ফেসবুক বির্তকে মাসুদা ভাট্টি ও তসলিমা নাসরিন

নিউজ ডেস্ক:  মাসুদা ভাট্টিকে ‘ভীষণ চরিত্রহীন’ বলার পর ফেসবুকে আবার তাকে আক্রমণ করলেন তসলিমা নাসরিন। মাসুদা ভাট্টির মতো এত ‘ভয়ঙ্কর মিথ্যুক আর চরিত্রহীন’ জীবনে দেখেননি বলে মন্তব্য করেন নির্বাসিত বাংলাদেশি এই লেখিকা।

মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে ওই স্ট্যাটাস দেন তসলিমা নাসরিন। টকশোতে মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ মন্তব্য করার পর মানহানির মামলায় কারাগারে গেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে তসলিমা নাসরিন লিখেছেন, ‘মাসুদা ভাট্টি যে এত শক্তিধর জানতাম না। কেউ তাকে একটা গালি দিল, বাহ সে ২০ কোটি টাকার মামলা ঠুকে দিল। আর সেই লোক, শুনেছি বিরাট কিছু, গ্রেপ্তার হয়ে গেল, তাকে এখন জেলের ভাত খেতে হচ্ছে।’

গত রোববার ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে মাসুদা ভাট্টিকে ‘ভীষণ রকম চরিত্রহীন মহিলা’ আখ্যা দিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, ১৯৯৬ বা ১৯৯৭ সালের দিকে ব্রিটেন সরকারের কাছে চিঠি লেখার জন্য অনুরোধ করে মাসুদা ভাট্টি তার কাছে ফোনে কান্নাকাটি করেন। এরপর ব্রিটেন সরকারের কাছে মাসুদা ভাট্টিকে না তাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন তসলিমা। সেই অনুরোধপত্রে তসলিমা লেখেন, মাসুদা ভাট্টি তার পাবলিশার ছিলেন, দেশে ফিরলে তাকে মেরে ফেলবে মৌলবাদিরা। তার অনুরোধের পর মাসুদা ভাট্টিকে ব্রিটেনে থাকার অনুমতি দেয় সেই দেশের সরকার।

তসলিমা নাসরিনের ওই স্ট্যাটাসের পর পাল্টা স্ট্যাটাস দেন সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি। সোমবারের ওই স্ট্যাটাসে মাসুদা ভাট্টি স্বীকার করেন, তসলিমার সেই চিঠির কারণেই ব্রিটেনে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন তিনি। তবে পাবলিশার নয়, একজন ফ্যান হিসেবে ব্রিটেন সরকারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন তসলিমা। মাসুদা ভাট্টি অভিযোগ করেন, তসলিমা এরকম একটি মোক্ষম সময়কে বেছে নিয়েছেন তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভকে প্রকাশ করে ২০ বছর আগে দেওয়া একটি বক্তব্যের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।

মাসুদা ভাট্টির ওই স্ট্যাটাসের জবাবে তসলিমা নাসরিন আজ লেখেন, ‘মাসুদা ভাট্টি নামক ক্ষমতাবান আমার সত্য ফাঁসের ‘জবাব’ দিয়েছে। জবাব তো নয়, আবারও একরাশ মিথ্যের কলস উপুড় করেছে। আমি তাকে আমার পাবলিশার হিসেবে নাকি ফ্যান হিসেবে পরিচয় করিয়েছি, বড় ব্যাপার নয়। সে আমার পাবলিশারও নয়, ফ্যানও নয়। আমাকে দিয়ে মিথ্যে বলিয়ে নিয়েছে নিজের স্বার্থের জন্য। সবচেয়ে বড় যে মিথ্যেটি ছিল, সেটি হলো “সে বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাকে মৌলবাদিরা মেরে ফেলবে”, এই মিথ্যে বাক্যটির কারণে সে ব্রিটেনে পলিটিক্যাল এসাইলাম পেয়েছিল। তখন তার পক্ষে নাকি সাংবাদিকরা দাঁড়িয়েছিল, তবে কারো দাঁড়ানোর জন্য কিন্তু তার পলিটিক্যাল এসাইলাম হয়নি, হয়েছে আমার চিঠির কারণে। ’

তসলিমা আরও লেখেন, ‘ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বলল, এই সত্যটা কিন্তু বলল না। ব্রিটেনে পলিটিক্যাল এসাইলাম এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার পর আমাকে কিন্তু কোনো ধন্যবাদও দেয়নি। দেবে কেন, আমার পিঠে ছুরি বসাবার জন্য তখন তো ছুরি শানাতে ব্যস্ত ছিল। উপকারীর উপকার স্বীকার করতে তার ইচ্ছে তো হয়ই না, বরং অপকার করতে ইচ্ছে হয়। এই উপকারের কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন অনুভব করতাম না, যদি বদমাইশি না করত। ক্ষতিকর লোকদের চিহ্নিত করতে হয় সর্ব সাধারণের মঙ্গলের জন্য। অপ্রেসর এখন চমৎকার ভিক্টিম রোল প্লে করছে। বলছে, আর কত শাস্তি আমি দেব তাকে? কী শাস্তি আমি তাকে দিয়েছি, শুনি। তার বিরুদ্ধে মামলা করেছি? ব্রিটিশ সরকারকে দিয়ে তার এসাইলাম তুলে নিয়েছি? না, কিছুই করিনি। তবে কি বাঙালি পাঠককে সত্য তথ্য জানানোর নাম শাস্তি?’

মাসুদা ভাট্টি আরও বড় মিথ্যে কথা লিখেছে উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘সে নাকি আমার বইয়ের সমালোচনা করেছে, ব্যক্তি আক্রমণ করেনি। রিয়েলি? দেখাক তার তিন কিস্তিতে লেখা তসলিমার প্রতি ঘৃণা আর নিন্দা ছুড়ে দেওয়া সেই নোংরা গালাগালিগুলো। তার লেখার শিরোনাম ছিল “তসলিমা নাসরিনের ‘ক’ ফুরিয়ে যাওয়া যৌবনের আত্মযৌবনিক কামশাস্ত্র”। শিরোনাম পড়েই নিশ্চয়ই অনুমান করা যায়, কী বলতে চেয়েছে সে। ওই নোংরা জিনিস আমি রাখিনি, কিন্তু নিজের রচনা তো নিজে সে রেখেছে। দেখাক। মানুষ পড়ুক।’

মাসুদা ভাট্টির স্ট্যাটাসের সূত্রধরে তসলিমা লেখেন, ‘তসলিমা কুড়ি বছরে কুড়িবার লিখেছে তার কীর্তিকলাপ সম্পর্কে? ২০০৩ থেকে এখন ১৫ বছর। তো এই ১৫ বছরে তাহলে ছন্দ মিলিয়ে তাকে বলতে হবে ১৫ বার। সত্য শতবার উচ্চারণ করতে হয়, ১৫ বার তো কমই। এই ১৫ বছরে তার একবারও কেন ইচ্ছে করল না ক্ষমা চাইতে? আজ যখন বড় বড় বুদ্ধিজীবী আর নারীবাদী দাঁড়িয়ে গেছে মাসুদাকে কেন চরিত্রহীন বলা হলো এই প্রতিবাদে, তখন কেন আমার মনে হবে না এরা সব হিপোক্রিটের জাত? তখনই বলতে ইচ্ছে করেছে, চরিত্রহীনকে চরিত্রহীন বলবে না তো কী বলবে! আমি কোনো ‘মোক্ষম’ সময় বেছে নিইনি। সব সময়ই সত্য বলার সময়। যারা নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধে আদায়ে ব্যস্ত, তাদের কাছেই সত্য বলার জন্য এই সময়টা ভালো, ওই সময়টা খারাপ । আমার কাছে নয়।’

টকশোর প্রসঙ্গ টেনে তসলিমা বলেন, ‘মইনুল হোসেন কী কারণে মাসুদাকে চরিত্রহীন বলেছেন, সে মইনুল হোসেন জানেন। আমি তাকে কী কারণে চরিত্রহীন বলেছি,ব্যাখ্যা করেছি। মাসুদা দাবি করেছে, আমার পক্ষে সে লিখেছে অনেক। মানুষের সহানুভূতি কাড়ার জন্য ন্যাকামো বেশ জানা আছে তার। আমার সহানুভুতি পাওয়ার জন্যও একসময় ন্যাকামো করেছিল, আড়ালে ছুরিতে শান দিচ্ছিল। এখন সরকারি আরাম আয়েস জুটছে তার, রথী মহারথীরা তাকে ঘিরে আছে, আর সে ভান করছে, তার নাকি সংকটকাল চলছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দোষ দিয়েছে আমাকে, আমি দেশের রাজনৈতিক অবস্থার এদিক-ওদিক করে দিয়েছি। আমি একা মানুষ, কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, ধর্মীয় দল আমার পক্ষে কোনো দিন ছিল না, থাকবেও না। মাসুদা ভাট্টির মতো আমি প্রভাবশালী নই। আমার কোনো ক্ষমতা নেই রাজনীতির জগতে কোনো ঢিল ছোঁড়ার।’

তসলিমা আরও লেখেন, ‘আমার মতো রাজনীতি না বোঝা বোকা লোক যেমন সংসারে আছে, মাসুদা ভাট্টির মতো ধুর্ত লোকেরা চিরকালই ছিল, আছে। মানুষের পিঠে চড়ে উঁচুতে গিয়ে ওঠে, তারপর লাথি মেরে ফেলে দেয় নিচের মানুষদের। আমি অনেক লোক দেখেছি জীবনে, মাসুদা ভাট্টির মতো এত ভয়ঙ্কর মিথ্যুক আর চরিত্রহীন জীবনে দেখিনি। আমাকে নিয়ে মন্দ কথা অনেক লোকই লিখেছে, এসবে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু যার জীবনের সবচেয়ে বড় উপকারটি আমি করে দিলাম, উপকারটা লুফে নিয়ে সে যখন আমার বই রিভিউয়ের নামে ব্যক্তি আমাকে জঘন্য আক্রমণ করে, যৌন হেনস্থাকারীর পক্ষ নিয়ে আমাকেই করে কুৎসিত পুরুষতান্ত্রিক আক্রমণ, তখন কষ্ট হয়। সেই কষ্ট থেকেই লিখেছি গতকাল।’