নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল: পরাজিত ৭৪ প্রার্থীর মামলা

নিউজ ডেস্ক:  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে গত তিন দিনে আবেদন করেছেন ৭৪ জন পরাজিত প্রার্থী। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের ছয়টি একক বেঞ্চ গঠন করেছেন। অভিযোগকারী পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ৭০ জন, গণফোরামের তিনজন এবং প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) একজন প্রার্থী। তারা বিধি অনুযায়ী সশরীরে হাজির হয়ে হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট শাখায় আবেদন দাখিল করেন।

আবেদনে সংশ্নিষ্ট নির্বাচনী আসনে বিজয়ী প্রার্থীকে বিবাদী করা হয়েছে। এতে ওই ৭৪ আসনের ফল বাতিল চেয়ে পুনঃনির্বাচনের দাবিও জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ছিল আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। এদিন ৬৬ জন পরাজিত প্রার্থী আবেদন করেন। এর আগে গত মঙ্গল ও বুধবার আবেদন করেন অপর আট পরাজিত প্রার্থী।

বৃহস্পতিবার নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে রিভিশন আবেদন দাখিলের শেষ দিন হলেও অন্যান্য আসনের পরাজিত প্রার্থীরা বিলম্ব মওকুফের দরখাস্ত করে হাইকোর্টে আবেদন করতে পারেন। তাদের এমন প্রস্তুতি রয়েছে। এসব প্রার্থী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন দাখিল করতে পারেননি।

আবেদনকারীরা হলেন- অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী (ঢাকা-৬), মফিজুল ইসলাম খান কামাল (মানিকগঞ্জ-৩), মেজর জেনারেল আ ম সা আমিন (কুড়িগ্রাম-২), আব্দুল মোমেন চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৫), সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪), আবুল কালাম আযাদ সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল-৭), জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), রুমানা মাহমুদ (সিরাজগঞ্জ-২), জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), শাহ রিয়াজুল হান্নান (গাজীপুর-৪), নাছের রহমান (মৌলভীবাজার-৩), আবদুল হাই (মুন্সীগঞ্জ-৩), হাফিজ ইব্রাহিম ( ভোলা-২), রুহুল আমিন দুলাল (পিরোজপুর-৩), ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন (ঢাকা-১৯), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ( ভোলা-৩), তানভীর উল আলম (কুড়িগ্রাম-৩), মো. সাইফুল ইসলাম (রংপুর-৬), মো. সাদেক রিয়াজ (দিনাজপুর-২), মোস্তফা মহসিন মন্টু (ঢাকা-৭), নজরুল ইসলাম আযাদ (নারায়ণগঞ্জ-২), মইনুল ইসলাম খান শান্ত (মানিকগঞ্জ-২), ইরফান ইবনে আমান অমি (ঢাকা-২), নবী উল্লাহ নবী (ঢাকা-৫), আশরাফ উদ্দিন (নরসিংদী-৫), মো. আমিরুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৫), শহীদুল ইসলাম (টাঙ্গাইল-১), ফরহাদ হোসেন আযাদ (পঞ্চগড়-২), মো. হাসান রাজিব প্রধান (লালমনিরহাট-১), মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৬), মো. আক্তারুজ্জামান মিয়া (দিনাজপুর-৪), মো. শাহজাহান মিয়া (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১), মিজানুর রহমান (সুনামগঞ্জ-৫), মো. জি কে গউছ (হবিগঞ্জ-৩), মজিবুর রহমান চৌধুরী (মৌলভীবাজার-৪), ফারুক আলম সরকার (গাইবান্ধা-৫), শফী আহমেদ চৌধুরী (সিলেট-৩), মো. আনোয়ারুল হক (নেত্রকোনা-২), শাহ মো. ওয়ারেস আলী (জামালপুর-৫), নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩), মো. আবু সুফিয়ান (চট্টগ্রাম-৮), মাসুদ অরুণ (মেহেরপুর-১), আমিন উর রশীদ (কুমিল্লা-৬), এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন (নোয়াখালী-১), বরকতউল্লাহ বুলু (নোয়াখালী-৩), শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া (খাগড়াছড়ি), সাব্বির আহমেদ (রংপুর-৩), মুন্সী রফিকুল আলম মজনু (ফেনী-১), আকবর হোসেন (ফেনী-৩), জয়নুল আবদিন ফারুক (নোয়াখালী-২), সাচিং প্রু (বান্দরবান), শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক (চাঁদপুর-৩), আবুল খায়ের ভূঁইয়া (লক্ষ্মীপুর-২), জাকির হোসেন সরকার (কুষ্টিয়া-৩), রকিবুল ইসলাম বকুল (খুলনা-৩), শামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২), আনিছুর রহমান তালুকদার খোকন (মাদারীপুর-৩), আজিজুল বারী হেলাল (খুলনা-৪), শাহ মো. আবু জাফর (ফরিদপুর-১), মো. শরীফুজ্জামান (চুয়াডাঙ্গা-১), হাবিবুল ইসলাম হাবিব (সাতক্ষীরা-১), আলী নেওয়াজ মো. খৈয়ম (রাজবাড়ী-১) প্রমুখ।

বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলার জন্য প্রত্যেক বিভাগের পৃথক আইনজীবী প্যানেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সব আবেদনের পক্ষে আইনি পদক্ষেপ নিতে আটজন আইনজীবীর একটি প্যানেল করা হয়েছে। অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী খুলনা ও ফরিদপুর বিভাগ, অ্যাডভোকেট মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন চট্টগ্রাম, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বরিশাল, ব্যারিস্টার আমিনুল হক রাজশাহী, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ময়মনসিংহ, ব্যারিস্টার মো. হাসান রাজীব প্রধান রংপুর এবং ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ঢাকা বিভাগের মামলা পরিচালনা করবেন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বলেন, নির্বাচনে জাল ও একতরফা ভোট এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রার্থীরা আদালতে মামলা করেছেন।

ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৪৯ বিধি অনুযায়ী এসব মামলা হয়েছে। গেজেট প্রকাশের ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন দাখিলের নিয়ম রয়েছে। তবে এরপরেও যারা আবেদন করবেন তারা বিলম্ব মওকুফের দরখাস্ত দিতে হবে। তিনি বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর যে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে, তার তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আবেদনের অনুলিপিতে বাদী হিসেবে আবেদনকারীর স্বাক্ষরিত হতে হবে। পাঁচ হাজার টাকার জামানতসহ হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট শাখায় আবেদনটি দাখিল করতে হবে। ৫০ ধারা অনুযায়ী, বাদীর সংসদীয় আসনের সব প্রার্থীকে বিবাদী করতে হবে এবং অনিয়ম ও বেআইনি কর্মকাে র তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা উল্লেখ করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার কর্মসূচি ঘোষণা করে। এজন্য প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে নির্বাচনের বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবেদনও জমা নেয় বিএনপি। পরে আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন না, এমন আশঙ্কায় মামলা করার সিদ্ধান্ত থেকে অনেকটা সরে আসেন দলটির নীতিনির্ধারক নেতারা। কিন্তু থিঙ্কট্যাঙ্কের পরামর্শক্রমে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রত্যেক জেলার প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে এ মামলা করার পক্ষে মত দেন।

হাইকোর্টের ৬ বেঞ্চে শুনানি : একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ-সংক্রান্ত আবেদনের শুনানি হবে হাইকোর্টের ছয়টি একক বেঞ্চে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন শুনানির জন্য এসব একক বেঞ্চকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ব্যারিস্টার মো. সাইফুর রহমান বলেন, নির্বাচনের অনিয়মসহ নানা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের ছয়টি একক বেঞ্চ গঠন করেছেন। এখানে শুধু নির্বাচন নিয়ে আবেদনগুলোর শুনানি হবে।

একক বেঞ্চগুলো হচ্ছে- বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকার, বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান, বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক, বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান, বিচারপতি মাহমুদুল হক ও বিচারপতি কাশেফা হোসেন। এ ছয়টি একক বেঞ্চকে নির্বাচন-সংক্রান্ত সব আবেদন নিষ্পত্তির করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও হাইকোর্টে মামলা করতে পারবেন সংক্ষুব্ধরা। এ জন্য হাইকোর্টে আলাদা বেঞ্চ রয়েছে। ইতিমধ্যে একাধিক বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে। আইন অনুযায়ী নির্বাচিতদের বিষয়ে গেজেট প্রকাশের ৪৫ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে গত ১ জানুয়ারি গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ৭ জানুয়ারি নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে।