শেয়ার বাজার নিয়ে কিছু কথা

আলি জামান:   দেশে বিদ্যমান আর্থিক খাতের দুটি ক্ষেত্র অর্থাত্ ব্যাংকিং ও শেয়ার বাজার বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। নতুন অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন এবং সমাধানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন, যা শেয়ার বাজারে ব্যাংকিং সেক্টরের শেয়ারমূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। শেয়ার বাজারে ১৯৯৬ আর ২০১০ এ সৃষ্ট ধসের সময় দায়িত্বরত অর্থমন্ত্রীগণ একটু সচেষ্ট হলে হয়তো তা এড়ানো সম্ভব হতো। নতুন মন্ত্রী মহোদয় শেয়ার বাজারের তাত্ত্বিক আর ব্যবহারিক উভয় বিষয়ে যারপরনাই জ্ঞানসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ।

সবাই জানে ১৯৯৬ এর পর থেকে দেশের শেয়ার বাজারে দুইটি প্রধান সংকট বিরাজমান। এর একটি আস্থার সংকট, অপরটি হলো আর্থিক সংকট। আস্থার সংকট তখনি দূর হবে যখন সাধারণ মানুষ তাদের বিনিয়োজিত পুঁজির নিরাপত্তা পাবে। সবাই জানে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এই ঝুঁকি এড়িয়ে যথাযথ পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করলে অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব। সাধারণ মানুষ তাই এই ঝুঁকিটা নিতে পিছপাও হয় না। কিন্তু শেয়ার বাজারে বিদ্যমান জুয়াড়ি চক্র যখন ম্যানিপুলেশন করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নিরাপদে অবস্থান করে তখন আস্থার সংকট দেখা যায়, আশা করা যায়, আপনার হস্তক্ষেপে এই আস্থার ঘাটতি দূর হবে।

শেয়ার বাজারে প্রধান সংকট হলো, পুঁজির সংকট। সাধারণ মানুষের পক্ষে এককভাবে পুঁজির সংকট দূর করা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন হয়। শেয়ার বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হলো মিউচুয়াল ফান্ড, ইউনিট ফান্ড, পেন্সন ফান্ড ইত্যাদি। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো কিছুটা হলেও ব্যাংক মার্চেন্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী নয়। এরা বড় মাপের বিনিয়োগকারী মাত্র। আর তাই দেশে দেশে শেয়ার বাজারগুলোতে বর্ণিত ফান্ডগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নেয়া হয়। আমাদের দেশের শেয়ার বাজারে প্রথমে আইসিবি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসাবে আবির্ভূত হয়। পরবর্তীকালে বেসরকারি এইমস-১ ও গ্রামীণ ১ মিউচুয়াল ফান্ড বাজারে এসে সাফল্য দেখায়। এর ধারাবাহিকতায় আরো কিছু মিউচুয়াল ফান্ড বাজারে এসে সাফল্য দেখায়। কিন্তু ২০১১ সালে বিএসইসি আইসিবির ফান্ডগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নিলে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোতে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এবং বাজার মূল্য পতন ঘটতে থাকে। এরপর বিএসইসি যখন সুস্পষ্ট ভাবে বললো, যে ক্লোজ এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ দশ বছরের বেশি হবে না ,তখন এই সেক্টরের উপর পুরোপুরি অনাস্থা সৃষ্টি হয়।

আমি তখন এই দশ বছর মেয়াদ নির্ধারণের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট মামলা করি। আমার পক্ষে ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপস মামলাটি পরিচালনা করেন। সরকার পক্ষ তথা বিএসসির পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল। প্রথমে হাইকোর্টের রায় আমার পক্ষে গেলেও আপিল আদালতের চূড়ান্ত রায় বিএসইসির অনুকূলে যায়। এর ফলে আইসিবির ১ থেকে ৮ এবং এইমস-১ ও গ্রামীণ-১ মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব শেয়ার বাজারের মিউচুয়াল ফান্ড সেক্টরের উপর পড়ে এবং নতুন ফান্ড আসা এক প্রকার বন্ধ হয়ে যায়।

সকলে অবগত আছেন যে, যে দেশের শেয়ার বাজারে এইসব ফান্ডের অবদান বেশি, সেই সব বাজার বেশি শক্তিশালী। ভারতে এই সব ফান্ডের অবদান (Contribution) ৪০% এর বেশি হলেও আমাদের শেয়ার বাজারে এর অবদান ১% এর কম। বর্ণিত দশটি ফান্ড না থাকায় এর পরিমাণ আরো কমে গিয়েছে। যাই হোক, সুপ্রিম কোর্টের রায় তো ইগ্লোর করা যায় না। এইটা একদিক থেকে ভালো হয়েছে যে, এই সেক্টরের বিনিয়োগকারীরা অন্তত মেয়াদশেষে NAV অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাবে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করা গেছে যে, বিএসইসি সম্প্রতিকালে সর্বোচ্চ আদালতের রায় অগ্রাহ্য করে-তথা নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বলছে, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ চাইলে বাড়ানো যাবে। এইটা কি দ্বিচারিততা নয়? বেশিরভাগ মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ অতিশীঘ্র উত্তীর্ণ হয়ে যাবে আর বিনিয়োগকারীরা NAV অনুযায়ী তাদের ফান্ডের বিপরীতে টাকা ফেরত পাবে বলে যেখানে অপেক্ষা করছে, সেখানে বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত তাদের হতবাক করেছে। আর এই সিদ্ধান্ত কি আদালত অবমাননার সামিল নয়?

শোনা যাচ্ছে, বিশেষ একটি এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে বিএসইসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএসসি এর আগে জানিয়েছিল, যদি কোন মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্য ফেস ভ্যালুর নিচে থাকে তবে ওগুলোর বিপরীতে RIU দেয়া যাবে না। বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত সব কোম্পানি মানলেও এই বিশেষ কোম্পানিটি তা অগ্রাহ্য করে চলেছে। আর এর ফলে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীরা ন্যায্য ডিভিডেন্ড প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অপরদিকে এই ফান্ডগুলোর বাজার মূল্য ফেস ভ্যালুর অর্ধেকে অবস্থান করছে। আর এর ফলে নতুন কোন ফান্ড বাজারে আসছে না।

মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিন। আর সেই সাথে কোন এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি যাতে চলতি বছরের প্রদেয় ডিভিডেন্ড আইনমাফিক নগদে প্রদান করে, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এই প্রত্যাশা রইল।

আমাদের পুঁজিবাজার স্বাভাবিক আচরণ করে না। করলে এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। শেয়ার বাজারে মানুষ বিনিয়োগ করবেই। বিশেষ করে ব্যাংক বা অন্যত্র যদি বিনিয়োজিত পুঁজির বিপরীতে আয় কম হয় তবে তো কথাই নেই।