গণ নাটক ‘পলাশ তলীর নসূ’ রচনা : সাইফ শোভন

গণ নাটক
‘পলাশ তলীর নসূ’

রচনা : সাইফ শোভন
সময় : আগষ্ট ১৯৯৫

ঘটনাকাল : ১৯৭১

গণ নাটক সম্পর্কে প্রাক কথন

তিনটি গণ নাটক ৩টি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লেখা। কিন্তু তা সত্তে¡ও ৩টি নাটকের কিছু অভিন্ন দিক রয়েছে। ময়মনসিংহের ঈশ^রগঞ্জ থানার কতিপয় গণ নাট্য দল যারা প্রতিনিয়তই তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে নাটক মঞ্চায়ন করে চলেছে। গণ নাটকের মূল বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সাধারণ শ্রমজীবি এবং খেটে খাওয়া মজুরদের জীবন কাহিনীকে ভিত্তি করে গড়ে উঠে। দেশের সংখ্যাগড়িষ্ঠ মানুষের জীবন কাহিনীই এই সকল গণ নাটকে স্থান পায়। আমাদের দেশে গণ নাটকের প্রচলন খুব বেশী দিনের নয়। বিচ্ছিন্ন ভাবে সারা দেশে চর্চা হয়েছে, তবে এর স্বীকৃতি মেলেনি। আর তাই গণ সাহায্য সংস্থা (GSS) কর্তৃক পরিচালিত গণনাট্য দল গুলির ’মাধ্যমে মূলত: এই গণ নাটক এর মঞ্চায়ন সম্ভব হয়েছে। এখানে ৩টি গণ নাটক সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
শহুরে শ্রমজীবি মধ্যবিত্ত সমাজকে নিয়েই গণ নাটক লেখার ইচ্ছা এবং প্রয়াস। আমার ‘পলাশ তলীর নসূ’ নাটকটি মূলত: মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে। একটি শ্রমজীবি পরিবারের সকলেই যখন মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটি “নসূ” সেও যুদ্ধে নানানভাবে সহযোগিতা করে এবং এক পর্য্যায়ে গ্রামের মুক্তি দল টিকে নিয়ে বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত দিতে হয়। পলাশতলী গ্রামের নসূ মিয়া ওরফে নসূ দেখে তার পরিবারের উপর ভয়াবহ অত্যাচারের কাহিনী, গ্রামের মাতবর মোতালেব আলী ভয়ংকর রুপে গ্রামের নীরিহ মানুষদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালায়, তা দেখে নসূ মিয়া। কিশোর নসূ মিয়া ভাবে দেশ স্বাধীন হইলে এরা আর গ্রামে থাকবোনা আর আমাগো মারবো না। এ ভাবনা থেকে সে গ্রামের মুক্তির দলকে নানান খবরাখবর পৌছে দেয়, আর সে থেকেই একদিন করুণ পরিণতির স্বীকার নসূ।
আমার ২য় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়, “মুক্তিযোদ্ধা আরফান বয়াতীর কেচ্ছা” । এটি গ্রামের আরফান বয়াতী কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ এবং যুদ্ধে সৈনিকদের টেনশনের মাঝে আনন্দ বিনোদনের মাধ্যমে ভুলিয়ে রাখে শোকাতর সেই সব দৃশ্য এবং ঘটনা তারই বর্ণনা এ নাটকে আরফান আলী বয়াতীর কেচ্ছায়।
তৃতীয় যে গণ নাটকটি এখানে (্ঈশ^রগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে) মঞ্চস্থ হয়েছে, সেটি হলো “শোহান এখন স্বাধীন”। গ্রামের নীরিহ চাঁন মিঞার ছেলে ‘শোহান’। তাদের নি¤œবিত্ত পরিবার, সে দেখে পাশের গ্রামের গণি মন্ডলের ছেলের সূযোগ ও আহ্লাদের ঘটনা। গণি মন্ডলের ছেলেদের মাঠে ক্ষেতে কাজ করতে হয় না। গরুর খোঁজ করতে হয় না, তার জন্য আলাদা রাখাল রয়েছে। লেখাপড়ার জন্য আলাদা মাষ্টার রয়েছে।
শোহান এর স্কুল এ ভর্তির ব্যাবস্থা করা হয় না। তার মেধা দেখে শিক্ষক স্কুলে ভর্তি করায়। শোহান ক্ষেতের কাজের চাপে স্কুলে যেতে পারে না। একদিন শহর থেকে নাটকের দল (যাত্রার দল) আসছে, তা দেখার জন্য সে বাবার অনুমতি চায় কিন্তু সে অনুমতি পায়নি। ঐ দিন তার বাবার সাথে ধান কেটে ঝাড়তে হবে। যা অনেক রাত হবে। সেজন্য তার যাত্রা দেখা হলো না। সেই থেকে তার মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা, গনি মন্ডলের ছেলের মত সে স্বাধীন হতে চায়।
অন্যায় অত্যাচার শোষণ এর বিরুদ্ধে গণ মানুষের যে নাটক সেই গণ নাটক চিরাচরিত চার দেয়ালের ভিতরে নয়, সাধারনের মাঝে খোলা মঞ্চে, মাঠে, স্কুলে পথে, গঞ্জে, পার্কে, যাতে শহুরে শ্রমজীবী সাধারণ দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষ, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ এটা বুঝতে পারে যা দেখতে পয়সা না লাগে। আনুষ্ঠানিকতার ভয় যেন না থাকে। কঠিন সেই সব শব্দ যা কখনো ঐ সকল পা ফাটা গা ফাটা লোকেরা শুনেনি। জীবনের জন্য নাটক।
গণ সাহায্য সংস্থায় (SMDP) Social Mobilization Development Programme, এর আওতায় (PTE) Popular Theatre Education বিভাগে কর্মরত অবস্থায় গণ নাটকগুলি পাঠস্থ ও মঞ্চস্থ হয়। ময়মনসিংহের ঈশ^রগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে নাটকের দলগুলির এখনো কার্যক্রম লক্ষ করা যায়।

গণ নাটক
“পলাশ তলীর নসূ”
রচনা সময় : আগষ্ট ১৯৯৫
[ গণ নাটক হিসাবে বিভিন্ন গ্রামের খোলা মঞ্চে হেজাক অথবা হারিকেন জ¦ালিয়ে গ্রামের দর্শকদের সামনে মঞ্চস্থ হয়। ]
চরিত্র লিপি :

১. কিশোর নসূ : পলাশতলী গ্রামের দরিদ্র পরিবারের এক বুদ্ধিদীপ্ত কিশোর
২. হরমুজ আলী : নসূর বাবা।
৩. নুরজাহান : নসূর বড় বোন।
৪. মোতালেব আলী : গ্রামের মাতুব্বর।
৫. হযরত মুন্সী : মাতবরের চামচা।
৬. হেলাল : মুক্তি দলের নেতা।
৭. আলী হোসেন (১) : মুক্তি দলের সদস্য।
৮. আলী হোসেন (২) : ঐ
৯. নুরুজ্জামান : পাঞ্জাবী কমান্ডার।
১০. সীপাহীবৃন্দ : ২ জন সীপাহী
১১. মুক্তিযোদ্ধা : ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা।

স্থান : পলাশতলী গ্রামকে কেন্দ্র করে।
প্রেক্ষাপট ও সময় : ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধরত ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে। ময়মনসিংহের ঈশ^রগঞ্জের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই কাহিনী। যা পরবর্তীতে আমি গণ নাটকে রুপ দেই।

দৃশ্য – এক
[পলাশতলী গ্রামে উত্তেজিত মুক্তির দলের যোদ্ধারা যুদ্ধরত অবস্থায় ]
পাক হানাদারদের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে। দলে ৭ জন রয়েছে যোদ্ধা হেলালের দলে। হেলাল স্বল্প শিক্ষিত গ্রামের যূবক। দলের নেতা।
হেলাল : [ চিৎকার করে ] হোসেন আলী গ্রেনেট চার্জ কর। আমি ডাইনে গেলাম। দৌড়িয়ে গর্তে পড়ে যায়। ডান পাশেই বাঁশ ঝাড়। ক্রমশই রাত্র ঘণীভূত হচ্ছে। চারিদিকে গোলাগুলির শব্দ। হঠাৎই চিৎকার।
হোসেন আলী (১): হেলাল রে সাবধান। [চিৎকারে]
অরা আমাগো যাইগা চিন্না হালাইছে। আগাইতাছে এহন সইরা পর, অন্য যাগায় যা। হেলাইল্লা——-রে। [গুলিবিদ্ধ হোসেন আলীর মৃত্যু।] আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীকে কাঁধে করে ক্ষানিক পথ আবার ছেঁচরিয়ে কিছুক্ষণ নিয়ে এক খাদে হাজির হয়।

হেলাল : হোসেন আলী কথা কয় না কে। তাইলে হোসেন আলী কি? যাক, কি ভাবতাছি।
হোসেন আলী মারা গেছে কি না সে ভাবতেই পারে না।
[কিছুক্ষণ চুপ থেকে। অন্ধকারে পাতার মচমচ শব্দ।]
ঐ, ঐ হানে কেডা। আমাগো কেউ। কথা কস না কে। কথা ক, নাইলে—————- এক্কাবারে দিমু কইলাম।
নসূ : না না হেলাল ভাই । আমি, আমি নসূ। তোমারে খবর দিতে আইলাম।
হেলাল : তর সাহস তো কম না। এই অবস্থায় এই হানে আইবার কইছে কেডা, কোন মাতবর, হুনি। যদি কিছু হইয়া যায় তহন। আর যদি দেহি এর মধ্যে তহন বুঝবি মজাটা।
নসূ : না না, হেলাল ভাই, তুমি হুদাই আমার উপরে রাগ করতাছ।
নূরজাহান আফা আমারে পাঠাইছে। রাইতে আমাগো বাড়ীতে আপনাগো জল ভাত খাইতে কইছে।কখান
হেলাল : এত দূর গিয়া ভাত খাইলে শুয়োরের বাচ্চারা টের পাইয়া হালাইব। আইজ না, হালাগো খতম কইরা লই। নূরজাহানরে কইস আমি ভালাই আছি।
নসূ : না, হেলাল ভাই, আফা, না গেলে আমারে বইক্কা থুইবো না । আরেকটা কথা, আইতে সময় দেহি, টেরাকে কইরা পাঞ্জাবীরা কই জানি যাইতাছে। হেলাল ভাই তোমরা সাবধানে থাইক্কো। আমারে তোমাগো দলে নেও। আমি তোমাগো সব খবর আইন্না দিমু।
হেলাল : পাঞ্জাবীরা কই যায় দেখছস।
নসূ : না।
হেলাল : আইচ্ছা তোরে দলে লমূ। তয় একখান কথা, আমাগো এহানে তুই আইবি না। বাড়ীতেই থাকবি, যখন খবর দিমু তহন আইবি। ঠিকাছে ?
নসূ : ঠিকাছে ।
হেলাল : অহন যা, নূরজাহানরে সাবধানে থাকতে কইস, বাড়ীত্তন যেন না বাইরয়।
[ নসূ দ্রæততার সাথে স্থান ত্যাগ করে। ] হেলাল চিন্তাযুক্ত অবস্থায় প্রস্থান।

২য় দৃশ্য
[ মোতালেব আলীর প্রবেশ, নসূর বাবা ও মেয়ের সামনা সামনি অবস্থায় বলছে ]
মোতালেব আলী : এই যে হরমুজ মিয়া, হুনলাম দেশ স্বাধীন করবার চাও, গুন্ডা দলে নাম লেহাইছস।
হরমুজ আলী : জ¦ী, না আমি তো কোন দলেই নাই। ঘরে চাইল নাই, ভাঙা ঘরে বেড়া বদলানির জন্য কয়দিন যাবৎ চেষ্টা করতাছি পারতাছি না।
মোতালেব মাতবর : হুনছস সব অইবো আমি যা কই তা হুনস। নুরজাহানরে আজ রাইতে আমাগো স্যারের কাছে পাঠাইয়া দিও।
হরমুজ : কি, কন মাতবর সাব, এইডা কি কন? আমিতো কোন পক্ষেই নাই, কইলাম তো।
মোতালেব : অ,————– তাইলে সোজা কথায় কাম অইবো না, হযরইত্তা হারামযাদা, খবর দে, অহন ই ধর লইয়া চল।

[ দুইজন লাঠিয়ালের প্রবেশ এবং জোর করে নুরজাহানকে ধরে নিয়ে যায় । ]
হরমুজ : মাতবর সাব অরে ছাইরাদেন কইতাছি।
মোতালেব : শয়তানের বাচ্চারে শেষ কইরা দে।
[ লাঠিয়ালের আঘাতের পর আঘাত, শেষে হরমুজ আলীর মৃত্যু ]
ঠিক এসময় নুরজাহানের চোখ মুখ বেধে নিয়ে পালায় মাতবর সহ তার দল।]
কিশোর নসূর প্রবেশ
নসূ : আফা ——————- আফা।
[ মৃত বাবা হরমুজ আলীকে দেখে চিৎকার ]
বাপজানরে, বাপজানরে ।
[ দৌড়ে গিয়ে চলে যায় মুক্তি দলের ক্যাম্পে ]
হেলাল ভাই, হেলাল ভাই।
[ সকলের প্রস্থান ]

তৃতীয় দৃশ্য
হেলাল : কি রে কি খবর ?
নসূ : বাপ জানরে কুত্তারা মাইরা হালাইছে।
হেলাল : কি কইলি,
নসূ : নূরজাহান আফারে ধইরা লইয়া গেছে, রাইতের বেলা চিনন যায় নাই, সুলতান, মাতব্বর এর গরু লইয়া যাওনের সময় দেইখ্খা হালাইছে। পরে আমারে সব কইল। হেরা বলে বিদেশী মিলিটারী ক্যাম্পে আফারে লইয়া যাইবো।
[ ক্রন্দনরত অবস্থায় নসূ ]
হেলাল : কুত্তার বাচ্চারা মোতালেব মাতবর এর রাজাকারের বাচ্চা। শোন নসূ তুই দিনের বেলায় ওই হালাগোর (পাঞ্জাবী ) কেম্পে যাবি, ঐ হানে ওগোর পরিকল্পনা গোপনে জাইনা আইবি। কিন্তু খুব সাবধানে, যাতে বুঝবার না পারে।
নসূ : ঠিকাছে হিলু ভাই। [ দৌড়ে চলে গেল নসূ ] [ সেই সংগে সকলের প্রস্থান ]

চতুর্থ দৃশ্য

[ পাঞ্জাবী ক্যাম্পে তাবু, পাঞ্জাবী কমান্ডার এর নিকট মোতালেব মাতবর এর প্রবেশ, হরমুজ আলীর মেয়ে এবং দুটি খাসি সহ ]
মোতালেব : স্যার, এই যে লন স্যার। আপনি যা চাইছেন স্যার। আরো লাগলে কইয়েন স্যার।
নূরুজ্জামান (কমান্ডার) : সাব্বাশ মোতালেব। সিপাহী নিয়ে যাও ওকে। আমার তাবুতে নিয়ে আইসো।
মোতালেব : হুজুর যদি আরও প্রয়োজন লাগে আমি উরাল দিয়া চইলা আইমু।
[ ইতিমধ্যে নসূ তাবুর পেছনে ১টি ঝোপে চুপ করে শুনতে থাকে ]
নূরুজ্জামান : আচ্ছা মোতালেব, আর কতজন মুক্তিবাহিনী সৈন্য রয়েছে বলতে পারো।
মোতালেব : আছে স্যার, হেলাল গুন্ডা ও তার দল আছে স্যার।
নূরুজ্জামান : এখন ওদের অবস্থান কোথায় বলতে পারো।
মোতালেব : জ¦ী স্যার, পাশে পলাশতলীর বৃীজের আশে পাশে স্যার।
নূরুজ্জামান : শোন, আগামীকাল কোন এক সময় আমরা ওদের আস্তানা গুড়িয়ে দেবো।
মোতালেব : জ¦ী স্যার জ¦ী। অহন আমি যাই স্যার।
[ মোতালেব মাতব্বর ও তার দলবলের প্রস্থান ]
কমান্ডার আগামীকালের অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য জওয়ানদের নির্দেশ দিয়ে প্রস্থান করে।

৫ম দৃশ্য
[ নসূ দৌড়ে হাপাতে হাপাতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে চলে যায় । ]
নসূ : হেলাল ভাই, হেলাল ভাই, শোন কথা আছে।
হেলাল : কি কথা, হাপাইতাছস কে?
নসূ : হালারা কাইলকা আক্রমন করবো, তোমরা সাবধান। ব্রীজের উপর দিয়া আমাগো ক্যাম্প গুড়াইয়া দিবার চায়।
হেলাল : তুই শুনলী কেমনে?
নসূ : আমি অগর তাবুর ক্যাম্পের পাশেই ছিলাম। তহন হুনছি।
হোসেন আলী (২) : হেলাল ভাই কাইলকাই সূযোগ, যখন ব্রীজের উপর দিয়া অগর গাড়ী যাইবো, আর তহনই ব্রীজের উপর বোমা ফাটাইয়া অগরে —————-
হেলাল : চূপ কর, আস্তে।
শোন, কাইল সারাদিন ব্রীজের আশে পাশেই থাহন যাইব না। আমরা পলাশতলীর বাশ ঝাড়েই থাহুম। আর আজ রাইতে ব্রীজে বোমা পাইতা থুইয়া আহুম। নসূ তুই অহন বাড়ী যা। কাল সকালে বাশ ঝাড়টার ঐ হানে আইবি।
নসূ : না আমি যামু না, আমার যাওনের জায়গা কই, যামু কই, ঘর যেইডা ছিল মোতালেব এর লোকজন ভাইঙ্গা হালাইছে। পাশের জরিনা খালারাও চইলা গেছে।
হেলাল : আচ্ছা তুই থাক, কিন্তু সাবধান বাইওে যাবি না। শোন কাল তর একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হইতে পারে।
নসূ : কি কাজ অহনই কন।
হেলাল : পরে কমু সব। অহন যা হোসেন রে ডাক দে।
হোসেন : হেলাল ভাই খবর কি কন?
হেলাল : শোন, আগামীকাল অপারেশন – এ যাইতে অইবো। রাইতে ব্রীজে বোমা পাইতা রাখতে হইবো।
[ সকলের প্রস্থান ]
৬ষ্ঠ দৃশ্য
[ সকাল ১১ টার সময় পাাক সেনারা পলাশতলীর রাস্তা দিয়ে ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছে।]
নসূ : হোসেন ভাই, হোসেন ভাই।
হোসেন আলী (২) : কি ডাহছ কে?
নসূ : ব্রীজে তোমার আটকানো বোমা কেডা জানি সরাইয়া হালাইছে।
হোসেন আলী (২) : তাইলে কি অরা টের পাইয়া ফালাইছে। হেলাল ভাইরে খবরটা তাড়াতাড়ি ——————–।

৭ম দৃশ্য
হেলাল : অহন উপায় ?
নসূ : হেলাল ভাই, উপায় একটা আছে। আমি হালাগর ক্যাম্পে যাই, দেইখা আহি, রওনা দিছে কিনা?
হেলাল : যা, তাড়াতাড়ি আহিস।
হোসেন (২): অহন কি করা যায়।
হেলাল : শোন, তুই আর বাকীবিল্লাহ অপারেশন রেডি অ। আমি আর হযরত ঐ দিকে যাই।
নসূ : হেলাল ভাই, হেলাল ভাই যাইয়েন না, যাইয়েন না, অরা ট্রাকে কইরা এই দিকে আইতাছে। আমি আওয়াজ পাইলাম।
হোসেন (২): তাইলে, শোনো, হেলাল ভাই নসূরে ব্রীজে পাঠাও ও পোলাপান ওওে কিছু কইবো না, তুই, অরা যখন ঠিক ব্রীজের একটু দুরে থাকবো, ঠিক তহনই গেরনেট এর পিন মুখ দিয়া খুইলা টেরাকের ভিতর মিইল্লা মারবি। আর তুই ব্রীজ থেইক্কা নদীতে ঝাপ দিবি। পারবি।
নসূ : পারুম, সব পারুম। গেরনেট কই দেও, তাড়াতাড়ি দেও, অরা আইয়া পড়লো।
[ হেলাল একদম চুপ, এই কিশোর এর সাহস, স্বত:স্ফুর্ত আবেগ দেখে সে বিহŸল।]
নসূ গেরনেট এর পিন কিভাবে খুলতে হয়, তা আগেই শিখেছিলো। হেলাল ও তার দলবল অস্ত্র হাতে প্রস্তুতি নিতে থাকে।
নসূ : আমি গেলাম।

৮ম দৃশ্য
[ একা একা ব্রীজের উপর মাটির পুতুল বানাচ্ছিল নসূ, যখন ট্রাকটি ব্রীজের উপর। ]
নূরুজ্জামান : সিপাহী, ও ধার, দেখখো, ইয়ে বাচ্চালোক কেয়া হ্যায়?
সিপাহী : স্যার ও তো বাচ্চালোক বকুরী কো ঘাস ——————।
[ নসূর পেছনে ট্রাকের ভেতর গেরনেট এর পিন মুখ দিয়ে খুলেই ঢিল ছোড়ে।]
সিপাহী : স্যার ওহ্ পোলাপান নেহি, ঐ মুক্তি হ্যায়।
নূরুজ্জামান : গুলি ছোঁড়ো।
[ প্রচন্ড গুলিতে নসূর আর নদীতে ঝাপ দেয়া হলো না, ঐ খানেই তার বুকে, মাথায় গুলি লাগে। একই সাথে ট্রাক বিকট শব্দে বাস্ট্র্ হয়ে সকলেই মারা যায়। ]
হেলাল : পলাশতলীর নসূ আর নেই। দেশের জন্য তার এই অকাতরে প্রাণ ঢেলে দিয়ে মহান হয়ে রইল। হোসেন আমাগো অপারেশান সফল, হোসেন সফল। কিন্তু নসূরে আমরা মাইরা ফালাইলাম রে হোসেন নসূ নাই।
[ নসূর লাশ নদীতে ভাসছে।]
সকলে লাশ নিয়ে আসে। সকলের কন্ঠে শ্লোগান——————-
জয় বাংলা।
জয় বাংলা।
জয় বাংলা।
[ সকলের প্রস্থান ]
সমাপ্ত