বাংলাদেশের জঙ্গি দমন সক্ষমতায় অবাক বিশ্ব

সাদেকুর রহমান:রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজেন রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ২০১৬ সালের পহেলা জুলাইয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনার ঝড় তোলে। আইএস এর পতাকাধারী জঙ্গিরা হোলি আর্টিজেনে হামলা চালিয়ে বড়ো ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটালে শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী চলমান অভিযান আরও জোরদার করা হয়। নিরাপত্তাবাহিনীর একের পর এক অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত ও দেড় শতাধিক আটক হয়। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও উদ্ধার করা হয়েছে। জঙ্গিবিরোধী সর্বশেষ অভিযানটি পরিচালিত হয় নরসিংদী জেলার মাধবদীতে। মাধবদী এলাকার নিলুফা ভবনে চলতি বছর অক্টোবরের ১৫-১৭ তারিখ আইনশৃংখলাবাহিনী ৩৬ ঘণ্টার অভিযান চালায়। এই অভিযানের শুরুতেই দুই জঙ্গি নিহত হয়। আর আত্মসমর্পণের পর অপর দুই নারী জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। একই যোগসূত্রতা থাকায় নিলুফা ভবনে অভিযান শেষে শেখেরচরে সাত তলাবিশিষ্ট একটি বাড়িতে অভিযান চালায় বিশেষ ইউনিট সোয়াট, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিসিটিসি), ল’ ফুল ইন্টারসেপশন ইউনিট (এলআইসি), জেলা পুলিশ ও র‍্যাব । শেখেরচরের ভবনটির যে ফ্লোরে জঙ্গিরা অবস্থান করে তার দেয়ালে আল্লাহু, দাওলাতুল ইসলাম ও আইএস লেখা ছিল।

জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যদের দ্বারা হোলি আর্টিজেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিলেও সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশের মধ্য থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের শেকড় উৎপাটন করা সম্ভব হয়েছে। একই বছর দেশের কয়েকটি স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার অবসানকল্পে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের সম্মুখীন করা হয়। ২০০৯-’১৩ সালে মহাজোট সরকারের আমলে ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধধর্মীয় পুরোহিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, ভিন্নমতের ইসলামি ভাবধারার অনুসারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিদেশিদের ওপর একের পর এক হামলা বর্তমান সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
সরকারকে জঙ্গিবাদ দমনে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

এসব হামলার অনেকগুলোয় দায় স্বীকার করে আইএস ও আল কায়েদার নামে বার্তা এলেও সরকার তা বরাবরই দৃঢ়তার সাথে নাকচ করে দিয়ে বলেছে, অভ্যন্তরীণ জঙ্গিরাই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ‘ক্ষুণ্ন’ এবং সরকারকে সমস্যায় ফেলতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানায়। এসব হত্যাকাণ্ডের সাথে জেএমবি, নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল-ইসলাম, হরকাতুল-জিহাদ-আল-ইসলাম (হুজি-বি), হিজবুত তাহরির বাংলাদেশ এবং নতুন আবির্ভূত আল মুজাহিদ এর সম্পৃক্ততা কথা জানতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।

“দেশের অগ্রগতি ও নিরাপত্তার জন্য সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বড়ো ধরনের অন্তরায়। সরকার তাই জঙ্গি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জঙ্গি দমনে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।”-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই সগর্বে এ কথাটি বলে থাকেন। শুধু যে দেশের অভ্যন্তরে বলে থাকেন তা নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ দৃঢ়তার সাথে তাঁর সরকারের জঙ্গি দমন সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের জঙ্গি দমন সক্ষমতায় রীতিমতো অবাক সারা বিশ্ব। কারণ অনেক বড়ো বড়ো দেশই জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।

হোলি আর্টিজেনের ঘটনার পর ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অভিযানে নিহত হয় ৯ জন জঙ্গি। একই বছর ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার একটি বাড়িতে পুলিশের অভিযানে তিন জঙ্গি নিহত হয়। ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার একটি বাড়ির ছয়তলার বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের ওপর হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলে নিহত হয় একজন জঙ্গি। ১০ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময়ে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেন তানভীর কাদেরী নামের এক জঙ্গি। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার করা হয় তার স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ও এক ছেলেকে। ৮ অক্টোবর গাজীপুরের পাতারটেক ও টাঙ্গাইল এলাকায় পৃথক জঙ্গি আস্তানায় যৌথবাহিনীর অভিযানে সন্দেহভাজন ১১ জঙ্গি নিহত হয়। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে রাজধানীর দক্ষিনখান থানার পূর্ব আশকোনার ৫০ নম্বর বাড়ির সূর্য ভিলায় অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিট। এই অভিযানে নিহত হয় আজিমপুরে আত্মহত্যাকারী জঙ্গি তানভীর কাদেরীর ১৪ বছর বয়সি ছেলে আফিফ কাদেরী আদর এবং শাকিরা নামের ৩৫ বছর বয়সি এক নারী জঙ্গি।

জঙ্গি দমনে সরকার কাউণ্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট গঠন করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর বেশ কিছু সফল অভিযান পরিচালনার ফলে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিনেতাসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেফতার ও নিহত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলা-বারুদ উদ্ধার হয়েছে। হোলি আর্টিজেন হামলার পর এ যাবৎ যতগুলো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে তার সবগুলো থেকেই জঙ্গিগোষ্ঠী আঘাত হানার পূর্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং জঙ্গি আস্তানাসমূহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ প্রো-অ্যাক্টিভ পুলিশিং এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অভিযানসমূহ পরিচালনার ফলে বর্তমানে জঙ্গি তৎপরতা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং জঙ্গি দমনে এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করেছে।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জেড,আই