বিএনপিতে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি থাকায় দল ছেড়েছি: ইনাম আহমদ চৌধুরী

নিউজ ডেস্কঃবিএনপির হাইকমান্ডের কাছে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি থাকা এবং যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় দল ছেড়েছি,বলে জানিয়েছেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক উইংয়ের প্রধান ড. ইনাম আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আঠারো বছর বিএনপির জন্য আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেও তার মতামতের যথাযোগ্য স্বীকৃতি মেলেনি। ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে তার চেয়ে কম গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েই তা বুঝিয়ে দিয়েছেন দলের হাইকমান্ড। তার যোগ্যতা মূল্যায়ন না করে তুলনামূলক একজন নবাগত প্রার্থীকে সিলেট-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শুধু তাকে নয়, সিলেটবাসী ও রাজনৈতিক সচেতন অনেককেই বিস্মিত ও মর্মাহত করেছে। তিনি জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সিলেটে অর্থমন্ত্রী আবদুল মাল আবদুল মুহিতের বাসভবনে যাওয়ার বিষয়টিও দল ভালোভাবে নেয়নি। তিনি বলেন, আস্থা, বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব আমাকে বিশেষভাবে পীড়া দিচ্ছিল। এসব কারণে দল ত্যাগ করতে সিদ্ধান্ত নিই। পদত্যাগের চিঠিতে আস্থা এবং বিশ্বাসের ঘাটতি কেন হলো এবং কেন মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণযোগ্য ছিল না- এ বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বনানীর বাসভবনে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ইনাম আহমদ চৌধুরী। বুধবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফুল তুলে দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যান। সাবেক সচিব ও কূটনীতিক, জাতিসংঘ, আইডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থায় উচ্চপদে চাকরির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার শেষ করে ১৮ বছর আগে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও চূড়ান্ত মনোনয়নে বঞ্চিত হন। মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরকে। সাক্ষাৎকারে চাকরিজীবন, বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং আওয়ামী লীগে যোগদানের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দেন তিনি। অবশ্য স্পর্শকাতর কিছু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়েও যান।

বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি জানান, দেশের উন্নয়ন ও জনগণের সেবার কাজে শামিল হওয়ার আগ্রহ থেকে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অবসর নিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। দীর্ঘদিন সরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে দু’বছর চাকরির মেয়াদ থাকার পরও অবসর নিয়ে চলে আসেন। দেশে এসে প্রথমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু করেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংশ্নিষ্টতা ছাড়া উন্নয়ন প্রয়াস বেশি ফলপ্রসূ হয় না। সে জন্যই তখন তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।

ইনাম আহমদ চৌধুরী জানান, ২০০১ সালের নির্বাচনেও তাকে মনোনয়ন না দিয়ে অবমূল্যায়িত করা হয়। পরে তাকে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতকে উন্নয়নের জন্য প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ওয়ান-ইলেভেনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দল ভেঙে অন্য দলে যোগ দেওয়ার জন্য আমার ওপর খুব চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। চাপ অগ্রাহ্য করে দল ছাড়িনি। তারপরও ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। পরে দলীয় কাউন্সিলে আমাকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। একইসঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্কিত কমিটির প্রথমে সদস্য ও পরে প্রধান করা হয়।

তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনেও অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তুলনায় সার্বিক বিবেচনায় তার যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি ছিল। এটা শুধু তার কথা নয়, সিলেটবাসীর ভাষ্য। সিলেটবাসীর উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সমর্থনে তিনি সিলেট-১ আসনে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দল প্রাথমিকভাবে মনোনয়নও দেয়। কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়নের সময় তুলনামূলক একজন নবাগত প্রার্থীকে দেওয়া হয়। বিষয়টি শুধু তাকে নয়, সিলেটবাসী ও রাজনৈতিক সচেতন অনেককেই বিস্মিত ও মর্মাহত করেছে। অথচ এর কোনো কারণ তাকে জানানো হয়নি। জানার চেষ্টা করেও জানতে পারিনি। বুঝতে পেরেছি যে, আমার দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপির উচ্চমহলে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। আমার নিষ্ঠা, সততা ও পারদর্শিতা সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ ছিল না। তবুও দীর্ঘকাল এই স্বীকৃতির অনুপস্থিতিতে কিছুটা হতাশ হলাম। আমার চিন্তাধারা ও বিশ্বাস হচ্ছে আইনের শাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রীতি ও সমঝোতা ও সমর্মিতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। আমার মনে হতো, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল এবং লাখ লাখ মানুষ শহীদ ও মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমহানি হয়েছিল- এ সম্পর্কে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। আমার এ দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ দলের ঊর্ধ্বতন মহলে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এর প্রতিফলনই দেখতে পাই বারবার। এসব কারণে আমি বিএনপি ত্যাগ করতে মনস্থির করি।

সিলেট-১ আসনে মনোনয়নপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে বললে ইনাম আহমদ চৌধুরী বলেন, তাকে আমি সজ্জন বলেই জানি। একটি ঘটনা আমাকে মর্মাহত করেছিল- মনোনয়ন প্রাপ্তির পরে যমুনা টিভিতে একটি সাক্ষাৎকারে আবদুল মুক্তাদীর আমার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি সিলেটবাসী নন’। তার এই বক্তব্য সদাচারবহির্ভূত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করি। তবুও তাকে আমি শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তার মূল্যায়ন ভোটাররাই করবেন।

সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এ কে আবদুল মোমেন সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে ইনাম আহমদ বলেন, তাকে আমি দীর্ঘকাল ধরে চিনি। তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে রাজনীতিতে প্রবেশ করে তার ভূমিকা তিনি পালন করতে চান। তার সুখ্যাতি রয়েছে। তাকেও আমি আন্তরিকভাবে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সিলেট-১ মর্যাদাপূর্ণ আসনের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা তার আছে বলে মনে করি। এ কে আবদুল মোমেনের নির্বাচনী প্রচারে সিলেট যাবেন কি না- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি। প্রয়োজন হলে যেতে পারি।

দীর্ঘদিন জিয়াউর রহমানের আদর্শে থেকে রাজনীতি ও লেখালেখি করার পর হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে যোগ দেওয়ায় সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হবে কি না- প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই বর্ষীয়ান আমলা বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পার্থক্য খুব সামান্য। সম্প্রতি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একটি নিবন্ধে লিখেছেন- বস্তুতপক্ষে দলগুলোর পার্থক্য অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের কোনো সংঘাত নেই। বস্তুতপক্ষে তিনি জাতির জনক এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত করা হয়েছে। কাজেই এসব ব্যাপারে কোনো সাংঘর্ষিকতা লক্ষ্য করছি না।

আওয়ামী লীগ থেকে মূল্যায়নের কোনো আশ্বাস পেয়ে যোগ দিয়েছেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কী কাজে লাগতে পারি সেটা ভবিষ্যৎই বলতে পারে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণে যে মহান উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে এসেছেন। তার বহু সাফল্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। তিনি সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ডিজিটালাইজেশন ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব সাফল্য এনেছেন। তার কাজের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে সেটার সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

দল ত্যাগের আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না- জানতে চাইলে ইনাম আহমদ চৌধুরী বলেন, কোনো আলাপ হয়নি। আমার বর্তমান উপলব্ধি বিস্তারিতভাবে অবহিত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং মহাসচিব বরাবর পদত্যাগপত্র দিয়েছি। ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জেড,আই