নকলে সয়লাব জাতি, অরিত্রী করেন আত্মহত্যা

সুমন দত্ত

‘নকল’ স্থান ভেদে শব্দটির অর্থ ভিন্নতা আছে। যেমন পরীক্ষায় নকল করো না। কারণ এটা অপরাধ হিসেবে গণ্য। আবার আদালতে মামলা মোকদ্দমার সময় বিচারক বলেন, রায়ের নকল কিংবা নথির নকল তুলে জমা দিন। এখানে এটি সাক্ষ্য অথবা মামলার কাগজপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিমবঙ্গে পরীক্ষার নকলকে টুকলি বলে। মানে কোনো কিছু দেখে লেখা। সেই অর্থে টুকলি।

বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। বিএসসিতে নুরুল হকের রসায়ন বইয়ের কিছু কিছু লেখা হুবহু ইংরেজি রসায়ন বই শান্তি রঞ্জন পালিতের সঙ্গে মিল। তেমনি কম্পিউটারের ড. লুৎফর রহমানের লেখা সি/সি++ পোগ্রামিংয়ের বহুল প্রচলিত বাংলা বই। সেই বইয়ের প্রায় সব ইংরেজি হাবার্ট সিলের সি/সি++ বইয়ের সঙ্গে মিল। এমন মিল কীভাবে সম্ভব? সেটা বাংলাদেশের ওই বিখ্যাত লেখকরাই বলতে পারেন।

বাংলাদেশে কপি রাইট আইনটি দুর্বল। আর এরই সুযোগ নেয় নকলকারীরা। মাইক্রোসফটের অরিজিন্যাল সফটওয়ার দেখতে কেমন? কেউ কেউ হয়ত দেখেছেন। ৩০-৪০ টাকার নকল সিডি দিয়ে মাইক্রোসফট দেখা হয়ে যায়।

নকলে ভরে গেছে দেশ। তেমনি বিনোদন জগতের সবকিছুই ইউটিউব পাওয়া যায়। তবে সব নকল। আটকানো যাচ্ছে না।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু কিছু গানের সুর নকল। তাই বলে তাকে কেউ নকলবাজ বলে না। কারণ চর্চাটা তার সৃষ্টির অল্পতে সীমাবদ্ধ ছিল। অনেকে এসবের সমালোচনা করতে যেয়ে বলেন তিনি প্রভাবিত। তার গানের অনেক সুর অতুল প্রসাদের সঙ্গে মিলে। ডি এল রায়ের সঙ্গে মিলে। তাই এসবে প্রভাবিত শব্দটা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ কিংবা ‘লালনের বিখ্যাত একটি গানের সুরের সঙ্গে’ তার গানের সুর হুবহু মিল। এটা প্রভাবিত না বলে নকল বলাটাই ঠিক। তাতে কোনো পাপ হয় কি?

বলিউডে সেরা নকল সুরাকার হচ্ছে অনু মালিক। পাকিস্তানের বহু শিল্পী ও সুরকারের গান মেরে দিতেন। এ নিয়ে বলিউডে কম জল ঘোলা হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল পিএইচডি নিয়ে একবার একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। আরেকটি সংবাদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পিএইচডি নিয়ে। ওইসব শিক্ষকরা পিএইচডি করেছেন এমন এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে, যাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

মরহুম আতাউস সামাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক নেতা রহুল আমিন গাজী ভাই বলেন, হায় হায় আজ একি দেখি সাংবাদিকতার। এই জায়গা থেকে কিছু টান, ওইখান থেকে কিছু টান (মানে নকল) মেরে মিলিয়ে দিয়ে রিপোর্ট তৈরি। সামাদ ভাই জীবনেও এসব করেনি। তার কাছে হাজার তথ্য থাকলে তিনি লিখতেন মাত্র দুই লাইন। আর ওই দুই লাইনই হতো চরম। আমাদের সাংবাদিক ভাইদের এটা বুঝতে হবে। আপনার এখান ওখান থেকে নকল সাপ্লাই দেবেন না। ঘটনাস্থলে যান। দেখুনি তারপর লিখুন।

নকল নিয়ে এতকিছু আজ বলতে হচ্ছে অরিত্রী নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার জন্য। নকল সংস্কৃতিতে ও নকল চিন্তা চেতনায় যে জাতি ডুবে গেছে সে জাতি কার নকলের সমালোচনা করে? দেশ স্বাধীনের পর আমরা এখনো নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ঠিক করে বলতে পারলাম না। বাঙালি না বাংলাদেশি এই বিতর্কে আবদ্ধ থেকে গেলাম। জাতীয় পোশাক লুঙ্গি না ধূতি সেটাও ঠিক করতে পারলাম না। ঈদে ভারতীয় সিরিয়ালের আদলে দেখা নকল পোশাক কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। কিরণ মালার নকল পোশাক না পেয়ে একাধিক আত্মহত্যা।

সেই সমাজে নকলের দায়ে আত্মহত্যা মেনে নিই কিভাবে?

ভিকারুননেসা নামের স্কুলটি স্বনাম ধন্য (রেজাল্টের দিক দিয়ে)। সেই স্কুলের ছাত্রীরা নকল করে এটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কারণ সেখানে যারা ভর্তি হয় তারা নিশ্চয় নকলবাজ না। তারা মেধাবী। মেধাবী হয়ে তারা নকল কেন করবে? তাই বিষয়টির সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। আর নকল করলে শাস্তি কি, আমরা স্কুলে বহুবার দেখেছি। আমি সরকারি স্কুলে পড়তাম। আমাদের স্যারেরা নকল করতে দেখলে খাতা নিয়ে নিত। অথবা পরীক্ষার হল থেকে বের করে দিত। মুখ দিয়ে কিছুই বলতো না। আমি কখনও শুনিনি নকল করায় কোনো স্কুল কাউকে টিসি দিয়েছে।

রেজাল্ট খারাপ করলে উপরের ক্লাসে উঠতে দেয়া হতো না। এটাই জানতাম স্কুল কলেজে সর্বোচ্চ সাজা। অরিত্রীর ঘটনাটা শুনলাম সম্পূর্ণ নতুন। এখানে পরীক্ষার ক্লাসে মোবাইল নেয়ার অপরাধে অরিত্রীকে নকলের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তার বাবা মাকে ডেকে আনা হয়। চরম অপমান জনক কথা বলে তাদেরকে হেয় করা হয়। যা অভিযুক্ত ছাত্রীর সামনে করা হয়। এতে ক্ষোভে ছাত্রীটি বাসায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

যারা সম্মিলিতভাবে অরিত্রীর বিরুদ্ধে এ কাজটি করেছেন, তারা ফৌজদারি অপরাধ করে ফেলেছেন। এটা তাদের বুঝতে হবে। কারণ ঘাতক শিক্ষিকারা অরিত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়েছেন মেয়েটির মা বাবাকে অপমান করে। এটা আজ প্রমাণিত। এখন এই শাস্তি তাদের পেতে হবে। সমাজে এর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্কুলের কর্তৃপক্ষ এ ধরনের আচরণ শিক্ষার্থী ও তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে না করেন। আর এই স্কুলে ৮ লাখ ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে যে ভর্তি বাণিজ্য হয় তার তদন্ত করতে হবে। আশা করি দুদক এ বিষয়টি দেখবে। স্কুলে গভর্নিং বডিতে যারা আছেন তাদেরকে জবাবদিহিতার আধীনে আনতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক