উৎপাদন বেশি হলেও গ্রাহক ভোগান্তি

নিউজ ডেস্ক: দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু এর সঙ্গে সমান তালে সঞ্চালন এবং বিতরণ খাত উন্নত করতে পারেনি সরকার। সঞ্চালন-বিতরণে এই দুরাবস্থার কারণেই এখনও গ্রাহকদের সইতে হচ্ছে লোড শেডিংসহ বিদ্যুৎ না থাকার বিড়ম্বনা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) স্বীকার করেছে, গ্রীষ্মকাল তো বটেই, আবহাওয়া একটু উষ্ণ হলেই এলোমেলো হয়ে যায় বিদ্যুতের বিতরণ শিডিউল। উৎপাদনের হারের সঙ্গে বিতরণ সঞ্চালন মেলালেই স্পষ্ট হয় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াতে এখনও পিছিয়ে আছে সরকার।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, সারাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ১৩৩ মেগাওয়াট। এরমধ্যে গ্রিডের বাইরে ক্যাপটিভ পাওয়ার (শিল্প কারখানার নিজস্ব উৎপাদন) রয়েছে দুই হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গ্রিডে সংযুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১৭ হাজার ৩৩৩ মেগাওয়াট। গত সাড়ে নয় বছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারিভাবে উন্নয়নের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সেখানে বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সরকারি হিসেবে গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বেড়েছে ১২ হাজার ১৯১ মেগাওয়াট। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির এ হার ২৪৬ ভাগ।

 

কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই হারে গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) বলছে, গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ (মেগাভোল্ট এম্পিয়ার) থেকে ৩৬ হাজার ০৪৬ এমভিএ তে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ সঞ্চালন ক্ষমতা বৃদ্ধির হার উৎপাদনের ২৪৬ ভাগের বিপরীতে ১২৭ দশমিক ১৩ ভাগ।

কিন্তু পিডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, যা উৎপাদন ক্ষমতা তার পুরোটা কোনও সময়ই উৎপাদন হয় না। ফলে বিতরণে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেশের নীট উৎপাদন বৃদ্ধি ধরে হিসেব করে দেখা গেছে, গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা মোট উৎপাদনের চেয়ে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। আর ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সর্বোচ্চ উৎপাদনে বেড়েছে ৮ হাজার ৩৫৫ মেগাওয়াট। শতকরা হিসেবে মোট গ্রিডভুক্ত বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণও ২৫৫ দশমিক ৬৬ ভাগ।

পিজিসিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০০৯ সালের সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ এবং ২০১৮ সালের সঞ্চালন লাইনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তিন হাজার ১২৩ কিলোমিটারের মতো সঞ্চালন লাইন বেড়েছে গত ৯ বছরে। ২০০৯ সালে দেশে মোট সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার কিলোমিটার। যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১২৩ কিলোমিটার। তিনি জানান, ২০২১ সালের মধ্যে সারাদেশে আরও ১০ হাজার কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরমধ্যে কিছু প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসায় সঞ্চালন লাইন বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি এখনও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি। তাই সঞ্চালনের ক্ষেত্রে এখনও সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যায়নি।

বিতরণের ক্ষেত্রে সরকার দাবি করছে, এখন ৯০ ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে তারা। যদিও এর মধ্যে ৫৮ লাখ সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে অন্তর্ভুক্ত করে হিসেব দেওয়ায় মোট বিদ্যুতের কত ভাগ গ্রিডের তা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে গ্রিডভুক্ত বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৮ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ১১ লাখ হয়েছে। আর এজন্য বিতরণ লাইন ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার থেকে ৪ লাখ ৫৭ হাজার কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু সঞ্চালন এবং বিতরণে এককভাবে সরকারি কোম্পানি কাজ করছে। সরকার সঞ্চালনের একটি অংশ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চাইলেও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি এতে আপত্তি তুলেছে।

পিজিসিবি সূত্র জানায়, দেশের বড় সঞ্চালন লাইনগুলোর মধ্যে ৫টি সঞ্চালন লাইন ওভারলোডেড অবস্থায় আছে। এগুলো হচ্ছে আশুগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ- ময়মনসিংহ, যশোর-নোয়াপাড়া, ঈশ্বরদী-ভেড়ামারা, চট্টগ্রাম –দোহাজারি-কক্সবাজার এবং হরিপুর-নরসিংদী সঞ্চালন লাইন। এসব কারণেই গরমে বেশি চাহিদা সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হয়। তবে শীতকালে চাহিদা কমে গেলে সঞ্চালন লাইনগুলো চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।

পিজিসিবি সূত্র আরও জানিয়েছে, তাদের চলমান প্রকল্পের সংখ্যা এখন ২৫টি। আর আগামীতে তারা আরও ১২টি সঞ্চালন প্রকল্প গ্রহণ করবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সমস্যা আরও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে পিডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের বাইরে সঞ্চালনই শুধু নয় বিতরণখাতেও বেসরকারি অংশগ্রহণ রয়েছে। কেউ চাইলে একই এলাকার একটি কোম্পানির বদলে অন্য কোম্পানির কাছ থেকেও বিদ্যুৎ নিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো নানা ধরনের অফার দিয়ে গ্রাহককে আকৃষ্ট করে। গ্রাহক তার সুবিধা অনুযায়ী বিদ্যুৎ নিয়ে থাকে। প্রতিযোগিতার ওই বাজারে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক ভালো গ্রাহকসেবাও পায় তারা।

কিন্তু এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে যখন বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয় তখন সঞ্চালন ক্ষমতা স্বল্প ব্যবহৃত ছিল। পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে সঞ্চালন লাইনও তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু, কোথায় কতটা সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার কথা ছিল তা সরকার করতে পারেনি। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যত্রতত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়াচ্ছে কিন্তু সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করতে পারছে না। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। সরকারি খাত থেকে সঞ্চালন লাইন বেসরকরি খাতে নেওয়ার পাঁয়তারাও চলছে। হুইলিং চার্জের পরিবর্তে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার বিষয়টিও ভোক্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। এধরনের উন্নয়ন কাজ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয় করেই সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন তৈরি করতে হবে। অন্য কোনও উদ্দেশ্যে তা করা যাবে না।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন