প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি. চৌধুরী ও জিএম কাদেরের বৈঠক

নিউজ ডেস্ক:  প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে আকস্মিক বৈঠক করেছেন বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আলাদাভাবে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে তিনশ’ আসনে মহাজোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সমকালকে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ। গতকালের বৈঠকে অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহী বি চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিকল্পধারার নেতারা ২২টি আসনের প্রার্থী তালিকা দিয়ে এসব আসনে মহাজোটের মনোনয়ন দাবি করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী জানান, তাদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। এসব রিপোর্ট পর্যালোচনা করে আসন বণ্টনের বিষয়টি সমাধা করা হবে। তবে বিকল্পধারা নূ্যনতম ১০টি আসনের বিষয়ে জোরালো দাবি জানায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বৈঠক শেষে বিকল্পধারার নেতারা দলের প্রেসিডেন্ট বি. চৌধুরীর বারিধারার বাসায় আলাদা বৈঠকও করেছেন। এ সময় বি. চৌধুরী জানান, আসন বণ্টনের বিষয়টিতে ২৫ নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠক প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, বিকল্পধারার নেতারা মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও মাহী বি. চৌধুরীর জন্য দুটি আসন দাবি করলে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় মাহী বি. চৌধুরীকে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বিকল্পধারার নেতা নোয়াখালী-৪ আসনে মেজর (অব.) মান্নানের মনোনয়নের দাবি করলে প্রধানমন্ত্রী জানান, ওই আসনের বর্তমান এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী জনপ্রিয়তার বিচারে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন। এ অবস্থায় মান্নানকে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের প্রস্তাব দেওয়া হলে বিকল্পধারার নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এই আসনের বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের মো. আবদুল্লাহ।

এদিকে, জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার টেলিফোনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুই নেতার এ আলোচনায় আসন ভাগাভাগির বিষয়টি স্থান পেয়েছে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব, বিশেষ করে কক্সবাজার-১ ও কক্সবাজার-৩ আসনে মহাজোটের প্রার্থী বাছাই করা নিয়ে আলোচনা করেছেন ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেছেন, আসন ভাগাভাগি নিয়ে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগ্রহ দেখানোর পর এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, মহাজোটের মনোনয়নের জন্য জাতীয় পার্টির দেওয়া প্রার্থী তালিকা যাচাই-বাছাই করে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্রুতই এ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।

এরপর জাতীয় পার্টিসহ মহাজোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি মহাজোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার কার্যক্রম গুছিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে মহাজোটের প্রার্থিতা নিয়ে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহী বি. চৌধুরী, তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও জাকের পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা আমীর ফয়সলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সদস্যরা গত সোমবার দলের প্রার্থী তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছেন। গণভবনে সংসদীয় বোর্ডের এ বৈঠকে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, ওবায়দুল কাদের, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান ও রমেশ চন্দ্র সেন উপস্থিত ছিলেন। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে দলের প্রার্থী তালিকা বাছাই করা হয়েছে। আপাতত সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক আর হচ্ছে না। প্রার্থী তালিকায় কোনো পরিবর্তন কিংবা সংযোজন করতে হলে সেটা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন দুই আসনে :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ ও রংপুর-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন। গোপালগঞ্জ-৩ তার নিজের আসন। রংপুর-৬ আসনে তার শ্বশুরবাড়ি। গত সংসদ নির্বাচনেও তিনি এ আসনে জয় পেয়েছেন। পরে তিনি এ আসন ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আওয়ামী লীগের আর কোনো প্রার্থীর আগামী নির্বাচনে একাধিক আসনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

মনোনয়ন পাচ্ছেন সিইসির ভাগ্নে :প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে. এম. নূরুল হুদার ভাগ্নে এস এম শাহজাদা সাজু পটুয়াখালী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ না থাকলেও তিনি দুই বছর ধরে দশমিনা ও গলাচিপায় আওয়ামী পরিবারের ব্যানারে প্রচার কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।

এ আসনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত হচ্ছেন বর্তমান সংসদের সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন। সাবেক এ প্রতিমন্ত্রী ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি গতকাল দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে তার মনোনয়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেছেন।

তালুকদারের ভাগ্য বিপর্যয় :বরিশাল-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে। বরিশালের রাজনীতিতে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত জেলা আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক এবার দলের মনোনয়নবঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। তিনি গতকাল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে তার মনোনয়নের বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করেছেন। এ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পেতে পারেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। তার বাড়ি বরিশাল-৩ আসনের বাবুগঞ্জে।

সাবেক এমপির ছেলে :পাবনা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন আহমেদ ফিরোজ কবির। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বাবা আহমেদ তফিজ উদ্দিন মাস্টার এ আসনের এমপি ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার আজিজুল হক আরজু বর্তমান সংসদ সদস্য। তিনি এ আসনে দলের মনোনয়ন নিয়ে গতকাল ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

চঞ্চলেই ভরসা :ঝিনাইদহ-৩ আসনের এমপি অধ্যক্ষ নবী নেওয়াজ গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে তার মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন। জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ নবী নেওয়াজ এবার দলের মনোনয়ন পাচ্ছেন না। তার জায়গায় মনোনয়ন পাচ্ছেন এ আসনের সাবেক এমপি সফিকুল ইসলাম চঞ্চল। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য।

ছেলের আসনে বাবা :টাঙ্গাইল-৩ আসনের এমপি আমানুর রহমান খান রানা দলের মনোনয়ন পাননি। এ আসনে তার বাবা আতাউর রহমান খান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। আমানুর রহমান খান রানা বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় কারাভোগ করছেন। এ মামলায় তার তিন ভাই পলাতক।

শেষ চেষ্টা :এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের আসনে দলের প্রার্থী বদলের অনুরোধ করেছেন রাজশাহী-৫ আসনের এমপি আবদুল ওয়াদুদ দারা, ঢাকা-৪ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ড. আওলাদ হোসেন, ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী সাদেক খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী গোলাম সারোয়ার কবির, বরিশাল-৩ আসনের মিজানুর রহমান মিজান, ঢাকা-১৯ আসনের ফারুক হাসান তুহিন। এ ছাড়া ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন মেহেরপুর-১ আসনের এমপি ফরহাদ হোসেন দোদুল, বরগুনা-১ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনসুর আহমেদ, মেহেন্দীগঞ্জের মেয়র কামাল উদ্দিন খান, ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না।