জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে থাকতে বি. চৌধুরী’র শর্ত

নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘদিনের জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানিয়েছেন, বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে নেই তার দল। স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গ ত্যাগ না করা পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে আর আলোচনায় হবে না।

শনিবার রাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী তার বারিধারার বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি এখনো জাতীয় ঐক্য চান। বিএনপির সঙ্গে ঐক্যে তার আপত্তি নেই। কিন্তু বিএনপিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গ ছাড়তে হবে। ক্ষমতার ভারসাম্যের রাজনীতির শর্ত মেনে নিতে হবে। জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর ‘চক্রান্তের’ সঙ্গে বিকল্পধারা নেই।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব বি. চৌধুরী যখন এ ঘোষণা দেন তার ঘন্টাখানেক আগে প্রেসক্লাবে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা। অভিন্ন সাত দফা ও ১১ লক্ষ্য ঘোষণা করেন ঐক্য ফ্রন্টের নেতারা। তবে সংবাদ সম্মেলনে বি. চৌধুরী বলেন, নবগঠিত ঐক্য ফ্রন্টের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বি. চৌধুরী অসুস্থ। তাই আসেননি। এর জবাবে খ্যাতিমান চিকিৎসক বি. চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘কোন ডাক্তার বলেছে আমি অসুস্থ?’

গত কয়েকদিন ধরেই জল্পনা চলছে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নিয়ে। গুঞ্জন ছিল নতুন এ জোটে থাকবে না বিকল্পধারা। শুক্রবার জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় বৈঠকের পর জানানো হয়েছিল, মতপার্থক্য দূর হয়েছে। অভিন্ন সাত দফা ও ১১ লক্ষ্যে সবার সম্মতি মিলেছে।

কিন্তু তার পরদিন অর্থাৎ শনিবার সকাল থেকে ফের শুরু হয় নাটকীয়তা। বি. চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে জানান, সাত দফা ও ১১ লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করতে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ড. কামালের বাসায় গিয়েও তার দেখা পাননি। দরজা খুলে কেউ তাকে বসতেও বলেনি। এ ঘটনাকে শিষ্টাচারবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে বি. চৌধুরী বলেন, ‘বলতেও লজ্জা লাগে। তবু বলতে হচ্ছে।’

জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে না থাকার ঘোষণা দিলেও দুয়ার বন্ধ করছেন না দেড় দশক আগে বিএনপি ছেড়ে বিকল্পধারা গঠন করা বি. চৌধুরী। তিনি বলেন, তার দুই শর্ত পূরণ হলে ঐক্য হবে। ভবিষ্যতে স্বেচ্ছাচার, স্বৈরাচারী সরকারের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে বিএনপিকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। এমন ঐক্য হতে হবে যেখানে কোনো দল ১৫০টির বেশি আসন পাবে না। কোনো দল যেনো এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারে। নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা গণতন্ত্রকে হত্যা করে।

বি. চৌধুরী বলেন, তারা একটি স্বেচ্ছাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। যেখানে বহু দল থাকলেও সরকারের একক নিয়ন্ত্রক আওয়ামী লীগ। ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের সরকার আসুক তা তিনি চান না। জামায়াতে ইসলামীর নামোল্লেখ না করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকলের ঐক্য হতে পারে। কিন্তু যারা পতাকা ও মানচিত্রে বিশ্বাস করে না তাদের সঙ্গে ঐক্য হতে পারে না। ঐক্য চাইলে বিএনপিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গ ছাড়তে হবে। এই দুই শর্তে অনড় থাকবে বিকল্পধারা।

২০০২ সালে বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বি. চৌধুরী। তখনও বিএনপির জোটে জামায়াত। এ প্রসঙ্গে বি. চৌধুরীর জবাব, তার জীবনে একটিই রাজনৈতিক ভুল। তাহলো জামায়াতের সঙ্গে জোট। এর জন্য তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। ভবিষ্যতেও চাইবেন।

বিএনপির মনোনয়নে পাঁচবার এমপি নির্বাচিত হওয়া বি. চৌধুরী বলেন, বিএনপি এখন দু’টি। একটি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের বিএনপি- যে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের দল, যে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে ঐক্য চায় না। অপরটি ‘বর্তমান’ বিএনপি। এই বিএনপি ভুল পথে।

বিকল্পধারা ঐক্যফ্রন্টে যোগ না দিলেও দলটির নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের দুই শরিক জেএসডি ও নাগরিক তাতে শামিল হয়েছে। তবে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বি. চৌধুরীর দাবি, তার নেতৃত্বাধীন জোট ভাঙেনি। তিনি আশাবাদী, যুক্তফ্রন্টের যে সব শরিক জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে যোগ দিয়েছে তারা ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে। ড. কামালও ফিরে আসবেন। বি. চৌধুরীর দাবি, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার বিষয়ে এক সময়ে আপত্তি ছিল ড. কামালের। তার প্রচেষ্টাতেই সেই আপত্তি দূর হয়েছিল। ড. কামাল এক সময় যুক্তফ্রন্টে আসতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু এখন মান্নার সঙ্গেই ড. কামালের সখ্যতাকে স্বাভাবিক মনে করছেন না তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিকল্পধারার সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী বলেন, বর্তমান অগণতান্ত্রিক সরকারকে মোকাবেলায় বছর দুই ধরে বি. চৌধুরী একটি বৃহত্তর ঐক্য গঠনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঐক্যের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপির সাবেক এমপি মাহী।

তিনি দাবি করেন, গত ২২ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চে বিএনপি ও তার শরিক দলের নেতাদের উপস্থিতিতে যে সমাবেশ হয় সে সম্পর্কে বিকল্পধারাকে আগেভাগে জানানো হয়নি। সমাবেশ থেকে যে যৌথ ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়, সে সম্পর্কে তারা জানতেন না। গত ৭ অক্টোবরের মানববন্ধন কর্মসূচির কথা জানানো হয় ৪০ মিনিট আগে। তারপরও সব মেনে নিয়েছিলেন ঐক্যের স্বার্থে। দেশ ও জাতির স্বার্থে ক্ষুদ্র বিষয় উপেক্ষা করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছিলেন।

মাহী বি চৌধুরী বলেন, তাদের শর্ত ছিল বি. চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বি. চৌধুরী ও ড. কামালের আলোচনা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে না। ড. কামালের সঙ্গে আলোচনা করতেই গতকাল তারা বি. চৌধুরীকে নিয়ে তার বাসায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ড. কামালের বাসায় তাদের কেউ বসতেও বলেনি।

গণমাধ্যমে খবর বিকল্পধারা ১২০ আসন চায়। এর জবাবে মাহী বি বলেন, এমন কোনো দাবি তাদের ছিল না। আসন প্রশ্নে কোনো আলোচনাই হয়নি বিএনপির সঙ্গে। বি. চৌধুরীর ফর্মুলা অনুযায়ী তাদের প্রস্তাব ছিল, কোনো দল যেনো ১৫০টির বেশি আসনে না জেতে। বিএনপি ১৫০টির বেশি আসনে প্রার্থী দেবে না।

বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান দলটির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে বলা হয়, স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিরোধীদের বাদ দিয়ে ঐক্য করতে বিকল্পাধারা অনঢ় ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতেও তাই করবে। জাতীয় ঐক্যের নামে বর্তমান বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে বসে জাতিকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ দেবে না বিকল্পধারা। স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গ ত্যাগ করে সংসদে ভারসাম্যের ভিত্তিতে স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত শুধুমাত্র ‘বর্তমান বিএনপিকে’ এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর চক্রান্তে সম্পৃক্ত হবে না বিকল্পধারা।

সূত্র: সমকাল