আলোচিত ছিল দেশের ব্যাংক খাত

সিনিয়র রিপোর্টার: বছর জুড়ে নানা ঘটনায় আলোচিত ছিল দেশের ব্যাংক খাত। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, স্বর্ণ কেলেঙ্কারি, নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে আলোচনায় ছিল ব্যাংক খাত। এসব ঘটনার মাঝেও নতুন অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ও নতুন দুটি ব্যাংকের অনুমোদন দেশের ব্যাংক খাতকে আরো শক্তিশালী করবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তবে ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেড়েছে রেমিট্যান্স:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কয়েক বছর ধরেই রেমিট্যান্সের ধারা ইতিবাচক। চলতি বছরেও এ ধারা অব্যাহত ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসীরা ৫১০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৫০৯ কোটি ৫৭ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে অক্টোবর মাসে এসেছে ১২৩ কোটি ৯১ লাখ ডলার।

গত বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে বাংলাদেশে ৪৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। সে হিসাবে চার মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে এই অক্টোবর রেমিট্যান্স বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ বেড়েছে
পুনঃতফসিল ও অবলোপন করে গত বছরের শেষদিকে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমিয়ে এনেছিল দেশের ব্যাংকগুলো। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায়। জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ যুক্ত হয়েছে খেলাপির খাতায়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায়-অযোগ্য হয়ে পড়ায় গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলাভুক্ত হয়েছে ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকার অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ। এ ঋণ যোগ করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার বেশি।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ বেড়েছে ৬০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বরে দেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৪২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। ছয় মাস আগে এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা বিতরণকৃত ঋণের ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।

২০১৮ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৩৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ছয় মাস আগে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুন শেষে বিদেশী ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৩৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ছয় মাস আগে বিদেশী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা।

এ সময়ে সরকারি মালিকানার দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৫ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যা ব্যাংক দুটির বিতরণকৃত ঋণের ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

স্বর্ণ কেলেঙ্কারি
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা ৯৬৩ কেজি সোনায় অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে প্রতিবেদন দেয় এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে এনবিআর চিঠিও পাঠায়।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি সোনা পরীক্ষা করে বেশিরভাগের ক্ষেত্রে এ অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টম হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট) বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ সোনা (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)।

প্রতিবেদন আরো বলা হয়, ভল্টে থাকা সোনার চাকতি এবং আংটি পরীক্ষার পর দেখা যায় এগুলো সোনার নয়, অন্য ধাতুর মিশ্রণে তৈরি। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে। পরিদর্শনদল প্রতিটি রসিদের অনুকূলে জমা হওয়া সোনা যাচাই করেছে। তাতে দেখা গেছে, সোনার অলংকার এবং সোনার বারে ক্যারেটের তারতম্য করা হয়েছে। ২৪ থেকে ২০ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি সোনার বেশিরভাগের ক্ষেত্রে ভল্টে ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। কম ক্যারেটে নথিভুক্ত থাকায় নিলাম বা অন্য উপায়ে বিক্রির সময় অতিরিক্ত ক্যারেটের বিপরীতে প্রাপ্য টাকা থেকে সরকার বঞ্চিত হবে।

তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে, বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ভল্টে রক্ষিত সোনায় কোনো ধরনের হেরফের হয়নি। স্বর্ণকারের ভুলে ভাষার গণ্ডগোলে ৪০ হয়ে গেছে ‘এইটটি’। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রুটি বলতে যা আছে, নথিভুক্ত করার সময় ইংরেজি-বাংলার ভুল। এর বাইরে অন্য ত্রুটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর যেভাবে ভল্টে সোনা রেখেছিল, তা সেভাবেই রয়েছে বলেও জানান হয় সংবাদ সম্মেলনে।

নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে ব্যর্থতা
খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এই তালিকায় সরকারি খাতের চারটি ও বেসরকারি খাতের আটটি ব্যাংকের নাম রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস শেষে এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৮৩৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৯ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর বাইরে রাইট অফ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার মতো। এসব ঋণ খেলাপি হলেও তা খেলাপি দেখাতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতির শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৪৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এরপরই রয়েছে সোনালী ব্যাংক। সেপ্টেম্বর শেষে এই ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৬৬ কোটি ৮১ লাখ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের মধ্যে এবি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের ৪২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঘাটতি ৯৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬১ কোটি ৪১ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৯৬ কোটি ৭১ লাখ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১০২ কোটি ২৯ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৬২ কোটি ২১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বেসরকারি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫২০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভিশন ঘাটতির কারণে শুধু ব্যাংকই যে বিপাকে পড়ছে তা নয়, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও বিপদ। সাধারণত কোনো ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিলে মূলধনেও টান পড়ে। আর মূলধন ঘাটতিতে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ওই ব্যাংক বছর শেষে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দিতে পারে না।

নতুন দুই ব্যাংক
সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক নামে দুটি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।