দুই জামায়াত নেতাসহ ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড

নিউজ ডেস্ক:  সুনামগঞ্জের ছাতকে শিশু শ্রেণির ছাত্র মোস্তাফিজুর রহমান ইমন হত্যা মামলায় দুই জামায়াত নেতাসহ চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. রেজাউল করিম গতকাল বুধবার দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন। চার বছর আগের চাঞ্চল্যকর এ মামলায় হত্যা, অপহরণ ও লাশ গুমের অভিযোগে পৃথক ধারায় আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলো- ছাতক উপজেলার ব্রাহ্মণজুলিয়া গ্রামের মৃত মখলিছ মিয়ার ছেলে শুয়াইবুর রহমান সুজন, বাতিরকান্দি গ্রামের আবদুল মুক্তাদিরের ছেলে রফিকুর রহমান রফিক, একই গ্রামের আবদুস ছালামের ছেলে মো. জাহেদ ও আবদুল কবিরের ছেলে ছালেহ আহমদ। তাদের মধ্যে সুজন ছাতকের ছৈলা-আফজলাবাদ ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ও বাতিরকান্দি শাহজালাল জামে মসজিদের ইমাম এবং জাহেদ নোয়ারাই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। রায় ঘোষণার সময় সুজন, রফিক ও জাহেদ আদালতে উপস্থিত ছিল। অন্য আসামি ছালেহ ঘটনার পর থেকেই পলাতক।

এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা ও মামলার বাদী জহুর আলী। রায় দ্রুত কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট কিশোর কুমার কর জানান, রায়ে হত্যা, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে প্রত্যেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া লাশ গুমের অভিযোগে প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত।

বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সমিউল আলম বলেন, আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন।

আসামি পক্ষের আইনজীবী শহিদুজ্জামান চৌধুরী রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের বাতিরকান্দি গ্রামের সৌদিফেরত জহুর আলীর ছেলে ইমন লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানার কমিউনিটি বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে পড়ত। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ বিকেলে বাড়ির পাশ থেকে তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণের দুই লাখ টাকার মধ্যে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা পাওয়ার পরও অপহরণকারীরা ইমনকে হত্যা করে। ৫ এপ্রিল রাতে ইমনের বাড়ি সংলগ্ন মসজিদের আঙিনায় তাকে বিষপান করিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই বছরের ২৮ মার্চ ইমনের বাবা জহুর আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে ছাতক থানায় অপহরণ মামলা করেন। প্রথমে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ৮ এপ্রিল মোবাইল ট্র্যাক করে সিলেটের কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে শুয়াইবুর রহমান সুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ছুরি, বিষের বোতল ও রক্তমাখা কাপড় উদ্ধার করে। বাতিরকান্দি হাওর থেকে ইমনের মাথার খুলি ও হাতের হাড় উদ্ধার করে এবং জড়িত সন্দেহে মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করে।

মামলার প্রায় সাড়ে সাত মাস পর ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর সাতজনকে অভিযুক্ত করে সুনামগঞ্জ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন ছাতক থানার তখনকার তদন্তকারী কর্মকর্তা মঞ্জুর মুর্শেদ। চার্জ গঠনের সময় অভিযুক্তদের মধ্যে বাচ্চু, কাহার ও নুরুল আমিনকে বাদ দেন আদালত। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। গত ২৪ জানুয়ারি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত। মামলার রায় ও পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে শিশু ইমনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা পেলেও শিশুটি আসামিদের চিনে ফেলায় তাকে বিষ প্রয়োগের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। মরদেহ গুম করতে মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

রায় কার্যকরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি রায় দ্রুত কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন নিহত ইমনের বাবা জহুর আলী। তিনি সমকালকে বলেন, আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। সেজন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার ছেলের মতো যেন আর কোনো শিশুর এমন পরিণতি না হয়, সেই প্রত্যাশা করি।

গতকাল মামলার রায় ঘোষণা শেষে সমকাল সিলেট ব্যুরোতে এসে এক প্রতিক্রিয়ায় জহুর আলী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, মামলার বাদী নয়, একজন বাবা হিসেবে যা করার তাই করেছি। মামলাটি সুনামগঞ্জ আদালত থেকে সরকারের নজরে এনেছি। সরকারের নির্দেশে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে এসেছি। অনেক আগেই বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। মধ্যখানে এক বছর মামলার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেরিতে রায় হয়েছে।