স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে

সিনিয়র রিাপোর্টার : শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ ও সমৃদ্ধ জীবন গড়ার প্রত্যাশা থাকে প্রত্যেক বাবা-মায়ের। তাদের পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলতে চেষ্টার কমতি রাখেন না বাবা-মা। উন্নত জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ, যেখানে শিশুরা নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠতে পারে। পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা এবং স্নেহ-ভালোবাসায় শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ উম্মুক্ত হয়। শিশুদের মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা বাবা-মা তথা পরিবারের প্রত্যেকের কর্তব্য। ভালো অভ্যাসের মাধ্যমেই শিশুর মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা সম্ভব। শিশুকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে গড়ে তোলার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে ছোটবেলা থেকে তাদের নীতিশিক্ষা দেওয়া। তাই প্রথম থেকেই তাদের প্রকৃত শিক্ষা দিতে হবে। বাবা-মাসহ পরিবার ও শিক্ষকদের কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা, সহায়তা এবং উৎসাহ পেয়ে একটি শিশু সমাজের দায়িত্ববান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। শৈশবকাল থেকে শিশুকে মিতব্যয়ী হওয়ার শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। তাদের সঞ্চয়ী হওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের দেশে আগের দিনে মাটির ব্যাংকে পয়সা ফেলে শিশু-কিশোরদের সঞ্চয় করার প্রবণতা লক্ষ করা যেত। গ্রামীণ নারীরা রান্নার চাল থেকে একমুঠো চাল রেখে তা এক মাস বা দু’মাস পর বিক্রি করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করত এবং পরিবারের দুর্যোগকালে তা ব্যয় করত। এখন এ ধরনের পয়সা জমানোর পদ্ধতি নেই বললেই চলে। ব্যাংকিং সেবা হাতের নাগালে চলে এসেছে। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছে।

সরকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে স্কুলশিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাংকিং সুবিধার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক হিসাব থাকায় ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে উঠছে। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের জনপ্রিয়তা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ফলে বাড়ছে স্কুল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ও সঞ্চয় বা জমার পরিমাণ। স্কুল ব্যাংকিং শুরু হওয়ার সাত বছরের ব্যবধানে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে সঞ্চয় ও জমার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

স্কুলশিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সুবিধা ও তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবার সঙ্গে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের ২ নভেম্বর স্কুল ব্যাংকিং বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করে। এর পর থেকেই স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সালে। প্রথম বছরে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয় ২৯ হাজার ৮০টি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট এক লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি হিসাব খোলা হয়। ওই সময় মোট জমার পরিমাণ ছিল ৯৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৬টি হিসাবের বিপরীতে জমাকৃত সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ। ফলে ব্যাংকগুলোতে এ কার্যক্রমের আওতায় খোলা হিসাবের পাশাপাশি আমানতের পরিমাণও অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কুল ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। এর পরেই রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্কুলগামী শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং সব ব্যাংকের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম খুবই ভালোভাবে এগিয়ে চলেছে। এতে সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক। শিক্ষার্থীরাও ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সুফল ভোগ করে আনন্দিত। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ‘স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্স’ সম্পন্ন করেছে। আগামীতেও এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্কুলগামী ছাত্রছাত্রী। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সঞ্চয়ের অভ্যাস ছেলেমেয়েদের আর্থিক শৃঙ্খলা আনবে, যা তাদের সুশৃঙ্খল জীবন গঠনেও সহায়ক হবে। এসব হিসাবকে বিমার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যরত ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৬টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং পরিচালনা করছে। ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা তাদের বাবা-মা অথবা বৈধ অভিভাবকের সঙ্গে যৌথ নামে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। মাত্র ১০০ টাকা প্রাথমিকভাবে জমা দিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় এ হিসাব খোলা যায়। এ হিসাবে কোনো ফি বা চার্জ আরোপ করা হয় না। এমনকি ন্যূনতম জমা রাখার বাধ্যবাধকতাও নেই। এ ধরনের সঞ্চয়ী হিসাবে যেকোনো সময়ে অর্থ জমা করা যাবে। এই হিসাবে কোনো ধরনের চার্জ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চেকবই ইস্যু করা হয়। এই হিসাবটি যৌথ হিসাবরূপে গণ্য করা হয়। ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংকে উপস্থিত হয়ে হিসাব খোলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্কুল প্রাঙ্গণে ব্যাংকের কর্মকর্তার উপস্থিতিতে হিসাব খোলার যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

খুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা এবং স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছে। এতে একদিকে যেমন স্কুল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বিপুল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিদিনই ব্যাংগুলোতেও স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় খোলা অ্যাকাউন্ট সংখ্যাও বাড়ছে।

একটি কর্মক্ষম জাতি গঠনে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি এখন থেকেই শিশুদের মধ্যে ব্যাংকিং জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং দূরদর্শিতা তথা আর্থিক সঞ্চয় প্রবণতা বাড়ানোর শিক্ষা দিতে হবে। সরকার ছাত্রছাত্রীদের সঞ্চয়ী হিসাব খোলার যে সহজ সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে, সেই সুযোগ দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করার জন্য সব ছাত্রছাত্রীকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে অভিভাবকদের।