আমার জীবন দর্শন

যতীন সরকার:   সদ্য পুরস্কারপ্রাপ্ত আমার এই ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই-উতরাই’ গ্রন্থের ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই-উতরাই :দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে’ নামে যে প্রথম প্রবন্ধটি; এটি আমার জীবনদর্শনেরই অংশ। দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ; সাধারণভাবে যা মার্কসবাদ বা মার্কসীয় দর্শনরূপে পরিচিত, সেটিই আমার জীবনদর্শন। এই দর্শনের আলোকেই জীবন ও জগতের সবকিছু আমি অবলোকন করতে চাই। কিন্তু চাইলেই যে অতি সহজে সেটি করা চলে না- সর্বদাই মর্মে মর্মে তা অনুভব করি। বিশেষ করে অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্নিষ্ট নয় যেসব বিষয়, সেসব বিষয়ের ওপর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তথা মার্কসবাদের আলোর প্রক্ষেপণ ঘটাতে গেলে খুবই মুশকিলে পড়তে হয়। মার্কসবাদকে তো এক সময় ‘অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ’ [ইকোনমিক ডিটারমিনিজম] বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। অর্থনীতির বাইরে অন্য কিছুর সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পৃক্ততার কথা অনেকেই ভাবতে পারতেন না। এ ব্যাপারে মার্কসবাদের স্রষ্টা ও প্রবক্তারাও যে অনেকাংশে দায়ী; স্বয়ং এঙ্গেলসই তা কবুল করেছেন।

‘অর্থনীতিই সমাজের একমাত্র নিয়ামক শক্তি’- মার্কস, এঙ্গেলস বা লেনিন কেউই যদিও কখনো এমন কথা বলেননি, তবু মার্কস-এঙ্গেলসের জীবৎকালেই এমন ধারণার বিস্তার ঘটে গিয়েছিল যে, মার্কসবাদের দোহাই দিয়েই অনেকে সমাজ-বিশ্নেষণে অর্থনীতি ছাড়া আর সবকিছু থেকেই মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন। এ বিষয়টি সম্পর্কে একটি চিঠিতে আত্মসমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এঙ্গেলস লিখেছিলেন- ‘তরুণরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দিকটির প্রতি যে প্রয়োজনাতিরিক্তি গুরুত্ব আরোপ করেছে, তার জন্য আংশিকভাবে মার্কস ও আমিই দায়ী।’

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কার্যকর দর্শন লেনিনবাদ উদ্ভবের আগেই মানুষের মনের বাস্তব ভিত্তিটি আবিস্কার করেছিলেন রুশ বিজ্ঞানী সেচেনভ। উনিশ শতকে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে সেচেনভ-লিখিত ‘মস্তিস্কের পরাবর্ত’ নামক নিরীহ একটি শারীরবিদ্যার বইয়ে যে বৈপ্লবিক চিন্তার অগ্নিস্ম্ফুলিঙ্গ নিহিত ছিল, সে কথা অত্যাচারী জার প্রশাসন ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। তাই তারা বইটিকে বাজেয়াপ্ত করে। লেনিনই সেচেনভের বইটির যথাযথ তাৎপর্য অনুধাবন করেছিলেন। সেচেনভের উত্তরসাধক ইভান পেত্রভিচ পাভলভ মনোবিদ্যাকে দ্বান্দ্ব্বিক বস্তুবাদ-সমর্থিত যথার্থ বিজ্ঞানে পরিণত করলেন বিশ শতকের প্রথম পর্বেই। লেনিন পাভলভের অবদানেরও স্বরূপ অবহিত হয়েছিলেন। পাভলভের সুহৃদ ও শিষ্য-প্রশিষ্যদের হাতে নানান চড়াই-উতরাই বেয়ে এবং পাভলভীয় তত্ত্বের অনেক অসঙ্গতি ও অসম্পূর্ণতা সংশোধিত ও দূরীভূত হয়ে দ্বান্দ্ব্বিক বস্তুবাদভিত্তিক মনোবিজ্ঞান ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে।

কিন্তু অসমাজতন্ত্রী দেশগুলোতে পাভলভের আবিস্কারের তাৎপর্য মোটেই উপলব্ধ হলো না। বুর্জোয়া শিক্ষাবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা পাভলভীয় তত্ত্বকে আমেরিকায় উদ্ভূত বিহেভিয়ারিজম (আচরণবাদ বা ব্যবহারবাদ) নামক একটি ভয়াবহ যান্ত্রিক মতবাদের সঙ্গে একীভূত করে ফেলেন। পাভলভীয় তত্ত্বভিত্তিক মনোবিজ্ঞান ফ্রয়েডীয় আত্মমুখী তথা ভাববাদী মনস্তত্ত্বকে যেমন ফুটো করে দিয়েছে, তেমনি যান্ত্রিক বস্তুবাদী বিহেভিয়ারিজমেরও বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগ ইতিহাস-ব্যাখ্যায় নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারে, বিপ্লবকে আরও বেশি তাৎপর্যমূর্ত করে তুলতে পারে, মানুষের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে একান্ত সহায়ক হতে পারে।

প্রত্যেকটি ভাবাদর্শের পেছনেই থাকে একটি সামাজিক ভিত্তিভূমি। আবার, এই সামাজিক ভিত্তিভূমিটিও কেবল উৎপাদন-শক্তি আর উৎপাদন সম্পর্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে যান্ত্রিক নিয়মে তৈরি হয়ে যায় না, কিংবা শ্রেণিসংগ্রামের কতগুলো বস্তুগত তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়েও এর উৎপত্তি ব্যাখ্যা দেওয়া চলে না। বহুকাল আগে রুশ দেশের মার্কসবাদী বিপ্লবী প্লেখানভ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন, ‘সমস্ত ভাবধারাই উৎপন্ন হয় সমকালীন মনস্তত্ত্বের এক অভিন্ন উৎস থেকে।’

মনস্তত্ত্বের এই অভিন্ন উৎসকে উপেক্ষা করার ফলেই কোনো ভাবাদর্শের সামাজিক ভিত্তিটিকে যেমন বোঝা যায় না, ভাবাদর্শের গুরুত্ব ও তাৎপর্যও তেমনি অনুপলব্ধ থাকে; এবং ভাবাদর্শেও স্বাভাবিক বিকাশ ও রূপান্তর কোনটি, আর কোনটিই-বা এর বিকার ও মায়ারূপ, তা-ও স্পষ্ট হয় না। এই অস্পষ্টতা থেকেই ভাবাদর্শ সম্পর্কে অতি সংবেদনার জন্য কেউ অতি কঠোর ও রক্ষণশীল, আর কেউ-বা তার বিপরীত। সব যুগে সব ভাবাদর্শ নিয়ে যেমন এমনটি ঘটেছে, আজও ঘটছে। মনে রাখা দরকার :রিলিজিয়নই হোক কিংবা অন্য যে কোনো ভাবাদর্শই হোক, সবকিছুরই স্রষ্টা সামাজিক মানুষ।

দুই.

ক্লাসে আমি ব্যাকরণ পড়িয়েছি, সিলেবাস পড়িয়েছি। সিলেবাসের বাইরে অতিরিক্ত ফর্মায় কথা বলে কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হইনি। কিন্তু ৪৫ মিনিটের ক্লাসে আমার আত্মগত অনুভবগুলোকে আমি বলতে পারিনি। আমার অনুভবগুলোকে নিংড়ে দেওয়ার জন্য আমি ‘মুক্ত বাতায়ন’ খুলেছি। লেখালেখি করেছি। বক্তৃতার বিপুল পরিসরে কিংবা ক্লাসরুমে বলতে না পারা কথাগুলো কিংবা লিখতে না পারা কথাগুলোই বলেছি। আমার জাগ্রত জীবনের সমগ্র কর্মটিই ‘আমার মাস্টারি’।

আরেকটা বিষয় আমি মনে করি, বাংলা সাহিত্য এত দীন না যে আমার মতো অধম লেখকের অনুপস্থিতিতে বাংলা ভাষা হাহাকার করবে। আমি শুধু মাস্টার হতে চেয়েছি। সারাজীবন মাস্টারি করেছি। ক্লাসে আমি সিলেবাস পড়িয়েছি। কর্তৃপক্ষ বিরাগ হতে পারেন- এই বিবেচনায় ক্লাসে সিলেবাসের বাইরে এক তুলা কথাও প্রকাশ করিনি। কিন্তু সময়, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি নিয়ে আমারও বলার কিছু আছে। যে সময়ের ভেতরে বসবাস করি সে সময়কে মানা-না মানার আমার নিজস্ব দৃষ্টি ও অভিজ্ঞান আছে। সেই কথাই আমি লিখি। আমার লেখালেখিই আমার মাস্টারি।

লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি কাউকেই অনুসরণ করিনি। গোপাল হালদার, রণেশ দাশগুপ্ত কিংবা সরদার ফজলুল করিম আমার মানস-চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন কিংবা এদের লেখালেখিও আমাকে প্রাণিত করেছে। কিন্তু লেখালেখির ক্ষেত্রে কাউকেই মডেল করিনি। জেলখানায় থাকাকালে একটা প্রত্যয় ঢুকেছিল যে, আমাকে লিখতে হবে। প্রতিদিন লিখতে হবে। সেই প্রেরণাতেই ডুবে আছি। প্রতিদিন এই নিয়ে আছি। কিন্তু কারও ভাবনা কিংবা লেখার কার্বন কপি আমি হতে চাইনি। আসলে কোনো ডু মার্কা লেখাই আমি লিখতে চাইনি। এমনও হয়েছে, আমি একটা লেখা লিখতে শুরু করেছি; কেউ এসে বললেন, এই বিষয়ে তো উনি লিখেছেন। সাথে সাথে আমি লেখা থামিয়ে দিয়েছি। ওই লেখকের বইটা পড়ার পর আমি যদি মনে করি আমার বলার নতুন কথা আছে, তবেই আমি সেই বিষয়টা নিয়ে লিখেছি।

আমি দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছি। আমি জানি, ব্যক্তিগতভাবে দারিদ্র্য দূর করা যায় না। এই বিষয়ে আমি শুরু থেকেই সচেতন ছিলাম। তাই পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য নির্মূলের যে-দর্শন সেটাকেই আমি জীবনদর্শন রূপে গ্রহণ করেছি। কথায় ও কাজে এই দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছি এবং করছি। আমি মনে করি, সমাজতন্ত্র ছাড়া মানুষের মুক্তি অসম্ভব। সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি ছাড়া পৃথিবীতে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে না। তবে আগামীর সময় ও সমাজ নির্ধারণ করে দেবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের রূপ ও প্রকৃতি।

বাঙালির লৌকিক ঐতিহ্যের অভ্যন্তরে সন্ধানী দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাব- পাশ্চাত্য তথা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছুসংখ্যক মানুষের মধ্যেই যে মুক্তবুদ্ধিচর্চা সীমিত হয়ে থেকেছে- এমন কথা মোটেই সত্য নয়; বরং প্রকৃত সত্য হচ্ছে :প্রাক-আধুনিককাল থেকেই বাংলার লোকসাধারণ মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে এসেছে এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতার চাপে কখনো কখনো সে চর্চার ধারাস্রোত ক্ষীণ হয়েছে, কখনো-বা উন্মার্গগামীও হয়েছে; কিন্তু কখনোই সে স্রোত একবারে শুস্ক, রুদ্ধ বা স্তব্ধ হয়ে যায়নি।