বাবা তোমায় মনে পড়ে

আহনাফ তাজোয়ার আইয়ুব:   এক সময় বলতাম বাবার অনেক গানই প্রিয়, তার মধ্যে বেশি প্রিয় ‘তারা ভরা রাতে’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘নীল বেদনা’,’চাঁদ মামা’,’ঘুম ভাঙা শহরে’,’মন চাইলে মন পাবে’- এই গানগুলো। যখন শুনতাম তখন অন্যরকম এক ভালো লাগায় মনটা ছেয়ে যেত। গানের সঙ্গে কিছু দৃশ্য মগজের কোষে আপনা-আপনি জমা হয়। যতবারই গানগুলো শুনেছি ঠিক একই দৃশ্য বারবার মনের পর্দায় ভেসে উঠেছে। কিন্তু এখন? জানি না, ভালো লাগার স্পন্দন খুঁজে পাব কি-না। বাবার কণ্ঠ শুনলেই দু’চোখ ভরে যাবে জলে। এই গানগুলো আর মনের পর্দায় আগের দৃশ্যপট তুলে ধরবে না। তার বদলে ভেসে উঠবে বাবার মুখ। তখন কাকে বলব, তখন কি বাবার গানের মতো করেই বলতে পারব ‘বাবা তোমায় মনে পড়ে’…।

বাবার সঙ্গে কখনও একমঞ্চে গাইব- এটা ছিল ভাবনার অতীত। কিন্তু আমার সেই সৌভাগ্য হয়েছে। বাবা দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘যে ভালো খেলতে জানে না, সন্তান বলে তাকে আমি মাঠে নামাব না।’ তারপর আমাকে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছেন, দর্শকের সামনে গিটার বাজিয়ে প্রমাণ করতে- আমি এলআরবির সঙ্গে বাজাতে পারব কি-না। একই সঙ্গে বাবা সবার কাছে অনুরোধ করেছেন এই বলে, ‘আমি চেয়েছি আহনাফের জীবনের শুরুটা হোক একটা ভালো জায়গায়। ওর শুরুটা হোক আপনাদের নিয়ে, পুরো দেশকে নিয়ে। সবার কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা আমাকে আর আমার ব্যান্ড এলআরবিকে যেভাবে ভালোবেসেছেন, আমার ছেলেকেও ঠিক একইভাবে ভালোবাসবেন।’ সন্তানের জন্য একজন বাবাই এভাবে বলতে পারেন। কিন্তু তিনি শুধু আমার বাবা নন, আমার শিক্ষক, যিনি আমার হাতে গিটার তুলে দিয়েছিলেন। সঙ্গীতের হাতেখড়িও তার কাছেই। এ কারণেই আইয়ুব বাচ্চু আমার কাছে একের মধ্যে অনেক।

এখন কল্পনায় কিছু দৃশ্যপট তৈরি করছি। আর বাবাকে বলছি, ‘বাবা- আপনি যেখানেই থাকুন, আমি জানি ঠিক আগের মতোই এইরকম করে হাসছেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনাকে ছাড়া পৃথিবীটা খালি মনে হচ্ছে। যারা এই লেখা পড়ছেন তারা আমার বাবার মৃত আত্মার জন্য প্রার্থনা করুন।’ প্রতিটি বাবাই তার সন্তানের কাছে সেরা বাবা হওয়ার চেষ্টা করেন। আমার বাবাও আমার কাছে সেরা বাবা। যে বাবা শুধু আমার একার নয়, অগণিত মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। সঙ্গীতের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরেছেন বলেই তার প্রতি মানুষের এত ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা নিয়েই বাবা চিরদিন বেঁচে থাকবেন ভক্ত-শ্রোতার হৃদয়ে। গান আর তার গিটারের সুরে তিনি বেঁচে থাকবেন হাজার বছর- এটাই আমি বিশ্বাস করি।

আমার বাবা আইয়ুব বাচ্চুর ভক্ত-অনুরাগী যারা, তাদের আমি এটাই বলতে চাই, আমার বাবা হয়তো আপনাদের জন্য সর্বোচ্চটা দিতে পারেননি; কিন্তু তিনি আপনাদের অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়েছেন। ভালোবাসা পাওয়ার বিনিময়ে নিজেও অনেক করেছেন। একেকটি আয়োজনের পেছনে রচনা করছেন অগণিত রাতজাগা গল্প। ব্যাকুল থেকেছেন সৃষ্টির নেশায়। নিরলস কাজ করেছেন। প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ নতুন কিছু করার চেষ্টায় থেমে থাকেননি। এ সবই তার ভক্ত-শ্রোতাদের জন্য। আপনারাও তার প্রতিদানে ভালোবেসেছেন। এই ভালোবাসা বাবার জন্য জমা থাকুক চিরকাল- এটুকুই আমার চাওয়া।

লেখক : আইয়ুব বাচ্চুর ছেলে