনি জানালেন যে, রাজনীতিতে আর ফেরার ইচ্ছা নেই। তাই জামায়াতের সংস্কারবাদীরা নতুন দল গঠন করলে তার নেতৃত্বও দেবেন না তিনি। তবে বাংলাদেশে তুরস্কের একে পার্টি, তিউনিশিয়ার এন্নাহাদার মতো মধ্যডানপন্থি কোনো দল গঠিত হলে তাতে সমর্থন থাকবে বলে সমকালকে জানিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক।

আবদুর রাজ্জাক ও তার অনুসারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গ্রহণ করে মধ্যডানপন্থি দল গঠন করবেন কি-না তা এখনও নিশ্চিত নয়। একটি সূত্র দাবি করেছে, এ বছরেই দল হতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, তাদের জামায়াত ভাঙার ইচ্ছা নেই। তাদের চেষ্টা জামায়াতে সংস্কার ও পরিবর্তন আনা। যদি সফল হতে না পারেন, তাহলে নতুন নামে দল গঠন অনিশ্চিত।

জামায়াত সূত্রের খবর, জামায়াতে বড় ধরনের সংস্কার এনে নতুন দল করা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ দাবি যাদের ছিল, তারাও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অধিকাংশ ভোটের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পক্ষাপাতী হলেও সংস্কারের বিপক্ষে। জামায়াতের ৭৯ বছর বয়েসী আমির মকবুল আহমাদ সংস্কারের পক্ষে থাকলেও তার জোরালো অবস্থান নেই দলে। তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়ার কথাও বলেছেন সম্প্রতি।

১৯৭৯ সাল থেকেই জামায়াতে সংস্কারবাদী ও রক্ষণশীলদের বিরোধ। তবে রক্ষণশীলরা বরাবরই শক্তিশালী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের ভরাডুবির পর ফের আলোচনায় আসে সংস্কার। কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, আবদুর রাজ্জাকসহ তরুণ নেতারা সংস্কারের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মতিউর রহমান নিজামীসহ রক্ষণশীল নেতাদের বাধায় তা কার্যকর হয়নি।

২০১১ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়লে সংস্কারের আলোচনা আড়ালে চলে যায়। তবে সংবাদপত্রে কলাম লিখে সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে লড়াই অব্যাহত থাকে। আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন ২০১৬ সালে প্রসঙ্গটি ফের তুললেও, তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পালে হাওয়া পায়নি। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর ফের আলোচনায় আসে জামায়াতে সংস্কার।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর মজলিশে শূরা সদস্যদের কাছে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে মতামত আহ্বান করেন দলের আমির মকবুল আহমাদ। গত জানুয়ারিতে জামায়াতের ১৩টি সাংগঠনিক অঞ্চলে একযোগে মজলিশে শূরার বৈঠক হয়। সেখান থেকে জোট ও ভোটের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা, মিছিল-মিটিংয়ের মতো কর্মসূচি না নেওয়া এবং নতুন নামে দল গঠনের প্রস্তাব আসে।

জামায়াতের পদত্যাগী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে পদাধিকার বলে মজলিশে শূরার সদস্যও ছিলেন। তিনি জামায়াত বিলুপ্ত করে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়ে নতুন নামে দল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মজলিশে শূরার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাহী পরিষদের। প্রস্তাব মূল্যায়নে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ পাঁচ সদস্যের কমিটি করলেও সেখানে রক্ষণশীলদেরই রাখা হয়েছে, যারা সংস্কারের বিপক্ষে।

এর মাধ্যমে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায় জামায়াতের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তারা সংস্কারের পথে যাচ্ছেন না। অতীতেও এমন কমিটি হয়েছে, যারা সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করেনি। এবারও সংস্কারের প্রস্তাব গ্রহণ না করে, কমিটি গঠন করে ‘কালক্ষেপণের কৌশলে’ ক্ষোভে দল ছেড়েছেন আবদুর রাজ্জাক।

জামায়াতের সংস্কারের দাবিতে কয়েক বছর ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করতেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি আবদুর রাজ্জাকের মতের সমর্থক ছিলেন। গত বৃহস্পতিবারও তিনি সংস্কারের পক্ষে ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস লেখেন। দলের নীতি আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক লেখালেখি ও বক্তব্যের কারণে শুক্রবার রাতে তাকে জামায়াত থেকে বহিস্কার করা হয়।

আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের পর তার মতের সমর্থক নেতাকে দল থেকে বহিস্কারের মাধ্যমে জামায়াত সংস্কারপন্থিদের এক প্রকার কঠোর বার্তা দিয়েছে বলে বিশ্নেষকরা মনে করছেন। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, ২০১০ সালে তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গ্রেফতারের পর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়েছিল এটিএম আজহারুল ইসলামকে। মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মতো জ্যেষ্ঠ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলকে টপকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এটিএম আজহারকে। কারণ, কামারুজ্জামান জামায়াতের সংস্কারের প্রস্তাবক ছিলেন।

বহিস্কার হওয়া মজিবুর রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, জামায়াতে দলীয় ফোরামে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকলেও আত্মসমালোচনার সুযোগ কম। ‘জি-হুজুররা’ দলটির নেতৃত্বে যেতে পারেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াত একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাইলেও ‘বিজয় দিবস’, ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালন করে দ্বৈত ভূমিকায় রয়েছে। যদি জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা সঠিক হয়ে থাকে তাহলে এসব দিবস পালন করা উচিত নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান বলা উচিত নয়। যদি বিজয় বিজয় দিবস পালন করা হয়, তাহলে জামায়াতকে স্বীকার করতে হবে একাত্তরে তারা ভুল করেছে।

১৯৮১ সালে ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন ড. আহমদ আবদুল কাদের। তিনি বর্তমানে খেলাফত মজলিশের মহাসচিব। জামায়াত কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, কার সিদ্ধান্তে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল- এসব প্রশ্ন তুলে বহিস্কৃত হয়েছিলেন তিনি। আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, জামায়াতের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে তারা এসব প্রশ্ন শুনতে চান না। নেতার আনুগত্যই জামায়াতে টিকে থাকার শর্ত।

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এসেছে প্রতিক্রিয়া। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জামায়াতের সংস্কারবাদীদের উদ্দেশ্য পরিস্কার নয়। তারা নতুন নামে পুরনো আদর্শে নিয়ে এলে লাভ কি?

রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের মূল্যায়ন, জামায়াতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তার কাছে অস্পষ্ট ও গোলমেলে মনে হচ্ছে। সংস্কারপন্থিদের আহ্বান শুনে জামায়াতে পরিবর্তন আসবে এমন সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তিনি সমকালকে বলেছেন, উপমহাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোতে বহু ভাঙাগড়া হয়েছে। না বদলালে জামায়াতও ভাঙতে পারে। আবার জামায়াতের অস্থিরতা একটি রাজনৈতিক খেলাও হতে পারে।

স্বাধীনতার পর জামায়াত নিষিদ্ধ হয়। পঁচাত্তরের পর মাওলানা আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে রাজনীতিতে সক্রিয় হয় জামায়াত। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আইডিএল জোট ২০টি আসন পায়। ১৯৮০ সালে আব্দুর রহিমের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও জামায়াতকে পুনরুজ্জীবিত করেন গোলাম আযম। আব্দুর রহিম ও তার অনুসারীদের অভিমত ছিল, একাত্তরের ভূমিকার কারণে জামায়াত নামে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। পরবর্তীকালে আব্দুর রহিমকে দল থেকেও বাদ দেওয়া হয়।