সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব কেন দাসত্ব করবে

অনলাইন ডেস্ক: সাইফ শোভন

১৯৭১-এ বাঙালি রক্তনদী পাড়ি দিয়ে বিজয় অর্জন করেছে। জালেম-মাজলুমের এ লড়াই মানবসভ্যতার শুরু থেকেই।

আধিপত্যবাদীরা তাদের শক্তির জোরে দুর্বলকে পরাজিত করতে চায়, কিন্তু মাজলুমানের মুক্তির প্রেরণা রুখে দেয় সাম্রাজ্যবাদীদের সব চক্রান্ত।

রক্তস্নাত কারবালা প্রান্তর আজও বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা হয়ে আছে। সেদিন সমরশক্তিতে ক্ষণিকের জন্য ইয়াজিদী বাহিনী বিজয়োল্লাস করলেও আসল জয় হয়েছে মাজলুম হুসাইন (রা.)-এর।

হৃদয়রাজ্যে মানুষ গেঁথে নিয়েছে হুসাইনি প্রেমের মালা। পৃথিবীতে হুসাইন নামে আজও লাখো প্রেমিক কাঁদে, ঘৃণায় ইয়াজিদ নামটি কেউ উচ্চারণ করে না। তেমনি প্রতি যুগেই সবল-দুর্বলের লড়াই হয়।

অস্ত্রশস্ত্রে দুর্বল হলেও সত্যান্বেষীরা লড়ে যায় ইমানের শক্তিতে। ১৯৭১-এ বাঙালির কাছে তেমন অস্ত্র ছিল না, ছিল না যুদ্ধের আধুনিক সরঞ্জামাদিও, কিন্তু বুকভরা প্রত্যয় ছিল। সাহস ছিল দুর্নিবার।

যত কষ্টই হোক, অসত্যের সামনে মাথা নত না করার ছিল দৃঢ় অঙ্গিকার। এ সৎ সাহস ও দৃঢ় প্রত্যয়ই মুক্তি এনে দিয়েছে বাঙালির।

ইসলামে স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহর প্রেরীত নবী রাসূলরা মানুষকে বিজয় ও স্বাধীনতার প্রকৃত স্বরূপ উপলদ্ধি করিয়েছেন। মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব কখনও সৃষ্টির দাসত্ব করতে পারে না। কিন্তু নববী শিক্ষা ভুলে মানুষ তার নিজ হাতে প্রভু তৈরি করল। অথবা শক্তিমান কাউকে নিজেদের উপাস্য মনে করত।

নবীরা এসে মানবজাতিকে এ বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন, দাসত্ব কেবল আল্লাহর জন্য। একজন মানুষের মাথা পৃথিবীর কারও সামনে নত হতে পারে না।

ইসলামে মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রথম স্বরূপ হল মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব মুক্ত করে স্রষ্টার উপাসনায় আবদ্ধ করা। মানুষ যখন সৃষ্টির দাসত্ব মুক্ত হবে, তখনই তার বিবেকবুদ্ধি সুস্থপথে পরিচালিত হবে। খুলে যাবে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

ইতিহাস লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাব, অতীতে মানুষ যখন বিভিন্ন প্রতিমা, দেব-দেবী ও রাজা-বাদশাহর উপাসনায় লিপ্ত ছিল, তখন তাদের মানবিক গুণাবলিও হারিয়ে গিয়েছিল। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ দাসত্বের জীবনযাপন করত।

মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন শক্তি। গোটা বিশ্ব আবদ্ধ ছিল পাশবিকতার জিঞ্জিরে। নববী আদর্শ মানবতাকে মুক্ত করল এ জিঞ্জির থেকে। মানুষ উপলদ্ধি করল স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ।

মানবতা বলিষ্ঠকরণ ছিল নবীদের প্রধান মেহনত। কারণ আত্মার বলিষ্ঠতা ছাড়া স্বাধীনতা উপলদ্ধি করা যায় না। ১৯৭১-এ বলিষ্ঠ আত্মার মানুষরাই জেগে উঠেছিল। গোলামির জিঞ্জির চূর্ণ করার শক্তি ছিল তাদের মনে।

এক সাহসী কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছিল, ‘তোমাদের যার যা আছে, তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, আরও দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ’।

এমন ঘোষণা কোনো কাপুরুষের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এ সাহসের উৎস ছিল বিশ্বাসে পূর্ণ ইমান। দৃঢ়প্রত্যয়ী এ ‘ইনশাআল্লাহ’র শক্তিতেই বাঙালি বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। বিজয় শুধু অর্জনের নাম নয়, অর্জিত স্বাধীনতাকে ধরে রাখা এবং এর সুফল বিস্তারই প্রকৃত বিজয়। নিজেদের আদর্শ-বিশ্বাস, চিন্তাচেতনার লালনই বিজয়ের শক্তিকে পূর্ণতা দেয়।

অন্যথায় ভৌগলিক স্বাধীনতা থাকলেও মানসিকভাবে অন্যের দাসত্ব করতে হয়। বিজ্ঞানের এ যুগে ভৌগলিক স্বাধীনতার চেয়ে চিন্তার স্বাধীনতা অনেকাংশে মুখ্য হয়ে উঠেছে।

বিজাতীয় সভ্যতা ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব এখন তরুণ সমাজকে গ্রাস করে চলেছে প্রতিনিয়ত। জন্মসূত্রে এ দেশের হলেও অনেকেই ভালোবাসে ভিন্ন কালচারকে। স্বদেশের চেয়ে অন্য দেশের ভালোবাসা অনেকের মনেই চেতনে-অবচেতনে হানা দেয়।

বিজয়ের ৪৭ বছর পূর্তিতে এটিই আমাদের ভাবতে হবে। বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তুলতে হবে আমাদের প্রতিটি কাজে। দেশপ্রেমের কথা শুধু মুখে নয়, কাজেকর্মে হতে হবে।

ঢাকানিউজ২৪.কম/এসএস