বিএনপি লড়বে আড়াইশ’ বাকিগুলোতে ঐক্যফ্রন্টসহ শরিকরা

নিউজ ডেস্ক:  বিকল্প প্রার্থীদের সরিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২০৬ আসনে দলের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। দরকষাকষির শেষ পর্যায়ে এসেও জোটের শরিকসহ নানা কারণে জটিলতাপূর্ণ আসন বাদ রেখেই এই আংশিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে হলো তাদের। গতকাল শুক্রবার বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শনিবার বাকি ৯৪ আসনে দলের এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তিন আসনে প্রাথমিকভাবে বিকল্প প্রার্থীকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হলেও গতকাল চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি।

২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তদের বেশিরভাগ নেতা ও সাবেক এমপিকে এবারও মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। মৃত্যুবরণ, নিষ্ফ্ক্রিয়তা, মামলা, ঋণখেলাপি, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থতাসহ নানা কারণে অর্ধশতাধিক আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন নতুন মুখ। এর মধ্যে সাবেক এমপিদের স্ত্রী ও সন্তানরা প্রাধান্য পেয়েছেন। আবার বেশকিছু তরুণ মুখসহ শিল্পীকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি।

বিএনপির ঘোষিত তালিকায় বিগত দিনের অনেক পরিচিত মুখ এবার দেখা যায়নি। বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ এবং মামলা জটিলতার কারণে তারা ভোটযুদ্ধে নামতে পারেননি। এর মধ্যে বয়সের কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন না দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। এ ছাড়া বিদেশে থাকা, মামলা, ঋণ ও বিলখেলাপি জটিলতা ইত্যাদির কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, এম মোর্শেদ খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আবদুস সালাম পিন্টু, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, ড. ওসমান ফারুক ও মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।

অন্যদিকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও বিদেশে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন না করার কারণে তিনি ভোটে নেই। দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেও তা জমা দেননি।

এ ছাড়া ঘোষিত তালিকায় ১০৬ জন নতুন মুখ রয়েছে। যারা ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। তবে এর মধ্যে পঞ্চাশ জনের মতো নেতা বিগত দিনে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, অনেকে এমপি নির্বাচিতও হয়েছিলেন। বাকিরা একেবারে নতুন মুখ। তালিকায় ৯ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে রংপুর-৩ আসনে রিটা রহমান, নাটোর-১ কামরুন্নাহার, নাটোর-২ সাবিনা ইয়াসিমন ছবি, সিরাজগঞ্জ-১ রুমানা মোরশেদ কনকচাঁপা, ঝালকাঠি-২ জেবা আমিন খান, শেরপুর-১ ডা. সানসিলা জেবরিন, নেত্রকোনা-৪ তাহমিনা জামান, ফরিদপুর-২ শামা ওবায়েদ এবং কক্সবাজার-১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন হাসিনা আহমেদ।

জোটের আসন বণ্টনের সমঝোতা সম্পন্ন করতে না পারায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী তালিকা পুরানা পল্টনের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে গতকাল বিকেল ৩টায় ঘোষণা করার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী বিবেচনায় রাখতে গিয়ে শরিক দলগুলোকে তাদের দাবি অনুযায়ী আসন ছাড়তে রাজি হচ্ছে না বিএনপি। গতকাল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের প্রার্থীকে ‘যোগ্য’ দাবি করে অনড় অবস্থানে থেকে দরকষাকষি করছে শরিকরা।

প্রার্থী ঘোষণাকালে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে আমরা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। গণতান্ত্রিক অন্দোলন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা এই নির্বাচনে আছি।

প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও চূড়ান্ত মনোনয়নে বাদ পড়েছেন বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট বিএনপি নেতা। তাদের অন্যতম হলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, সেলিমা রহমান, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। মিলন বহুসংখ্যক রাজনৈতিক মামলার আসামি হয়ে কারাগারে রয়েছেন। চাঁদপুর-১ আসনে এহছানুল হক মিলন মনোনয়ন না পাওয়ায় তার স্ত্রী সাবেক মহিলা দলের নেত্রী নাজমুন নাহার বেবি বলেন, দলের জন্য যারা কাজ করেছেন তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের কোনো সদস্য মনোনয়ন না পাওয়ায় গুলশান কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন তার সেজ ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুর অনুসারীরা। ডাবলুর আসন ছিল মানিকগঞ্জ-১, যেখানে মনোনয়ন পেয়েছেন এস এ কবির জিন্নাহ। এ ছাড়া দলের বিশেষ সম্পাদক নাদিম মোস্তফা, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাবউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন নিজান, লায়ন হারুন অর রশিদ, নাজিমউদ্দিন ও ইলেন ভুট্টো বাদ পড়েছেন এ তালিকা থেকে।

তালিকায় সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন মনোনয়ন পেয়েছেন। এর মধ্যে বরিশাল-১ আসনে জহির উদ্দিন স্বপন, নওগাঁ-৬ আলমগীর কবির, যশোর-১ মফিকুল হাসান তৃপ্তি, নরসিংদী-৪ সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, বগুড়া-৫ গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, সুনামগঞ্জ-১ নজির হোসেন অন্যতম।

প্রার্থী ঘোষণার সময় বিএনপি মহাসচিবের পাশে ছিলেন চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার। সংবাদ সম্মেলন চলাকালে চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি পেতে কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষায় ছিলেন বিএনপির প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। কার্যালয়ের বাইরে স্লোগান দেন দলের নেতাকর্মীরা। একদিকে চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রাপ্তদের সমর্থকরা উল্লাস প্রকাশ করেন, অন্যদিকে মনোনয়নবঞ্চিতদের অনুসারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে স্লোগান দেন।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছর এবং জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের দ নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসনে তার মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আজ শনিবার নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানি হবে। ওইসব আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন দিলেও গতকাল চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি।

জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বাকি ৯৪ জন প্রার্থীর ব্যাপারে মির্জা ফখরুল বলেন, আপিলের শুনানিতে যারা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন, তাদের থেকে এবং ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা করে শনিবার বাকি আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। শুক্রবার ঘোষিত ২০৬ জনের নাম বিএনপির মনোনয়ন বোর্ড অর্থাৎ দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করেছেন বলে জানান মহাসচিব।

অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধে মামলা থাকায় বিএনপি এবার নির্বাচনী কৌশল হিসেবে ৩০০ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছিল ৬৯৬ জনকে। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে তাদের মধ্যে ৫৫৫ জনের মনোনয়ন বৈধ হয়। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া ১৪১ প্রার্থীর মধ্যে বৃহস্পতি ও শুক্রবার আপিলে অর্ধশতাধিক বিএনপি নেতা প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। আজ শনিবার শুনানি শেষ হলে তাদের সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।

আগামীকাল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখের আগেই ৩০০ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে।

শেষ মুহূর্তেও চলছে দরকষাকষি :শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিএনপিকে। প্রত্যেক শরিক দলই নিজেদের প্রার্থীকে ‘যোগ্য’ দাবি করছেন। এ পরিস্থিতিতে গতকালও শরিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। শরিকদের শেষ পর্যন্ত ৫০টির মতো আসন ছাড়তে চাইছে বিএনপি।

আংশিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশের আগে গতকাল দুপুরে জোট শরিক গণফোরামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু ও নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর সঙ্গে দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। এমনকি রাতেও দ্বিতীয় দফায় জোটের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে আবার বৈঠক করেন বিএনপি শীর্ষ নেতারা।

বিএনপি সূত্র জানায়, আসন বণ্টন নিয়ে ২০ দলীয় জোটের থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সমস্যা বেশি হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য পঞ্চাশের বেশি আসন চাইছে। এর মধ্যে গণফোরামের চাহিদা বেশি।

সূত্র আরও জানায়, আগামী নির্বাচনকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয় বলে মনে করছে বিএনপি। নির্বাচনে জয়ের জন্য জনপ্রিয় ও দক্ষ নেতাকে মনোনয়ন দিতে চায় তারা। প্রয়োজনে নির্বাচিত হতে পারলে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিক দলকে গুরুত্ব দিতে চায় তারা। কিন্তু আবেগের বশে কাউকে মনোনয়ন দিয়ে ঝুঁকি নিতে নারাজ বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল সমকালকে বলেন, আসন বণ্টনের বিষয়টি সমাধানের চূড়ান্ত পথে। শনিবার ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।